বিখ্যাত দার্শনিক কার্ল মার্ক্স ধর্মকে আফিমের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সে ছিল অন্য এক আমল। তখনকার আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে এই তুলনা হয়ত যথাযথই ছিল। তবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি মার্ক্সে সেই আপ্তবাক্য এদেশের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অন্ধ অনুকরণ হয়েছে, তা বলতে আর দ্বিধা নেই। পরিণাম, বঙ্গ রাজনীতির ভোট মার্কশিটে কমরেডদের 'শূন্য' নম্বর। সেই শূন্যের গেরো কাটাতে এবার সিপিএম প্রার্থীরা সেই ধর্মের শরণ নিচ্ছেন। অন্তত ভোটের মুখে তাঁদের বাস্তব জীবনযাপন সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রচারে বেরিয়ে কোনও প্রার্থী চৈতন্যদেবের মন্দিরে পুজো দিলেন, কেউ আবার যজ্ঞে ঘৃতাহুতি দিয়ে পুরোহিতের আশীর্বাদ নিলেন। এসব দেখেশুনে মার্ক্সীয় ধর্ম-আফিম সম্পর্ককে অন্যভাবে দেখছেন কেউ কেউ। তাঁদের কটাক্ষ, ‘ধর্ম আফিম’ তত্ত্ব কি এখন শুধুই বক্তৃতার অংশ? নাকি বাস্তবে সিপিএম সেই ‘আফিম’কেই ভোটের অস্ত্রে পরিণত করতে চাইছে?
রবিবার সকালে ভোটপ্রচারে বেরিয়ে সিপিএম প্রার্থী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় কমরেডদের নিয়ে পৌঁছন উত্তরপাড়ার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে। যুব গোষ্ঠীর মাঠে মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের আয়োজিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হাজির হন তিনি। প্রথমে আয়োজকদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়, এরপর উত্তরীয় পরিয়ে তাঁকে মঞ্চে স্বাগত জানানো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই যজ্ঞমঞ্চে বসে ঘৃতাহুতি দেন মীনাক্ষী। পুরোহিতের কাছ থেকে আশীর্বাদও নেন। ভোটপ্রচারের মাঝেই এই পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় অংশগ্রহণ ঘিরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সেই প্রশ্নের জবাবে মীনাক্ষীর বক্তব্য, “যার যেটা রুচি, সে সেটা করবে। আমাদের পার্টি এই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে শেখায়নি।” এনিয়ে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত, এই মন্তব্যেই স্পষ্ট আদর্শগত প্রশ্নে সরাসরি জবাব দেওয়া এড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।
এই ছবি উত্তরপাড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। পানিহাটিতে সিপিএম প্রার্থী কলতান দাশগুপ্ত মহোৎসবতলা ঘাটে শ্রীচৈতন্যদেবের মন্দিরে পুজো দিয়ে প্রচার শুরু করেছেন। মন্দিরে ঢুকে মালা পরে খাঁটি বৈষ্ণব রূপে হাতজোড় করে বিগ্রহ প্রণাম করলেন কলতান। তারপর শুরু করেন ভোটের প্রচার। এসব তো কমরেডদের নাস্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। যে সিপিএম বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোকেও 'পুজো' না বলে স্রেফ উৎসবের তকমা দিয়ে বুক স্টলের ব্যবসায় মন দেয়, তাদেরই প্রার্থীরা ধর্মীয় আচার-আচরণ থেকে এখন বিন্দুমাত্র পিছু হটছেন না! শূন্যের চক্রব্যুহ কেটে বেরনো বড় বালাই যে।
তবে ভারতীয় মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসে এই দ্বন্দ্ব নতুন নয়। সুভাষ চক্রবর্তীর তারাপীঠে পুজো বা রেজ্জাক মোল্লার হজযাত্রা - প্রতিবারই বিতর্ক উঠেছিল। তবে তখন তা ছিল বিচ্ছিন্ন, এখন তা ক্রমশ নিয়মে পরিণত হচ্ছে বলেই অভিযোগ। মহম্মদ সেলিমের কপালে তিলক লাগানো ছবিও সময় সময়ে ভাইরাল হয়েছে। একসময় ধর্ম থেকে দূরত্ব বজায় রাখাই ছিল রাজনৈতিক অবস্থান, এখন সেই দলই ধর্মীয় মঞ্চে সক্রিয় - সবমিলিয়ে স্পষ্ট, বাম রাজনীতিতে ধর্মীয় অংশগ্রহণ আর ব্যতিক্রম নয়। তবে প্রশ্ন থাকেই। এভাবে কি শূন্য থেকে পূর্ণ সংখ্যায় পৌঁছতে পারবে লাল পার্টি?
