বিভেদ ভুলে আরএসএস এক হিন্দু রাষ্ট্র গড়ার দাবি তুলেছিলেন। প্রথম বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভায় যেন সেই 'এক ভারত' বার্তা। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নাম ঘোষণার পরই শুক্রবার শুভেন্দু অধিকারী 'আমি নয়, আমরা' হয়ে একসঙ্গে কাজ করার বার্তা দিয়েছিলেন। তার ঠিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্রিগেডের মেগা শপথ মঞ্চে সেই একই অখণ্ডতার ছবি। আপাতত মন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়া 'পঞ্চপাণ্ডবে'র মধ্যে কুড়মি থেকে মতুয়া আবার রাজবংশী - গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সকলকেই। মহিলা প্রতিনিধি হিসাবে রয়েছেন অগ্নিমিত্রা পল। রয়েছেন আরএসএস মতাদর্শের দিলীপ ঘোষও। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নপূরণ করে ব্রিগেডের শপথ মঞ্চে ইতিহাস গড়লেন মোদি-শাহরা।
শপথ গ্রহণের পর মোদি ও শুভেন্দু অধিকারী। ৯ মে। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড। ছবি: পিটিআই
ছাব্বিশের ভোটের আগে রাজ্যে এসআইআর শুরু হয়। তাই মতুয়া ভোট তৎকালীন শাসক-বিরোধী সকলের কাছেই ছিল বড় ফ্যাক্টর। সেই মতুয়াগড়ই ঢেলে ভোট দিয়েছে বিজেপিতে। বিশেষত বনগাঁ উত্তর, গাইঘাটা, রানাঘাটের মতো কেন্দ্রগুলোতে ফুটেছে পদ্ম। সেকথা মাথায় রেখে বনগাঁ উত্তর থেকে জয়ী অশোক কীর্তনীয়াকে মন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত। কোন দপ্তরের মন্ত্রী হচ্ছেন তিনি, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মতুয়া সম্প্রদায়ের কথা মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে সেক্ষেত্রে ঠাকুরনগরের ঠাকুরবাড়ির জয়ী সদস্য সুব্রত ঠাকুর কিংবা শান্তনু ঘরনি সোমা ঠাকুরকে কেন মন্ত্রী হিসাবে বেছে নেওয়া হল না, স্বাভাবিকভাবে সে প্রশ্নও মাথাচাড়া দিচ্ছে। যদিও রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ঠাকুরবাড়ির বাইরে বেরিয়ে বৃহত্তর মতুয়া সমাজকে আরও সংঘবদ্ধ করার লক্ষ্যেই অশোক কীর্তনীয়াকে মন্ত্রী হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
ব্রিগেডের মঞ্চে শপথবাক্য পাঠ অশোক কীর্তনীয়ার
ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে 'কুড়মি ক্ষোভ' ছিল তৃণমূলের বড় চ্যালেঞ্জ। গরাম থান স্পর্শ করে তাঁরা শপথ নিয়েছিলেন তৎকালীন শাসক শিবিরকে কোনওমতেই ভোট দেবেন না। পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে বড় ফ্যাক্টর ছিল কুড়মি ভোট। সেখানে অভাবনীয় ফল করে বিজেপি। সেই কুড়মিদেরই যেন আরও 'আপন' করে নিল পদ্মশিবির। 'কিংমেকার' কুড়মি সমাজের প্রতিনিধি হিসাবে বাঁকুড়ার রানিবাঁধের ক্ষুদিরাম টুডুকে রাখা হল মন্ত্রিসভায়। কোন দপ্তরের মন্ত্রী তিনি তা এখনও জানা যায়নি। তবে এদিন ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সাঁওতালি ভাষায় শপথবাক্য পাঠ করেন ক্ষুদিরাম। তাতেই বেজায় খুশি কুড়মি জনজাতির বাসিন্দারা।
শপথবাক্য পাঠ রানিবাঁধের ক্ষুদিরাম টুডুর
উত্তরবঙ্গ বরাবরই বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। দলের দুর্দিনেও নিরাশ করেনি উত্তরবঙ্গ। দক্ষিণবঙ্গে ফলাফল যা-ই হোক না কেন, উত্তরে বরাবরই ফুটেছে পদ্ম। ছাব্বিশের নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সেই উত্তরবঙ্গের প্রতিনিধিদের যে এবারের মন্ত্রিসভায় বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হবে, সেকথা আগেই শোনা গিয়েছিল। আর হলও তাই। ব্রিগেডের ঐতিহাসিক মঞ্চে রাজবংশীদের প্রতিনিধি হিসাবে শপথ নিলেন নিশীথ প্রামাণিক। এর আগে অবশ্য একাধিক দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তিনি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ছিলেন নিশীথ। এবার দেখার শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য মন্ত্রিসভায় কোন দপ্তরের দায়িত্ব পান তিনি।
শপথবাক্য পাঠ নিশীথ প্রামাণিকের
শনিবারের মঞ্চে শপথ নেওয়া মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে একমাত্র মহিলা মুখ অগ্নিমিত্রা পল। আসানসোল দক্ষিণ থেকে জয়ী বিধায়ক তিনি। একদা ফ্যাশন ডিজাইনার হিসাবে সুখ্যাতি ছিল তাঁর। এরপর রাজনীতিতে অভিষেক। বাংলায় বিজেপির ভরাডুবির সময়েও শক্ত হাতে বিজেপি মহিলা মোর্চার সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পথেঘাটে নেমে আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছেন। যেকোনও মিছিল, বিক্ষোভে প্রথম সারির চেনা মুখ ছিলেন তিনি। এবারও বিপুল ভোটে জেতার পর তাঁকে মন্ত্রী হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। কানাঘুষো শোনা গিয়েছিল, অভয়ার মা রত্না দেবনাথও নাকি মন্ত্রী হতে পারেন। তবে এদিন তাঁকে শপথ নিতে দেখা যায়নি। আগামী সোমবার লোকভবনে অন্যান্য মন্ত্রীদের শপথ। ওইদিন তাঁকে দেখা যায় কিনা, সেটাই দেখার।
শপথবাক্য পাঠ অগ্নিমিত্রা পলের
১৯৮৪ সালে আরএসএসে যোগ। ২০১৪ সাল থেকে বাংলার দায়িত্বে। তাঁর জনপ্রিয়তায় বাংলায় পদ্ম ফোটে প্রথমবার। ২০১৯-এ বাংলার প্রায় প্রতিকূল মাটিতেও তিনি পদ্ম ফুটিয়েছিলেন। ১৮টি আসন পেয়ে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে বিজেপিকে তীব্রভাবে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছিলেন। আরএসএসের শিক্ষাই তাঁকে একজন দক্ষ সংগঠক করে তুলেছে, তা নিজে মুখে বারবার স্বীকার করেছেন দিলীপ ঘোষ। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন প্রথম বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভায় তাঁকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দিলীপ ঘোষ মন্ত্রী হওয়ায় খুশি তাঁর অনুগামীরা। আগামী সোমবার লোকভবনে বাকি মন্ত্রীদের শপথ। আর কারা থাকেন তালিকায় সেটাই দেখার।
শপথ নিলেন দিলীপ ঘোষ। ৯ মে। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড।
