রাজ্যে নির্বাচন পর্ব এখন মধ্যগগনে। সবে একদফা ভোট হয়েছে। আরেকদফা বাকি। ফলপ্রকাশ ও নতুন সরকার গঠনের অপেক্ষায় বঙ্গবাসী। তৃণমূল, বিজেপি, বাম, কংগ্রেসের মতো মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে প্রতিবারের মতো এবারের ভোটেও লড়ছে সোশালিস্ট ইউনিটি অফ ইন্ডিয়া (কমিউনিস্ট) বা এসইউসিআই। রাজ্যের ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৩০টিতে এসইউসিআই প্রার্থীরা রয়েছেন। বৃহস্পতিবার, প্রথম দফা নির্বাচনে ৬১ জনের ভাগ্যপরীক্ষা হয়ে গিয়েছে। যদিও রাজনৈতিক চরিত্র অনুযায়ী এই বামপন্থী দলটি ঠিক নির্বাচনমুখী নয়, ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসা তাদের মূল লক্ষ্য নয়, তবু কোনও নির্বাচনেই অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে না এসইউসিআই। এমনকী সংসদে তাদের প্রতিনিধি ছিলেন বছর ১২ আগে পর্যন্তও। কেন? ছাব্বিশের ভোট আবহে তা আরও একবার স্পষ্ট করলেন এসইউসিআই রাজ্য সম্পাদক চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য।
তাঁর ব্যাখ্যা, ‘‘অসৎ সরকার বদলানোর প্রক্রিয়ায় শামিল না হলে, সেই লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানো মানে আরেকটা অশুভ শক্তির রাস্তা পরিষ্কার করে দেওয়া। সেটা কখনও করা যায় না। তাই নির্বাচনে আমাদের অংশগ্রহণ থাকে। কিন্তু আমাদের নীতি অনুযায়ী, ভোটে লড়াই করা এবং জনমতের ভিত্তিতে সরকার গঠনে সাহায্য করাই মূল নয়। বরং নিরন্তর সংগ্রাম, আন্দোলনে থেকে বিকল্প পথের সন্ধান করতে হবে। তার মাধ্যমে উন্নততর সমাজ গঠনের চেষ্টা করে যেতে হবে। সেটাই একমাত্র আদর্শ বামপন্থা।''
এসইউসিআই প্রার্থীদের প্রচার। ছবি: ফেসবুক
সম্প্রতি নিজেদের ডিজিটাল মাধ্যমে চণ্ডীদাসবাবুর একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। তাতে এসআইআর থেকে শুরু করে একাধিক রাজনৈতিক প্রসঙ্গে তিনি নিজের মতামত স্পষ্ট করেন। সম্প্রতি নির্বাচনী রাজনীতি যে পথে এগোচ্ছে, তাতে অংশগ্রহণ করার কতটা পক্ষাপাতী দল? কেনই বা আন্দোলনমুখী একটা দল সংসদীয় গণতন্ত্রে এতটা সক্রিয়? এর জবাবে এসইউসিআই রাজ্য সম্পাদক চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য জানান, ‘‘অসৎ সরকার বদলানোর প্রক্রিয়ায় শামিল না হলে, সেই লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানো মানে আরেকটা অশুভ শক্তির রাস্তা পরিষ্কার করে দেওয়া। সেটা কখনও করা যায় না। তাই নির্বাচনে আমাদের অংশগ্রহণ থাকে। সরকার গঠনের মতো সংখ্যায় যদি আমাদের প্রার্থীরা জয়ী হন তবে অবশ্যই আমরা সরকার গঠন করব। আর তেমন না হলে জনগণের সমর্থন গণআন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধি করবে।''
সংযুক্ত মোর্চা জোট নিয়ে চণ্ডীদাসবাবুর বক্তব্য, ‘‘যে কংগ্রেসকে সরিয়ে সিপিএম ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের সঙ্গেই জোট কীভাবে? এটা জনমানসে কেমন প্রভাব ফেলবে, ভেবেই দেখা হল না! শুধু তাই নয়, সদ্য গজিয়ে ওঠা একটা দল, যাদের নামে শুধুমাত্র সেক্যুলার শব্দটা আছে, আদতে তাদের মতামত, বেশভূষা কোথাও সেক্যুলারিজমের ছাপ নেই, সেই দলেরও হাত ধরে ফেলল সিপিএম! এটা তো মেনে নেওয়া যায় না।''
