চৌষট্টি খোপে আরও এক ভারতীয় কিশোরের কিস্তিমাত। মস্তিষ্কের লড়াইয়ে বিশ্বসেরা দাবাড়ু, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ম্যাগনাস কার্লসেনকে হারিয়ে চমকে দিল ১৫ বছরের বন্দন অলংকার সাওয়াই। চেস ডট কম-এর সাপ্তাহিক ব্লিৎজ টুর্নামেন্ট 'টিল্টেড টিউজডে'-তে নরওয়ের কিংবদন্তিকে হারিয়ে ভারতীয় দাবার তরুণ প্রতিভাদের তালিকায় নতুন সংযোজন দিল্লির এই দাবাড়ু।
সাদা ঘুঁটি নিয়ে খেলেছিল বন্দন। ৫০ চালের মধ্যেই বিশ্বসেরা কার্লসেনকে হারিয়ে দিল সে। ২৬তম চালে কার্লসেনের একটি ভুলই বদলে দেয় খেলার গতিবিধি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেয় ভারতীয় কিশোর। ম্যাচের পর বন্দনের মন্তব্য, "আমার কাছে হারানোর কিছুই ছিল না। তাই ঠান্ডা মাথায় নিজের স্বাভাবিক খেলাটাই খেলতে চেয়েছিলাম। কার্লসেন যখন ভুল করলেন, আমি সত্যিই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।"
ফিডে ক্লাসিক্যাল রেটিং যেখানে বন্দনের ২,২৮৮, সেখানে কার্লসেনের ২,৮২৩। অর্থাৎ রেটিংয়ের ব্যবধান প্রায় সাড়ে পাঁচশো পয়েন্ট! দিল্লির এই কিশোর অবশ্য ক্যান্ডিডেট মাস্টার। দুরন্ত জয়ের পরেও কোনও ঢাকঢোল পেটায়নি সে। বন্ধনের বাবা, প্রাক্তন ব্যাঙ্ককর্মী অলংকার সাওয়াই ওয়েবসাইট খুলে জানতে পারেন ছেলের কীর্তির কথা। শুনলে অবাক হবেন, কার্লসেনের বিরুদ্ধে খেলার জন্য প্রথমে নাকি রাজিই ছিল না এহেন বন্ধন। তাঁর মা মাধুরী অলংকার সাওয়াই একজন চিকিৎসক। সংবাদমাধ্যমকে বলেন, "বন্দন এসে বলেছিল, ও টুর্নামেন্ট খেলেছে। আমার স্বামী যখন জিজ্ঞাসা করে, তখন বন্দন জানায় কার্লসেনের বিরুদ্ধে খেলেছে ও জিতেছে।" ছেলের অনীহার কথা জানিয়ে মাধুরী বলেন, "বন্ধন প্রতিযোগিতায় খেলতে চাইছিল না। আমরা ওকে খেলতে জোর করেছিলাম।" অর্থাৎ জোর করে খেলেই দাবার মহাতারকাকে হারিয়ে দিল ১৫ বছরের কিশোর।
কার্লসেন-বধের পর অবশ্য আর টুর্নামেন্টে খেলেনি বন্দন। চতুর্থ রাউন্ড থেকে নাম তুলে নেয়। জানা গিয়েছে, ক্লান্তি এর কারণ। ১৫ বছর বয়সে কার্লসেনকে হারানোর নজির অবশ্য ভারতীয় দাবায় নতুন নয়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনলাইন এয়ারথিংস মাস্টার্স র্যাপিড টুর্নামেন্টে মাত্র ১৫ বছর বয়সে কার্লসেনকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছিল রমেশবাবু প্রজ্ঞানন্দ। আনন্দ এবং পেন্টালা হরিকৃষ্ণের পর কার্লসেনকে হারানো তৃতীয় ভারতীয় ছিল সে। পরবর্তীতে চেজেবল মাস্টার্স এবং নরওয়ে চেজের ব্লিৎজেও কার্লসেনের বিরুদ্ধে একাধিক জয় পেয়েছেন প্রজ্ঞানন্দ।
কার্লসেনের বিরুদ্ধে জয়ের তালিকায় রয়েছে ডি গুকেশের নামও। ২০২২ সালে অনলাইন র্যাপিড ম্যাচে প্রথমবার কার্লসেনকে হারিয়েছিলেন ভারতের বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। পরে ভারতীয় দাবার আরও কয়েকজন তরুণ তুর্কিও নরওয়ের কিংবদন্তিকে হারিয়েছেন। ২০২৩ সালের কাতার মাস্টার্সে কার্লসেনকে ক্লাসিক্যাল ফরম্যাটে হারিয়ে চমকে দিয়েছিলেন ভারতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার কার্তিকেয়ন মুরলী। ২০২০ সালে সেন্ট লুইস র্যাপিড অ্যান্ড ব্লিৎজের অনলাইন সংস্করণে কার্লসেনকে হারিয়েছিলেন পেন্টালা হরিকৃষ্ণ। ২০২২ সালে প্রথমবার কার্লসেনকে হারানোর স্বাদ পান অর্জুন এরিগাইসি। ২০২৪ সালে নরওয়ে চেজের ব্লিৎজে কিংবদন্তিকে হারিয়েছিলেন বিদিত গুজরাটি। সেই তালিকায় এবার নতুন নাম বন্ধন। মাত্র পনেরোতেই এই সাফল্য যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিল, ভারতীয় দাবার নতুন প্রজন্ম কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠছে।
