কেরলের ত্রিশূরের ভাড়াক্কুনাথন মন্দিরের বার্ষিক পূরম উৎসবের সাক্ষী হতে প্রতি বছরই নামে মানুষের ঢল। এই উৎসবের অন্যতম প্রধান অঙ্গ হাতিদের শোভাযাত্রা। রাজকীয় সাজে সাজানো হয় প্রায় ১০০ হাতিকে, রাজপথ সাজিয়ে, বাদ্যি বাজিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, যা দেখতে উপচে পড়ে দর্শনার্থীদের ভিড়। নিকটবর্তী গুরুভায়ুর শ্রী কৃষ্ণ মন্দির, কুন্নামকুলামের সেন্ট জর্জ অর্থোডক্স সিরিয়ান চার্চ এবং পালাক্কড় জেলার পাট্টাম্বি মসজিদেও বছরের বিভিন্ন সময়ে হাতিদের শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।
কেরলের বিভিন্ন মন্দিরে হাতির শোভাযাত্রা
কিন্তু হাতির কাছে কি খুব আরামদায়ক এই অবস্থা? ঘণ্টার পর ঘণ্টা একইভাবে তাদের দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। সজ্জার ভারে শরীর নুয়ে আসে। জোরালো শব্দ, মুহুর্মুহু বাজি ফাটানো তো রয়েছেই। মানসিক চাপে অনেক সময় হাতি নিয়ন্ত্রণ হারায়। ২০২৪ সালে কেরলে উৎসব চলাকালীন হাতির আক্রমণে অন্তত ৯ জন নিহত হন। এ নিয়ে বহু বছর ধরেই সরব হয়েছে প্রাণীকল্যাণ সমিতিগুলি। আঙুল উঠেছে এই আচারের অমানবিকতার দিকে। তবু তা থেমে যায়নি।
সম্প্রতি এই ঐতিহ্যবাহী রীতিতে বদল আনতে সক্রিয় হয় প্রাণী অধিকার সংগঠন পেটা (PETA) ইন্ডিয়া। তাঁদের উদ্যোগে মোট ৪০টি রোবট হাতি (Robot elephant) দান করা হয়েছে কেরলের বিভিন্ন মন্দিরে। লোহা ও রাবার দিয়ে তৈরি এই হাতিগুলো কান নাড়াতে, লেজ দোলাতে, শুঁড় দিয়ে জল ছিটাতে পারে। তবে এখনও আসল হাতির হাঁটার ভঙ্গি রপ্ত করা সম্ভব হয়নি, যদিও নির্মাতারা ভবিষ্যতে সেই প্রযুক্তি যুক্ত করার চেষ্টা করছেন। প্রতিটির রোবট হাতির দাম প্রায় ৬ হাজার মার্কিন ডলার।
রোবট হাতির নির্মাতা প্রশান্ত প্রকাশন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, প্রকৃত হাতির বিকল্প তৈরি করা সম্ভব না-হলেও, তার সৌন্দর্য ও উপস্থিতি যতটা সম্ভব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। এই উদ্যোগে সাধুবাদ জানিয়েছেন কেরলের একাধিক পুরোহিত। যেমন, ইরিঞ্জাদাপিল্লি শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রাজকুমার নাম্বূদিরি মনে করেন, ধর্মীয় গ্রন্থে কোথাও জীবন্ত হাতি ব্যবহার বাধ্যতামূলক নয়। বর্তমানের কংক্রিটের শহর, তীব্র গরম ও শব্দে হাতিকে ব্যবহার করা বরং অমানবিকতারই পরিচায়ক।
ধাপে ধাপে প্রস্তুত হচ্ছে রোবট হাতি।
তবে ঐতিহ্যপন্থীদের অনেকেই সহজে মেনে নিতে পারছেন না প্রযুক্তির এই উন্নয়ন। তাদের মতে, হাতি শুধু প্রাণী নয়, পবিত্রতার প্রতীক। রোবট কখনওই জীবন্ত হাতির ধর্মীয় গুরুত্বের বিকল্প হতে পারে না।
সূত্র জানাচ্ছে, কেরলের বিভিন্ন মন্দিরে আজও বন্দি রয়েছে ৪০০-এর বেশি হাতি। রাতারাতি তা বদলানো সম্ভব নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কি পরিবর্তন আসবে? সে উত্তর কেবল সময়ের অপেক্ষা।
