shono
Advertisement
WB Assembly Election 2026

সোমেনের স্মৃতিবিজড়িত চৌরঙ্গীতে ফ্যাক্টর বাঙালিয়ানা, নয়না-সন্তোষের ভোটযুদ্ধে চর্চায় কংগ্রেসও

এই কেন্দ্রে সোমেন আবেগ আর পুরনো সংগঠনকে পুঁজি করেই ছাব্বিশের লড়াইয়ে শামিল কংগ্রেস প্রার্থী 'ছোড়দা'র ছায়া মানস সরকার।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 07:35 PM Apr 24, 2026Updated: 08:59 PM Apr 24, 2026

বিজয় সিং নাহার, বিধান রায়, সিদ্ধার্থশংকর রায়, সোমেন মিত্রদের মতো বঙ্গ রাজনীতির দাপুটে নেতাদের নাম আর কাজ জুড়ে আছে। হাজি মহম্মদ মহসিন স্কোয়্যার অর্থাৎ ওয়েলিংটন থেকে ট্রামলাইন ধরে পার্ক স্ট্রিটের দিকে যেতেই পড়ে বিজয় সিং নাহারের বাড়ি। এখানে প্রথম প্রদেশ কংগ্রেসের কার্যাল স্থাপিত হয়। সেই অফিস পুনরুদ্ধার করে এখন তা মধ‌্য কলকাতা জেলার পার্টি অফিস। এহেন কৌলিন্যে ভরা কলকাতার বিধানসভা কেন্দ্র চৌরঙ্গী - ছাব্বিশের ভোটে (WB Assembly Election 2026) অন্যতম হটস্পট। এই কেন্দ্রের নির্বাচনী লড়াই সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানতে গিয়ে সবচেয়ে আগে যা চোখে পড়ল, তা হল, এখনও সোমেন মিত্রর আবেগ প্রভাবিত করে এখানকার ভোটযুদ্ধকে। চৌরঙ্গীর এবারের কংগ্রেস প্রার্থী মানস সরকার কার্যত 'ছোড়দা'র ছায়া। তাঁর ব‌্যক্তিগত ইমেজ যথেষ্ট উজ্জ্বল। বিরোধীরাও তাঁকে নিয়ে কোনও খারাপ কথা বলে না। সোমেনের পর এখানে হাত শিবিরের কংগ্রেস সংগঠন ধরে রেখেছেন মানসই।

Advertisement

২০০৯ সালে কেন্দ্র পুনর্বিন্যাসের পর শিয়ালদহ আর বউবাজারের অংশ জুড়ে তৈরি হয় চৌরঙ্গী বিধানসভা কেন্দ্র। এখানকার মোট ভোটার ছিলেন ২ লক্ষ ১০ হাজার ২৪৬জন। এসআইআরে ৮৩,৮৯৭ নাম বাদ পড়ার পর এখন সেই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ২৬ হাজার ৩৪৯ ভোটার। কলকাতা পুরসভার ৪৪, ৪৫, ৪৬, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১, ৫২, ৫৩, ৬২ ওয়ার্ড এর অন্তর্গত। এর মধ্যে ৪৪ এবং ৬২ নং ওয়ার্ড সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডটি কংগ্রেসের দখলে ছিল, সন্তোষ পাঠক ছিলেন কাউন্সিলর। কিন্তু ভোটের আগে তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়ে এই কেন্দ্রের প্রার্থী হয়েছেন। ৫০ নম্বর ওয়ার্ডটি বিজেপির, কাউন্সিলর সজল ঘোষ বরানগরের বিজেপি প্রার্থী। বাকি ওয়ার্ডগুলি তৃণমূলের দখলে।

বাঙালিয়ানা এখানকার রাজনৈতিক লড়াইয়ে একটা বড় ফ্যাক্টর। বিশেষ করে ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১ নম্বর ওয়ার্ড বাঙালিদের পুরনো বাসস্থান। দুর্গাপুজো, কালীপুজোর পাড়া। পুরনো বাঙালি মস্তানের এলাকা। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়ের সাগরেদ ভানু বোসের জলসা এলাকায় বিখ‌্যাত ছিল। এই ভানু বোস এলাকায় কোনও অশান্তি বরদাস্ত করতেন না, তিনি ছিলেন ত্রাতা। সেই ধারা পরবর্তীতে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন তাঁর চেলা ফাটাকেষ্ট। 