বিকল্পের কথা বলতে গিয়ে একযোগে তৃণমূল ও বিজেপিকে বিঁধলেন চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য। দুই রাজনৈতিক দলের ত্রুটিবিচ্যুতিক নমুনা তুলে ধরে তাঁর দাবি, ‘‘চোরকে সরিয়ে তো ডাকাতদের ক্ষমতায় আনা যায় না। দুর্নীতিগ্রস্তদের সরাতে গিয়ে দেশকে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভাগ করে দেবে, এমন কারও হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া যায় না। সেই অশুভ শক্তিতে আটকাতে হবে। আমাদের অংশগ্রহণের তাৎপর্য এটুকুই।'' এছাড়া দুর্নীতিগ্রস্ত, সাম্প্রদায়িক দলগুলোর জনস্বার্থ বিরোধী রাজনীতির বিকল্প হিসেবে জনস্বার্থ রক্ষাকারী রাজনীতির দিশা দেখানো হয়েছে দলের তরফে। এসইউসিআই প্রার্থীরা জিতলে বিধানসভায় জনগণের স্বার্থে লড়াই করবেন, যেমন অতীতের জনপ্রতিনিধিরা করেছেন।
সেক্ষেত্রে কেন বামপন্থী জোটের সঙ্গে নেই এসইউসিআই? এখানেও সেই নীতির প্রশ্ন। বামপন্থী আদর্শ মেনে চললেও তথাকথিত সিপিএম বা অন্য কোনও শরিক দলের সঙ্গে পুরোপুরি সহমত নয় তারা। ইদানীং সেই মতানৈক্য বেড়েছে, বিশেষত একুশের বিধানসভা নির্বাচনে সংযুক্ত মোর্চা জোট জন্মের পর।
এনিয়ে চণ্ডীদাসবাবুর বক্তব্য, ‘‘যে কংগ্রেসকে সরিয়ে সিপিএম ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের সঙ্গেই জোট কীভাবে? এটা জনমানসে কেমন প্রভাব ফেলবে, ভেবেই দেখা হল না! শুধু তাই নয়, সদ্য গজিয়ে ওঠা একটা দল, যাদের নামে শুধুমাত্র সেক্যুলার শব্দটা আছে, আদতে তাদের মতামত, বেশভুষা কোথাও সেক্যুলারিজমের ছাপ নেই, সেই দলেরও হাত ধরে ফেলল সিপিএম! এটা তো মেনে নেওয়া যায় না।'' এপ্রসঙ্গে তিনি হুমায়ুন কবীরের আমজনতা উন্নয়ন পার্টিকেও যথেষ্ট আক্রমণ করেছেন এসইউসিআই রাজ্য সম্পাদক।
সম্প্রতি এসআইআর নিয়ে বিরোধিতায় এসইউসিআই-কে বেশ অগ্রণী ভূমিকায় দেখা গিয়েছে। গোটা প্রক্রিয়া নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে চণ্ডীদাসবাবুর মত, ‘‘কেন এত নাম বাদ পড়ল, তার যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নেই। জানতে চাইলে দেখাতেও পারছে না কমিশন। মুখ বুজে সেসব মানুষ সহ্য করে নিলেন। ভোটও হয়ে গেল। এটা গণতন্ত্রের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত। আমরা বারবার এটা নিয়ে কমিশনকে বলেছি। এই প্রশ্নও তুলেছে, কেন বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগে কমিশনকে 'গণতন্ত্রের হত্যাকারী'র তকমা দেওয়া হবে না?'' তবে কি ভোটের লড়াই থেকেই প্রতিবাদের রাস্তা চওড়া করা সম্ভব? এ প্রশ্নের জবাব অবশ্য এত সহজ নয়। চণ্ডীদাসবাবুর মতে, মানুষের কাজই আসল লক্ষ্যে হলে কোনও একমুখী আন্দোলন নয়, নিরন্তর সংগ্রামই একমাত্র রাস্তা। আর আশার কথা, সেই রাস্তায় হাঁটতে আগ্রহী এখনকার যুব প্রজন্ম। এই-ই তো মার্কসবাদের সার কথা। সংগ্রামই সাম্যের পথ আর তা অন্তহীন।
