গ্লাসগোয় ইতিহাস লিখলেন বাঙালি কন্যা অস্মিতা দে। কমনওয়েলথ গেমসে জুডোয় ভারতের সোনা এনে দিলেন তিনি। শুক্রবার মহিলাদের ৪৮ কেজি বিভাগের ফাইনালে কানাডার হেইডি কোয়াচকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথম ভারতীয় জুডোকা হিসাবে কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জিতলেন ২২ বছরের অস্মিতা। প্রথম ভারতীয় পুরুষ হিসাবে সোনা জিতলেন হর্ষ সিং। দিনের শেষে রুপোলি সাফল্য যামিনী মৌর্যর। সব মিলিয়ে একদিনে জুডোয় মালামাল পারফরম্যান্স ভারতের।
ফাইনালের বেশ সতর্ক শুরু করেন অস্মিতা। দু'জনের মধ্যে চলছিল সেয়ানে সেয়ানে লড়াই চলছিল। মাঝপথে অবশ্য এগিয়ে যান কোয়াচ। এরপর কিছুটা চাপে পড়লেও মাথা ঠান্ডা রাখেন ভারতীয় জুডোকা। দ্রুত পালটা আক্রমণে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে সমতা ফেরান ক্রিপুরার মেয়ে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে লড়াইয়ের রাশ আরও শক্ত করে ধরেন ভারতীয় জুডোকা। একের পর এক আক্রমণে কোয়াচকে চাপে ফেলেন। কয়েকটি লকিংয়ের চেষ্টা পয়েন্ট অর্জন করতে না পারলেও দমে যাননি।
আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়ে প্রতিপক্ষের পালটা আক্রমণের আশঙ্কা দূর করেন তিনি। নির্ধারিত সময় শেষে স্কোর সমতায় থাকে। ম্যাচ গড়ায় 'গোল্ডেন স্কোর'-এ। সেখানেই শেষ হাসি হাসলেন অস্মিতা। ম্যাটের প্রান্তের কাছে দুরন্ত এক থ্রোয়ে জয়সূচক পয়েন্ট তুলে নিয়ে নিশ্চিত করলেন সোনা। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে ভারতীয় শিবির। সেমিফাইনালেও গোল্ডেন স্কোরে জিতেছিলেন ২২ বছরের অস্মিতা। স্কটল্যান্ডের সারাহ অ্যাডলিংটনকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন তিনি। তখনই পদক নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অস্মিতার লক্ষ্য ছিল আরও বড়। শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্যও পূরণ হল। তাঁর হাত ধরেই কমনওয়েলথ গেমসে জুডোয় প্রথম সোনা পেল ভারত।
এতদিন কমনওয়েলথ গেমসে জুডোয় এত দিন ভারতীয়দের ঝুলিতে ছিল পাঁচটি রুপো এবং ছ’টি ব্রোঞ্জ। সোনার পদক আসেনি কখনও। সেই আক্ষেপ মুছে ইতিহাস অস্মিতা দে-র। ফাইনালে কোয়াচকে হারিয়ে জুডোয় কমনওয়েলথের মঞ্চে ভারতের প্রথম সোনা এনে দিলেন তিনি। সোনা জয়ের পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি অস্মিতা। এসইসি হলে জাতীয় সঙ্গীত বাজতেই পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও।মোহময়। গ্যালারিতে সেই সময় উড়ছে তেরঙ্গা। গ্যালারিতে উপস্থিত ভারতীয় সমর্থকরা নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হলেন। ফাইনালে ওঠার পথও সহজ ছিল না ত্রিপুরার এই মেয়ের। কোয়ার্টার ফাইনালে স্কটল্যান্ডের এভা এউইংকে হারিয়েছিলেন অস্মিতা। শেষ চারের লড়াইয়ে তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন স্বদেশি সুমের শ। তাঁকে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেন ভারতীয় জুডোকা। তার পর শেষ লড়াইয়ে কোয়াচকে হারিয়ে সোনা জেতেন।
