জঙ্গল ঢুঁড়তেই বেরিয়ে এল আস্ত এক শহর! তাও আবার এমন এক শহর, যা লোকচক্ষুর আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিল আজ থেকে ১০০০ বছর আগে। হলিউডি সিনেমার গল্প নয়, দিনের আলোর মতো জ্বলজ্বলে সত্যি। কারা সেই শহরের আদি বাসিন্দা? কেনই বা তা একদিন থেকে জনশূন্য হয়ে গেল?
প্রায় ৪৩ ফুট উঁচু একটি পিরামিড মন্দির পাওয়া গেছে, যা দেখতে চারতলা আবাসিক ভবনের সমান।
দক্ষিণ মেক্সিকোর ক্যাম্পাচে রাজ্যের কালাকমুল বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের (Calakmul Biosphere Reserve)— এ এক এমন দুর্গম জঙ্গল, যেখানে দিনের আলোতেও প্রবেশ করতে ভয় পায় মানুষেরা। রয়েছে নানা জংলি পশুর বাস। এখানেই খোঁজ মিলেছে এক প্রাচীন অক্ষত শহরের, যা বিশেষজ্ঞদের মতে মায়া সভ্যতার অংশ। শহরটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মিনানবে’ (Minanbe)। ইউকাতেক মায়া (Yucatec Maya) ভাষায় এই শব্দের অর্থ ‘সেখানে কোনও রাস্তা নেই’। অত্যন্ত দুর্গম ও যাতায়াতের কোনও পথ না থাকায় এই নামকরণ করা হয়েছে।
এখানে প্রায় ৪৩ ফুট উঁচু একটি পিরামিড মন্দির পাওয়া গেছে, যা দেখতে চারতলা আবাসিক ভবনের সমান। এছাড়া ১৪টি খোদাই করা বেদি ও স্তম্ভ রয়েছে। আবিষ্কৃত পিরামিড মন্দিরটিতে সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মায়া স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যবাহী ‘রিও বেক’ শৈলীর ছাপ রয়েছে।
আকাশ থেকে নেওয়া লিডার (LiDAR) স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে যে, শহরটি প্রায় ১৫ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। আন্দাজ করা যায়, এক কালে সুপরিকল্পিত নগর, চত্বর, রাজকীয় ও ধর্মীয় ভবন, বারান্দা এবং জলাভূমি ও কৃত্রিম খালের ব্যবস্থাপনা ছিল। অনুমান করা হয়, সেখানে পৌঁছানর কোনও সুনির্দিষ্ট রাস্তা না থাকার কারণেই দস্যুরা কখনও এই বসতি লুঠ করতে পারেনি।
মেক্সিকোর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যানথ্রোপোলজি অ্যান্ড হিস্ট্রি (INAH)-এর অনুমোদনে স্লোভেনিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড আর্টসের প্রত্নতাত্ত্বিক ইভান স্প্রাজকের নেতৃত্বে একটি যৌথ মেক্সিকান-স্লোভেনিয়ান গবেষক দল এই অভিযান চালায়। সেন্ট্রাল মায়া লোল্যান্ডসে দীর্ঘ তিন দশকের গবেষণার পর এই সাফল্য এল।
আন্দাজ করা যায়, এক কালে সুপরিকল্পিত নগর, চত্বর, সবই ছিল এখানে।
সাম্প্রতিকতম বছরগুলিতে অত্যন্ত বিরল এমন আবিষ্কার। প্রত্নতাত্বিকদের মতে, শহরটি লেট ক্লাসিক যুগ অর্থাৎ ৬০০-৯০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সচলাবস্থায় ছিল। যথেষ্ট সমৃদ্ধ ছিল এই মানব বসতি এবং আঞ্চলিক কৃষি ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। তবে খুঁটিয়ে গবেষণার পর তাঁরা জানিয়েছেন, হয়তো কোনও বহিরাগত শত্রুদল আক্রমণ করেছিল এই শহরটিকে। যার ফলে এক সময় এখানকার বাসিন্দারা প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে শহরটি ঘিরে গড়ে ওঠে জঙ্গল। কালের নিয়মে সকলেই ভুলে যায় সেই মায়ান শহরের কথা।