চৌরঙ্গীর 'অবিংসবাদী' নেতা সোমেন মিত্র। ফাইল ছবি

বাঙালিয়ানা এখানকার রাজনৈতিক লড়াইয়ে একটা বড় ফ্যাক্টর। বিশেষ করে ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১ নম্বর ওয়ার্ড বাঙালিদের পুরনো বাসস্থান। দুর্গাপুজো, কালীপুজোর পাড়া। পুরনো বাঙালি পাড়াকে জনান্তিকে বলা হয় 'মস্তানে'র এলাকা। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়ের সাগরেদ ভানু বোসের জলসা এলাকায় বিখ‌্যাত ছিল। এই ভানু বোস এলাকায় কোনও অশান্তি বরদাস্ত করতেন না, তিনি ছিলেন ত্রাতা। সেই ধারা পরবর্তীতে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন তাঁর অনুগামী ফাটাকেষ্ট। মহিলাদের সম্মান রক্ষায় তিনি 'রবিনহুড' হয়ে উঠেছিলেন। পুরনো নকশাল এলাকা বলেও বিখ‌্যাত। সিপিএম, নকশালদের দাপটের মাঝে ফাটাকেষ্ট আর সোমেন মিত্রের পালটা দাপট এলাকার পুরনো কংগ্রেসি শুধু নয়, বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে মানুষকে স্বস্তি দিয়েছিল। এমন বর্ধিষ্ণু এলাকায় সম্প্রতি বাইরে থেকে আসা বিজেপির 'ডিজে' সংস্কৃতি, দেওয়ালে গুটখার পিকের ছড়াছড়ি রীতিমতো অস্বস্তি, বিরক্তি বাড়িয়েছে বাঙালি মহলে। এছাড়া সমস্যা আরও আছে। কোলে মার্কেট থেকে শিয়ালদহ, বউবাজার, ক্রিক রো চত্বরে বেআইনি দখলদারি, বেআইনি পার্কিং, অল্প বৃষ্টিতে জল জমার সমস‌্যা, নিকাশীর সমস‌্যা। কোলে মার্কেটে মানুষ যাতায়াতে সমস্যা হয়। তার প্রধান কারণ, বাজার এলাকায় অবৈধ পার্কিং আর আবর্জনাস্তূপের জন্য। এছাড়া জল জমার সমস‌্যাও রয়েছে।

বরাবর চৌরঙ্গী বাম-বিরোধী। নয়ের দশকে সোমেন মিত্র যখন প্রদেশ সভাপতি ছিলেন, তখন মহসিন স্কোয়্যারের পার্টি অফিসের বিশাল পরিধিতে শুধু তাঁরই দাপট ছিল। ২০১১ সালে তাঁর স্ত্রী শিখা মিত্র প্রথমবার বিধায়ক হয়েছিলেন। পরে তিনি তৃণমূলে যোগ দেন। বর্তমানে রাজনীতি থেকে সরে গিয়েছেন। ছেলে রোহন মিত্রও বাবা-মায়ের রাজনৈতিক ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ। ছাব্বিশে তিনি বালিগঞ্জের কংগ্রেস প্রার্থী। ২০১৬ সালে এখানে প্রেস্টিজ ফাইটে সোমেন মিত্রকে হারিয়ে দিয়েছিলেন তৃণমূলের নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়। অবশ্য সেটা ছিল বকলমে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়-সোমেন মিত্রর লড়াই।

২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে চৌরঙ্গীতে কংগ্রেস প্রার্থী ছিলেন সন্তোষ পাঠক। তৃতীয় হয়েছিলেন। তার আগে একবার উপনির্বাচনেও দাঁড়িয়েছিলেন, জয়ের মুখ দেখেননি। এবারও তাঁকে কংগ্রেস টিকিট দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি রাজি হননি। পরে বিজেপিতে যোগ দিয়ে প্রার্থী হলেন। ফলত কংগ্রেসের বিদ্বেষ থাকবেই। হাত শিবিরের খোঁচা, এলাকায় নিজের ওয়ার্ডের বাইরে ভোট পান না সন্তোষ। তবে প্রতীক দেখে ভোট হলে বিজেপির বেশ কিছু ভোট তাঁর ঝুলিতে পড়তে পারে।