অস্মিতার সোনার রেশ কাটার আগেই জুডোয় ভারতের ঝুলিতে এল আরও একটি পদক। পুরুষদের ৬০ কেজি বিভাগে অস্ট্রেলিয়ার জশুয়া কাটজকে হারিয়ে সোনা জিতলেন হর্ষ সিং। অলিম্পিয়ান, চার বারের ওশিয়ানিয়া চ্যাম্পিয়ন এবং বার্মিংহ্যাম গেমসের ব্রোঞ্জজয়ী কাটজকে ওয়াজ-আরিতে হারিয়ে বড় অঘটন ঘটালেন হর্ষ। প্রথম বড় আন্তর্জাতিক পদকের খোঁজে নামা হর্ষ শুরু থেকেই ছিলেন দুরন্ত। প্রথম দু’টি ম্যাচে মালাওয়ির চিকোন্ডি কাটহেওয়ারা এবং ভানুয়াতুর অ্যালান মনথুয়েলকে ইপ্পনে হারান। সেমিফাইনালে আর এক অস্ট্রেলীয় পেদ্রো কার্লোস আন্তুন নেতোকে ওয়াজা-আরিতে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট পান তিনি।
ভারতীয় জুডোর কমনওয়েলথ-ইতিহাসে ১৯৯০ সালে প্রথম পদক এসেছিল নরেন্দ্র সিংহের হাত ধরে। সুশীল লিকমাবাম একমাত্র ভারতীয় জুডোকা, যিনি একাধিক কমনওয়েলথ গেমসে পদক জিতেছেন। ২০১৪ এবং ২০২২– দু’বারই রুপো পেয়েছিলেন তিনি। এবার সেই ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করলেন অস্মিতা। শুধু তিনি নন, ফাইনালে উঠেছিলেন হর্ষ সিং এবং যামিনী মৌর্যও। উল্লেখ্য, ৫৭ কেজি বিভাগের ফাইনালে ইংল্যান্ডের অ্যাচেলিয়া তোপ্রাকের বিরুদ্ধে রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে হারের পর রুপো নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় যামিনীকে।
জুডোর পাশাপাশি বক্সিংয়েও ভারতের দাপট। পাঁচ ভারতীয় বক্সার পদক নিশ্চিত করেছেন। মহিলাদের ৭০ কেজি বিভাগে ওয়েলসের রোসি একলেসকে ৪-০ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছেন অরুন্ধতী চৌধুরী। ৫৭ কেজিতে জেসমিন ল্যাম্বোরিয়া, ৫৪ কেজিতে প্রীতি পাওয়ার, ৮০ কেজিতে অন্তিম পঙ্ঘাল এবং ৫৫ কেজিতে জাদুমণি সিংহও পৌঁছে গিয়েছেন ফাইনালে। জেসমিনের দাপট এমনই ছিল যে রেফারিকে মাঝপথেই লড়াই থামাতে হয়। জাদুমণি ৫-০ ব্যবধানে হারান নামিবিয়ার পিএম হাওসেবকে। একই ব্যবধানে জাম্বিয়ার ক্যাথরিন এমওয়াপেকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছন প্রীতিও। জুডোয় প্রথম সোনা। বক্সিংয়ে পাঁচ ফাইনালিস্ট। কমনওয়েলথের মঞ্চে ভারতীয় পতাকা যে আরও কয়েক বার উঠতে চলেছে, তার ইঙ্গিত দিয়ে রাখল ভারতীয় দল। ভারতের এখন ৫ সোনা, ১১ রুপো, ৪ ব্রোঞ্জ-সহ সব মিলিয়ে ২০ পদক নিয়ে নবম স্থানে। সোনার সংখ্যা বাড়লে নিশ্চিতভাবেই পদক তালিকায় উপরে উঠবে ভারত।
