Advertisement
যাযাবরের জীবন থেকে জম্মু-কাশ্মীরের রনজি জয়, নয়া সূর্যোদয়ে লক্ষ্যপূরণ কর্তাদেরও
চ্যাম্পিয়ন দলের জন্য ২ কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী।
ইতিহাস রনজি ট্রফিতে। প্রথমবার রনজি চ্যাম্পিয়ন হল জম্মু ও কাশ্মীর। শক্তিশালী কর্নাটককে হারিয়ে তাদের এই সাফল্য। ফাইনালে প্রথম দিন থেকে তাদের সামনে কল্কে পায়নি কেএল রাহুল, ময়ঙ্ক আগরওয়াল, দেবদত্ত পাড়িক্কলদের দল।
রনজি ফাইনালে প্রথম ব্যাট করতে নেমে ৫৮৪ রানের পাহাড় গড়ে জম্মু-কাশ্মীর। সেঞ্চুরি হাঁকান শুভম পুণ্ডির। জবাবে কর্নাটকের ইনিংস শেষ হয় ২৯৩ রানে। ৫৪ রান দিয়ে তুলে নেন ৫ উইকেট তুলে নেন আকিব নবি। শনিবারের ভরদুপুরে কর্নাটকের বোলারদের পিষে দিয়ে সেঞ্চুরি পূরণ করার পরই ৪ উইকেট হারিয়ে ৩৪২ রানে জম্মু ও কাশ্মীর ডিক্লেয়ার ঘোষণা করে। অমীমাংসিত হার মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না কর্নাটকের। এর সঙ্গে প্রথমবার ‘ভারতসেরা’ হয় জম্মু ও কাশ্মীর।
এর পরেই আসমুদ্রহিমাচল জুড়ে তাদের জন্য শুভেচ্ছাবার্তা উড়ে আসতে থাকে। তাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন আইসিসি প্রধান জয় শাহ। গ্যালারিতে উপস্থিত জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাও আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠেন। ইতিমধ্যেই তিনি চ্যাম্পিয়ন দলের জন্য ২ কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন।
কর্নাটক দলে অন্তত পাঁচ জন এমন ক্রিকেটার রয়েছেন, যাঁরা ভারতীয় দলে খেলেছেন। কেএল রাহুল, ময়াঙ্ক আগরওয়াল, দেবদত্ত পাড়িক্কল, করুণ নায়ার, প্রসুদ্ধ কৃষ্ণ। তার উপর ঘরের মাঠে খেলেছিল কর্নাটক। কিন্তু এই 'যৎসামান্য' প্রতিকূলতায় দমবার পাত্র ছিলেন না জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটাররা। বিপক্ষের ডেরায় গিয়ে রনজি ট্রফি ছিনিয়ে আনল জম্মু ও কাশ্মীর।
যৎসামান্য শব্দটি কোটের মধ্যে রাখার একটা কারণ অবশ্য আছে। কারণ এর চেয়ে অনেক বেশি প্রতিকূলতা সামলাতে হয় জম্মু-কাশ্মীরের খেলোয়াড়দের। ঋতু অনুযায়ী বদলে যায় ঠিকানা। শীতে তাঁদের পাওয়া যায় জম্মুর মাঠে। পারদ একটু চড়লে চলে আসেন শ্রীনগরে। আবার কখনও কখনও দেখা মেলে পণ্ডিচেরিতে। এভাবেই সারা বছর ‘যাযাবর’ হয়ে ঘুরে ঘুরে ক্রিকেট খেলেন জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটাররা। যাঁদের সিনিয়র দল প্রথমবার রনজি চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
এমনিতে জেকেসিএ-র অধীনে কোনও ক্লাব ক্রিকেট হয় না। খেলা হয় মূলত আন্তঃজেলা পর্যায়ে। সেখান থেকে নির্বাচকরা ট্রায়ালের জন্য ক্রিকেটারদের পছন্দ করেন। তারপর একাধিক পর্যায়ে চলে প্রতিভার পরীক্ষা। কীভাবে চলে এই প্রোগ্রাম? নির্বাচকরা জেলায় জেলায় গিয়ে বিভিন্ন বয়সের বিভাগে ট্যালেন্ট হান্ট ট্রায়াল নেন। সেই নির্বাচিত প্লেয়ারদের নিয়ে ক্যাম্প হয়। এই ক্যাম্পের সংখ্যা এবং দিন নির্ভর করে প্লেয়ারের সংখ্যার উপর। সেখান থেকে কিছু প্লেয়ার সুযোগ পান পরবর্তী স্তরে। তাঁদের নিয়ে আসা হয় জম্মু ও শ্রীনগরে।
