যে কোনও ভোট (Bengal Election 2026) হলেই উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠতেন মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু এ বছরের 'ভোট উৎসব' মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের কাছেই 'বেরঙিন' ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকল। মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের শতাধিক সদস্য বৃহস্পতিবার ভোটদান পর্বে অংশই গ্রহণ করতেই পারলেন না। বৃহস্পতিবার মুর্শিদাবাদের ২২টি বিধানসভা কেন্দ্রে যখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল সেই সময় নবাব পরিবারের কোনও সদস্যের সময় কাটল বাড়িতে টিভিতে ভোটের খবর দেখে, আবার কেউ বুথ থেকে বহু দূরে বসে অন্য ভোটারদের ভোট দেওয়ার কাজে সাহায্য করে। অথচ এবারই প্রথম তাঁরা ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হলেন।
মুর্শিদাবাদ বিধানসভার লালবাগ শহরের 'কিল্লা নিজামাত' ঘণ্টা ঘর এলাকায় বসবাস করেন মুর্শিদাবাদের একসময়ের নবাব মির জাফরের বহু বংশধর। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের নবাব সিরাজদৌলার পরাজয়ের পর ব্রিটিশদের সহায়তায় বাংলা-বিহার এবং ওড়িশার মসনদে বসেন নবাব মির জাফর। বর্তমানে তাঁর ১৫তম বংশধর মহম্মদ রেজা আলি মির্জা। যিনি মুর্শিদাবাদে 'ছোটে নবাব' নামে পরিচিত। এখনও 'কিল্লা নিজামত' এলাকার ঘণ্টাঘরের কাছে নবাবদের তৈরি করে যাওয়া একটি বাড়িতেই থাকেন। ছোটে নবাবের সঙ্গেই থাকেন তাঁর ছেলে তথা নবাব মির জাফরের ১৬তম বংশধর সৈয়দ মহম্মদ ফাহিম মির্জা, তাঁর স্ত্রী এবং পরিবারের সদস্যরা। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নবাব মির জাফরের বংশধরদের বেশিরভাগের নাম ভোটার তালিকায় ছিল। তাঁরা ভোটও দিয়েছিলেন।
তবে এসআইআরের কারণে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে আর ভোট (Bengal Election 2026) দিতে পারলেন না মুর্শিদাবাদের 'ছোটে নবাব' এবং তাঁর ছেলে ফাহিম-সহ নবাব মির জাফরের বেশিরভাগ বংশধর। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার পর ছোটে নবাব জানিয়েছিলেন, ভোটের দিন তিনি নিজের যাবতীয় নথি নিয়ে ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে যাবেন। তবে বৃহস্পতিবার ভোটের দিন 'সবদিক বিচার বিবেচনা' করে মুর্শিদাবাদের 'ছোটে নবাব' এদিন আর কুতুবপুর নব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২১ নম্বর বুথে, যেখানে তিনি প্রতি বছর ভোট দেন, সেদিকে আর পা বাড়াননি। মির জাফরের ১৬তম বংশধর তথা মুর্শিদাবাদ পুরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর ফাহিম আলি মির্জা জানান, "আজ গণতন্ত্রের সব থেকে বড় উৎসব। প্রত্যেকবার ভোটের দিনে আমাদের সবারই আঙুলে ভোটের কালি লাগে। কিন্তু এবারের ভোট উৎসবে আমাদের কারও হাতেই ভোটের কালি লাগেনি। বেরঙিন হয়ে থাকল এই উৎসব। মুর্শিদাবাদ শহরে হাজারদুয়ারি প্রাসাদ থেকে অন্যান্য সমস্ত নবাবি স্থাপত্য আমাদের পূর্বপুরুষদের তৈরি, অথচ আমাদেরকেই এবছর এসআইআরের নামে ভোট দিতে দেওয়া হল না। নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকরা মনে রাখেননি আমাদের পরিবারের হস্তক্ষেপেই মুর্শিদাবাদ জেলা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, "আমি পুরসভার কাউন্সিলর। ভোটার তালিকায় নাম না থাকলেও আমি আজ কুতুবপুর নব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২১ এবং ১২২ নম্বর বুথে যে সমস্ত ভোটার ভোট দিতে আসেন তাঁদের দরকার অনুযায়ী বুথ থেকে ১০০ মিটারেরও বেশি দূরত্বে বসে প্রয়োজনীয় সাহায্য করছি। ১৮ বছর বয়স থেকে আমি ভোট দিচ্ছি। এ বছরই প্রথম ভোট দিতে পারলাম না, মনটা অবশ্যই খারাপ।" তিনি বলেন, "এক সময় আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রজাদের বিচার করে তাদের 'ন্যায় বিচার' দিতেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন আমাদের পরিবারের সঙ্গে ন্যায় করতে পারেনি। বিচারাধীন তালিকা থেকে আমাদের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় তুলতে নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হয়েছে। ভোটার তালিকায় নাম না উঠলেও আমরা ভারতের নাগরিক। কয়েক শতাব্দী ধরে আমাদের পরিবার এই জেলাতেই বাস করছে। একসময় আমাদের পরিবার বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব ছিল।” তবে তাঁরা আশাবাদী, রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে শতাধিক আত্মীয় ভোট দিতে না পারলেও রাজ্যে পরবর্তী যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, ভোটের সেই উৎসবে নবাব পরিবারের সদস্যরা আবার পুরনো দিনের মতো অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