সাম্প্রতিককালে ৪৮, ৫০, ৫১ নং ওয়ার্ডে বিজেপির উত্থান হয়েছে। ৫০ নম্বর ওয়ার্ডে বিজেপির কাউন্সিলর সজল ঘোষ। ওই ওয়ার্ডেরই বাসিন্দা সজলের বন্ধু কংগ্রেস প্রার্থী মানস সরকার। মানস এখানকার ভূমিপুত্র। চৌরঙ্গী এখনও পুরনো কংগ্রেসি এলাকা। হাত শিবিরের পুরনো সংগঠন এখানে সক্রিয় এখনও। যদিও বউবাজার, সোনাপট্টি, শিয়ালদহ চত্বরজুড়ে তৃণমূল-বিজেপির দ্বিমুখী লড়াই। তবে এই রাজনৈতিক লড়াইয়ের মাঝে মাথায় রাখতে হবে, শিয়ালদহ, বউবাজার চত্বরে সোমেন মিত্রর দুই শাগরেদ মানস সরকার ও সজল ঘোষের বন্ধুত্ব সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ওঠাপড়া করেছে। পুরনো সম্পর্কে এখন আবার উষ্ণতা এসেছে। পৃথক রাজনীতির বাইরে স্থানীয় ‘বন্ধু’ ক্লাবকে কেন্দ্র করে সজল-মানসের বন্ধুত্ব স্থানীয় মহলে চর্চার বিষয়। তবে সেসব রাজনীতিতে প্রভাব পড়ে না কখনওই। অন‌্যদিকে, সোমেন মিত্রের ছায়ায় এবং বহু রাজনীতিক বিধায়ক-সাংসদ হয়েছেন। স্বয়ং অধীর চৌধুরীও। আবার সোমেন-মমতা বৈরিতা থেকেই কংগ্রেস ভাঙে, তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে চৌরঙ্গীতে কংগ্রেস প্রার্থী ছিলেন সন্তোষ পাঠক। তৃতীয় হয়েছিলেন। তার আগে একবার উপনির্বাচনেও দাঁড়িয়েছিলেন, জয়ের মুখ দেখেননি। এবারও তাঁকে কংগ্রেস টিকিট দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি রাজি হননি। পরে বিজেপিতে যোগ দিয়ে প্রার্থী হলেন। ফলত কংগ্রেসের বিদ্বেষ থাকবেই। হাত শিবিরের খোঁচা, এলাকায় নিজের ওয়ার্ডের বাইরে ভোট পান না সন্তোষ। তবে প্রতীক দেখে ভোট হলে বিজেপির বেশ কিছু ভোট তাঁর ঝুলিতে পড়তে পারে।

বিজেপিতে যোগ দিয়ে চৌরঙ্গীর প্রার্থী হেভিওয়েট কংগ্রেস নেতা সন্তোষ পাঠক, ছবি: ফেসবুক

অন্যদিকে, সংখ‌্যালঘু অধ্যুষিত ৪৪ ও ৬২ নম্বর ওয়ার্ড হলে তৃণমূল প্রার্থী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড় শক্তি। কিন্তু মানস সরকার মধ‌্য কলকাতা জেলার সভাপতি হয়ে আসার পর বিশেষ করে ৬২ নম্বর ওয়ার্ডে বড় সংখ‌্যায় সংখ‌্যালঘু অসংখ‌্য নেতা, কর্মী তৃণমূলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কংগ্রেসের যোগ দিয়েছেন। তবে স্থানীয় স্তরে তৃণমূল নেতৃত্বকে নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে জনতার। শিক্ষা, স্বাস্থ‌্য নিয়ে কাজ হয়নি বলে গুরুতর ক্ষোভ ও অভিযোগ আছে এলাকায়। বিদায়ী বিধায়ক বিধানসভায় এলাকায় নীরব, সমস্যা নিয়ে একেবারেই কোনও প্রসঙ্গ তোলেননি - এই অভিযোগও রয়েছে।