এরপর শুরু হয় ট্রায়ালের দ্বিতীয় পর্ব। সেখানে আগের বছরের ট্রায়ালের দ্বিতীয় পর্ব থেকে বাদ পড়া প্লেয়ারদের সঙ্গে বর্তমান দল এবং নতুন নির্বাচিতদের মিলিয়ে ম্যাচ হয়। এরকম পাঁচ-ছ’টা ম্যাচের পর জনা ষাটেক প্লেয়ারের পুল হয়। তাঁরা নিজেদের মধ্যে খেলার পর শেষে ৩০ জনকে নিয়ে চূড়ান্ত স্কোয়াড তৈরি করে জেকেসিএ।
জম্মু-কাশ্মীরে ক্রিকেটকে বদলে দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে আরও একটা নাম। মিঠুন মানহাস। বর্তমান বিসিবিআই সভাপতি কিছুদিন আগেও জেকেসিএ-র পরিচালন কমিটিতে ছিলেন। ট্যালেন্ট হান্টের মতো পদক্ষেপ অনেকটাই তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত। সঙ্গে আরও নানাবিধ উদ্যোগ।
যেমন, ভারতের বিভিন্ন মাঠে লাল মাটির উইকেটে খেলা হয়। সেখানে জম্মু-কাশ্মীরে সব উইকেট কালো মাটির। ফলে দল যাতে বাইরে খেলতে গিয়ে সমস্যায় না পড়ে, তাই হাতে থাকা দু’টো মাঠেই লাল মাটির উইকেটের ব্যবস্থা করেন মিঠুন। যার ফল হাতেনাতে পেয়েছে তারা। সত্যিই, কর্তাদের এমন ‘ভিশন’ রনজি চ্যাম্পিয়ন হতে সাহায্য করেছে জম্মু-কাশ্মীরকে।
ফিনিক্স পাখির মতো জম্মু-কাশ্মীরের এই উত্থানের গল্প বাহবা কুড়িয়ে নিচ্ছে। রনজি ফাইনাল কর্নাটকের হুবলির মাঠে হলেও কিছু সমর্থক হাতে নিয়ে এসেছিলেন প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা ছিল, 'আকিব নবি, হাম তুমহারে কর্জদার হ্যায়।' (আকিব নবি, আমরা তোমার কাছে ঋণী)। এবার দিল্লি ক্যাপিটালস ৮.৪ কোটি টাকায় কিনে নিয়েছে। কেন কিনেছে, তা বারবার বোঝাচ্ছেন আকিব। ৫৪ রান দিয়ে তুলে নেন ৫ উইকেট। সব মিলিয়ে উইকেট সংখ্যা ৬০। তৃতীয় পেসার হিসেবে এক মরশুমে এত উইকেট তোলার নজির গড়লেন তিনি। আকিবই হলেন প্রতিযোগিতার সেরা ক্রিকেটার।
আকিবের জন্ম বারামুল্লায়। যে শহর বারবার জঙ্গি হামলার কারণে খবরে উঠে এসেছে। তাঁর উত্থানের নেপথ্যে এই শহর। আকিবের প্রশংসা করেছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও। ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছিলেন, 'জম্মু ও কাশ্মীর দেখিয়ে দিয়েছে চেষ্টা ও ইচ্ছাশক্তি কী করতে পারে। গোটা প্রদেশকে তারা গর্বিত করেছে। কঠিন পরিবেশে কঠিন মানুষ তৈরি হয়। আকিব নবি জাতীয় দলের জার্সি পরার দৌড়ে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজ থেকেই সেটা শুরু হতে পারে।' কথাটা কি গৌতম গম্ভীর শুনতে পাচ্ছেন?
Published By: Prasenjit DuttaPosted: 05:13 PM Feb 28, 2026Updated: 08:22 PM Feb 28, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
