প্রতিটি বিনিয়োগকারী আলাদা। তাঁদের প্রয়োজন, উদ্দেশ্য এবং লগ্নির দৃষ্টিভঙ্গিও আলাদা। কিন্তু একটি বিষয় ‘কমন’। আর তা হল, তাঁর উপার্জিত অর্থের যাতে সদ্ব্যবহার হয়, তা সুনিশ্চিত করা। আর্থিক নিরাপত্তা যাতে কোনওমতেই ক্ষুণ্ণ না হয়, তার অভয় দেওয়া। উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বললেন সীবলী মুখার্জি।
তিনটি পথ, একটিই ভবিষ্যৎ
ভারতের আর্থিক জাগরণের প্রেক্ষাপটে, একটা মাত্র ১০০ টাকার নোট ঝুঁকি নেওয়ার, ধৈর্য ধরার এবং প্রজ্ঞার ভিন্ন ভিন্ন গল্প বলে। একটা ছোট ১০০ টাকার নোট কল্পনা করুন। দেখতে সামান্য। কিন্তু এই টাকাই ১০-১৫ বছর পর আপনার জীবনে অনেক কিছু করতে পারে। সব কিছু নির্ভর করে আপনি আজ এই
টাকাটা কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করছেন তার উপর। চলুন, চারজন মানুষের গল্প দিয়ে বিষয়টা খুব সহজ করে বুঝি।
নিরাপদ রমেশ: টাকা আছে, কিন্তু শক্তি কমে গিয়েছে
রমেশের কাছে নিরাপত্তাই সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা। তঁার মাসিক ১০০ টাকা পোস্ট অফিসের প্রকল্পে নিরাপদে জমা থাকে, যা লক্ষ লক্ষ সতর্ক মানুষের কাছে খুব কদর পায়। এঁদের কাছে ফিক্সড ডিপোজিটই সমস্ত বিশ্বাসের মূল। কেবল ৬.৫% হারে ১৫ বছর ধরে নিয়মিত সঞ্চয়ের পর, মাসিক ১০০ টাকা প্রায় ৩১,৩০০ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। তবে সাধারণ ভাবে ৫% গড় মুদ্রাস্ফীতির কারণে, এঁর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে মাত্র ২১,০০০ টাকায় দাঁড়ায়। এখানে মূলধন সংরক্ষিত থাকে, কিন্তু এর বৃদ্ধি ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে না।
ঝুঁকি-নেওয়ায় পটু অর্জুন
বড় স্বপ্ন, ছোট ফল এর বিপরীতে রমেশের বন্ধু অর্জুনকে দেখুন, যিনি একই ১০০ টাকাকে পুঁতে ফেলার বীজ হিসেবে নয়, বরং একটা স্ফুলিঙ্গ হিসেবে দেখেন। কোনও এক প্রযুক্তি কেন্দ্রে কাজ করার সুবাদে, তিনি ক্রিপ্টো কোটিপতি এবং ডে ট্রেডারদের গল্পে সব সময় প্রভাবিত। তঁার কাছে বাজার একটা ডিজিটাল ক্যাসিনোর মতো। তিনি হয়তো তঁার ১০০ টাকা ফিউচার এবং অপশনে (F&O) ঢেলে দেন, দ্রুত দ্বিগুণ লাভের নেশায়। কিন্তু বাজার একদম নির্মম। সেবির তথ্য একটা কঠিন সত্য নিয়ে এই প্রসঙ্গে বলি: ৯০% বা তারও বেশি বিনিয়োগকারী ইক্যুইটি ডেরিভেটিভে টাকা হারায়। ১৫ বছর ধরে ট্রেডিং এবং বড়সড় খরচের পর, তার আগ্রাসী হাবভাবের জন্য সম্পদের পরিমাণ ১৫,০০০ টাকারও কমে যেতে পারে। আমার কাছে এটা খুব স্পষ্ট শিক্ষা–কৌশল ছাড়া স্ফুলিঙ্গ নিভে যায়।
বুদ্ধিমতী প্রিয়া: ধীরে চলেও অনেক দূর
আরও বুদ্ধিমানের মতো পথ দেখিয়েছেন প্রিয়া, যিনি নিজে একজন স্মার্ট বিনিয়োগকারী। তিনি তঁার ১০০ টাকাকে ভাল ভাবেই সাজিয়েছেন: ৫০ টাকা ইক্যুইটিতে (১২% সিএজিআর বা CAGR), ৩০ টাকা ডেটে (৭% সিএজিআর), এবং ২০ টাকা সোনায় (৮% সিএজিআর)। ১৫ বছর পর, এই সুন্দর ৫০:৩০:২০ পোর্টফোলিওটা প্রায় ৩৮,০০০ টাকায় পরিণত হবে। বলে রাখা দরকার, বাজারের অস্থিরতা থাকবেই। পোর্টফোলিওতে যদি বৈচিত্র্য থাকে তাহলে পড়ে যাওয়ার সময় সামলে দেবে। ইনভেস্টর সঠিক পথে থাকতে পারবেন। এটাই ম্যারাথন দৌড়ের কৌশল- ধারাবাহিক, নিয়মিত এবং শেষ পর্যন্ত আরও ফলপ্রসূ।
আরতি: ছোট শুরু, বড় সাফল্য
এবার বলি আরতির কথা, ইনি একজন শিক্ষিকা। ইদানিং এমন বিনিয়োগকারীর সংখ্যার শেষ নেই। একটা ব্যালেন্সড ফান্ডে মাসে মাত্র ৫০০ টাকার এক সাধারণ এসআইপি শুরু করেছেন আরতি। সেই লক্ষ লক্ষ নারীর প্রতিনিধিত্ব করছেন যাঁরা এখন মিউচুয়াল ফান্ড সম্পদে ১২ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি সঞ্চয় নিয়ন্ত্রণ করেন। ১৫ বছরে তঁার ৯০,০০০ টাকার বিনিয়োগ, যা মাঝারি ১১% সিএজিআর হারে বেড়ে প্রায় ২.৩ লক্ষ টাকায় চলে যাবে। তিনি দেশের শীর্ষ ৩০টা শহরের বাইরে থাকা নতুন মহিলা বিনিয়োগকারীদের ৭২ শতাংশের একজন। এটা কম কথা নয়।
শেষ কথা
মৌলিক প্রশ্নটা থেকেই যায়: আপনার একশো টাকা কততে পরিণত হবে? এ কি রমেশের মতো অর্থের নিরাপত্তাহীনতা, না অর্জুনের মতো নিঃশেষ হয়ে যাওয়া বাজি? নাকি প্রিয়া এবং আরতির মতো চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পাওয়া ফসল? আপনি কী বলেন?
আমার মতে ‘আমার টাকা’ হল আপনার নিজের লেখা গল্প। বিকল্পে ভরপুর একটা বিরাট অর্থনীতি আমাদের চোখের সামনে। আপনার সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি হল সময়। তা ব্যবহার করুন। ভাগ্যে কী আছে, তা নিয়ে বেশি চিন্তিত হবেন না। আপনার পথ বেছে নিন। আজ ছোট সিদ্ধান্ত, কাল বড় ফল। আপনার ভবিষ্যৎ সত্তা এর জন্য আপনাকেই ধন্যবাদ জানাবে।