তৃণমূল প্রার্থী তথা বিদায়ী বিধায়ক নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘চৌরঙ্গী মমতা বন্দ্যোপাধ‌্যায়েরই থাকবে। এখানে কোনও কিছু বদল হবে না। দিদির কাজের জন‌্য রাজ্যে সব তৃণমূল প্রার্থীই জিতবে। আমরা নিমিত্ত মাত্র। দিদির লড়াই, এসআইআরের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ - সেসব এবারের ইস্যু। মানুষ ভোটে জবাব দেবে।'' যদিও বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বিধায়ককে পাওয়া যায় না। বিরোধীদের অভিযোগ, বিধানসভায় একটাও প্রশ্ন করেননি। বিজেপি প্রার্থী সন্তোষ পাঠকের কথায়, ‘‘প্রক্সি ভোটে এখানে বারবার জিতেছে তৃণমূল। এবার নির্বাচন কমিশন বেশ কঠোর। তৃণমূল আর এবার জিততে পারবে না। বিজেপিই একমাত্র যে এখানে তৃণমূলকে উৎখাত করতে পারবে। আগেরবার লড়াই করতে পারিনি, এবার লড়াই হবে, ঘরে ঢুকিয়ে দেব তৃণমূলকে। আমি যা করি সবসময় মন থেকে করি। আগে একটা দলে ছিলাম। এখন বিজেপিতে। মানুষ আমায় চেনে। আমি মানুষের সুখে-দুঃখে থাকব, এটা তারা জানে।"

তিনবারের বিধায়ক চৌরঙ্গীর তৃণমূল প্রার্থী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক

চৌরঙ্গীর কংগ্রেস প্রার্থী মানস সরকার আত্মবিশ্বাসী জয় নিয়ে। তিনি বলছেন, ‘‘আমি আমার সংগঠনের ভরসায় জিতব। এখানকার বিধায়ককে পাওয়া যায় না। তা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ আছে। আর বিজেপির সন্তোষ পাঠক দলবদলু। কংগ্রেস ওকে এত দিল, আর ওই কংগ্রেসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল! নিজের ব‌্যবসা বাঁচাতে বিজেপিতে গিয়েছে। আবার কংগ্রেসের কর্মীদের কাছেই ভোট চাইছে। সোমেনদার মৃত্যুর পর সোমেনদাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এখানকার পুরনো কংগ্রেসিরা আর আমি। ক্ষমতায় না থেকেও লেবুতলা পার্কে আমি সোমেনদার মূর্তি বসিয়েছি। ৪৪ আর ৬২ নম্বর ওয়ার্ড সংখ‌্যালঘু অধ্যুষিত। তাঁরা বঞ্চিত। তাঁদের জন‌্য আলাদা করে কাজ করতে হবে। তাঁদের চোখ দেখে মনে হচ্ছে, জনসমর্থন আমিই পাব। বিজেপির প্রতীক অন্তত চৌরঙ্গিতে ফ‌্যাক্টর নয়। সন্তোষ পাঠককে লোকে চায় না। এআইসিসির এই রাজ্যের পর্যবেক্ষক গোলাম মীরকে বলেছি, আমি জিতব। জিতলে আগে এলাকার বস্তি উন্নয়ন করব। সব বেআইনি দোকান বন্ধ করে দেব।''

চৌরঙ্গীর কংগ্রেস প্রার্থী মানস সরকার সোমেন মিত্র 'ছায়া'। ছবি: অপ্রতিম পাল

তবে চৌরঙ্গীর ভোটঅঙ্ক এত সহজও নয়। ৪৮ থেকে ৫০ নম্বর ওয়ার্ড পুরনো কংগ্রেসের ডেরা হলেও সাময়িকভাবে এখানকার ভোট বিজেপির ব্যাঙ্কে চলে গিয়েছিল। বিজেপির সজল ঘোষ বা তাপস রায় এই কেন্দ্র থেকে দাঁড়ালে এবার কিছুটা ফ‌্যাক্টর হতো। অভিযোগ, বর্তমান বিজেপি প্রার্থী সন্তোষ পাঠক আগেরবার কংগ্রেসের হয়ে দাঁড়িয়ে হেরে যাওয়ার পর থেকে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি। ফলে কংগ্রেসের জনসমর্থন উলটোদিকে গিয়েছে। এত অঙ্ক সামলেও পাল্লা ভারী তৃণমূলেরই। তবে কংগ্রেস এবং বিজেপি লড়াইয়ে বেশ বেগ দিতে চলেছে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement