দেশের স্টক মার্কেটে নিজের সমস্ত টাকা না রেখে বিদেশে তার কিছুটা লগ্নি করুন। এমন পরামর্শ দিচ্ছেন মার্সেলাস ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজার্সের কর্ণধার সৌরভ মুখার্জি। পশ্চিমের বাজারে বিনিয়োগ করার নিয়মকানুন সরল হয়েছে, এখন সহজে তা করা যেতে পারে। ভারতের বাজারে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন আজকের ইনভেস্টররা? এক্সক্লুসিভ প্রশ্নোত্তর, নীলাঞ্জন দে'র সঙ্গে।
ইক্যুইটির ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে ডোমেস্টিক ইনভেস্টরদের সামনে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে?
দেখুন, দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সামনে চ্যালেঞ্জ মূলত তিন দিক থেকে আসছে। প্রথম, গত কয়েক বছরে উপার্জনের ক্ষেত্রে এমন মন্দা দেখা গিয়েছে, যার নজির সাম্প্রতিক দশকগুলোয় প্রায় নেই বললেই চলে। দ্বিতীয়, এমন দীর্ঘস্থায়ী দুর্বল হারে আয় বৃদ্ধির সঙ্গে রয়েছে উচ্চ ভ্যালুয়েশন, যা ভারতীয় বাজারে ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় (এবং অন্যান্য বড় শেয়ারবাজারের তুলনায়ও) বেশি। তৃতীয়, ভবিষ্যতের দিকে তাকান। দেখবেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আমাদের দেশের বহু হোয়াইট-কলার পেশায়–যেমন ধরুন, আইটি পরিষেবা, কল সেন্টার, মিডিয়া ও খুচরো ব্যবসা–বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থান হ্রাসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, আমার বিশ্বাস।
আপনার মতে বাজেট ২০২৬ এবং সাম্প্রতিক কালে নেওয়া ম্যাক্রো নীতি সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলো বিনিয়োগকারীদের উপর কী প্রভাব ফেলবে?
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের সরকারি বাজেট সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির পক্ষে ইতিবাচক। এই প্রসঙ্গে বলি, এখানে তিনটে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা মাথায় রাখতে হবে। এগুলোর মধ্যে দুটো মধ্যম ও একটা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের অর্থনীতির স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক। সংক্ষেপে বলি–
* এক, দেশে ফিউচারস ও অপশনস (F&O) লেনদেনে সিকিউরিটিজ ট্রানজ্যাকশন ট্যাক্স (STT) বেড়েছে। অপ্রয়োজনীয় (ও অনুৎপাদনশীলও বটে) ট্রেডিং থেকে মূলধনকে সরানো যাবে। আর প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, যেমন কনজামপশনে খরচ, বাড়ানো সম্ভব হবে।
* দুই, ব্যাঙ্কিং ও আর্থিক ক্ষেত্রে পর্যালোচনার জন্য একটা উচ্চস্তরের কমিটি গঠন করা হবে। সরকারি ব্যাঙ্কগুলির বেসরকারিকরণের পথ প্রশস্ত হতে পারে। এবং এর ফলে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মূলধন আসতে পারে।
* তিন, এখানে বলে রাখি, একটা নেতিবাচক দিকও আছে। কর আদায়ের গতি শ্লথ হওয়ার প্রেক্ষাপটে মূলধনী ব্যয় (capex) বৃদ্ধি কম হতে পারে। আর বাড়তি সরকারি ব্যয় বন্ডবাজারে চাপ সৃষ্টি করে তহবিলের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।
সম্পদ বণ্টন বা অ্যাসেট অ্যালোকেশনের সময় দেশীয় বিনিয়োগকারীদের কেন গ্লোবাল ইক্যুইটিতেও বিনিয়োগ করা উচিত বলে মনে করেন আপনি? এতে স্থানীয় বিনিয়োগ মহলে কী ধরনের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
এটি খুব জরুরি প্রসঙ্গ। জানিয়ে রাখি, ভারতীয় শেয়ারবাজার বিশ্বের মোট বাজারমূল্যের মাত্র ৩.৫% বা তার আশেপাশে। বিপরীতে, আমেরিকা ও ইউরোপের বাজার মিলিয়ে এই সংখ্যাটা প্রায় ৭০%।
ব্যাপারটা তলিয়ে ভাবুন। পশ্চিমা বাজার মাপেবহরে শুধু বড়ই নয়, ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও চারটে নির্দিষ্ট সুবিধা দেয়। একে একে বলি।
১) প্রায় যে কোনও সময়সীমায় আমেরিকায় কর্পোরেট মুনাফা ভারতের তুলনায় দ্রুত বাড়ে, দেখা গেছে।
২) আমেরিকা ও ইউরোপের মিডক্যাপ সংস্থাগুলোর একাংশ বেশ জোরদার বাড়ছে। এবং সেগুলি তুলনামূলকভাবে কম বা আকর্ষনীয় ভ্যালুয়েশনে পাওয়া যায়।
৩) পশ্চিমা বাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যায় অ্যারোস্পেস, বায়োটেক, সুপার লাক্সারি ভোগ্যপণ্য, টেক ইউটিলিটিজ ইত্যাদি।
৪) ভারতীয় ও আমেরিকান বাজারের পারস্পরিক সম্পর্ক কম। এর ফলে উভয় বাজারে সমানভাবে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি কমিয়ে রিটার্ন বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকে।
আমরা দেখতে পাচ্ছি কীভাবে ভারত সরকার, GIFT সিটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্ক যৌথভাবে নানা ইতিবাচক পরিকল্পনা নিচ্ছে। এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে ভারতীয়রা GIFT সিটির মাধ্যমে সহজ, কর-সাশ্রয়ী ও ব্যয়-সাশ্রয়ী (ট্যাক্স এফিসিয়েন্ট ও কস্ট এফিসিয়েন্ট) উপায়ে বিশ্বের বাজারে বিনিয়োগ করতে পারেন। গত এক বছরের কথা ভাবুন–GIFT সিটির মাধ্যমে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি ভারতীয় মূলধন বিদেশি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হয়েছে।
খুচরো বিনিয়োগকারীদের বা রিটেল ইনভেস্টরদের ক্ষেত্রে মার্সেলাস ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজার্সের পরিকল্পনা কী? এ বিষয়ে আপনারা কীভাবে এগোতে চান?
প্রথমে মার্সেলাসের অফারগুলো নিয়ে বলি। ভারতের মূল ভূখণ্ডে এবং GIFT সিটিতে উচ্চ ন্যূনতম বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। কারণ মিউচুয়াল ফান্ডের লাইসেন্স ছিল না। বর্তমানে, মূল ভারতে এবং GIFT সিটিতে (উভয় ক্ষেত্রেই) আগামী কয়েক মাসের মধ্যে মিউচুয়াল ফান্ড লাইসেন্স পাওয়ার লক্ষ্যে আমরা এগোচ্ছি। এই লাইসেন্স পেলে রিটেল বা ছোট বিনিয়োগকারীরা মার্সেলাসের দেশীয় প্রকল্প (যেগুলো ভারতে বিনিয়োগ করে) এবং গ্লোবাল প্রকল্প (যেগুলি পশ্চিমা অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করে) উভয় ক্ষেত্রেই অংশগ্রহণের সুবিধা পাবে। আমাদের দেশে রিটেলের জন্য সুযোগ বাড়ছে, এই ট্রেন্ড জারি থাকবে বলে আমরা মনে করি।
