Advertisement
১২ মিনিটের উড়ানে কংগ্রেসের 'পতনে'র সূচনা! এক বিমান দুর্ঘটনাই বদলে দেয় ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস
সেদিনের দুর্ঘটনার নেপথ্যে কে? রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছিল কারা?
বিমান দুর্ঘটনায় অজিত পওয়ারের মৃত্যুর পর তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এসব নিয়ে বিস্তর আলোচনা, লেখালেখি হচ্ছে। বস্তুত পওয়ারের মৃত্যুর পর সত্যিই বদলে যাবে এনসিপির রাজনীতি। দলের অস্তিত্ব নিয়েও যে প্রশ্ন উঠে যেতে পারে, সেই আশঙ্কা অমূলক নয়। অতীতে তেমন উদাহরণও রয়েছে। এমনকী কংগ্রেসের মতো বৃহৎ রাজনৈতিক দলের ইতিহাসও অনেকাংশে বদলে দিয়েছে এই বিমান দুর্ঘটনা।
১৯৮০ সালের ৩০ জুন। বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় কংগ্রেসের 'রাজকুমার' সঞ্জয় গান্ধীর। মাত্র ১২ মিনিটের উড়ানেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যান সঞ্জয়। সন্তানের স্রেফ ঘড়ি খুঁজে পান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা।
সেদিন সকালে কুর্তা পাজামা ও কোলাপুরি জুতো পরে সফদরজং বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন সঞ্জয় গান্ধী। ১০ মিনিটের মধ্যেই বিমানবন্দরে পৌঁছে যান তিনি। এরপর চড়ে বসেন নিজের প্রিয় বিমানের ককপিটে। সামনের আসনে ছিলেন তাঁর প্রশিক্ষক ক্যাপ্টেন সুভাষ সাক্সেনা।
এমনিতে সঞ্জয় বিমান চালনায় পারদর্শী ছিলেন। ১৯৭৬ সালে পাইলট হিসেবে লাইসেন্স নেন এবং অ্যারোবেটিক চালনায় তাঁর দক্ষতা ছিল। কিন্তু সেদিন তিনি যে বিমানটিতে চেপেছিলেন, সেটা তার আগে মাত্র ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট ওড়ানোর অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রাখেন ইন্দিরা-পুত্র। আসলে বরাবরই বড্ড বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন ইন্দিরাপুত্র।
সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে মাটি ছাড়ে সঞ্জয় গান্ধীর বিমান। কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশের বুকে স্টান্ট শুরু করেন সঞ্জয়। বিমান ঠিক কতটা উচ্চতায় রয়েছে তা আন্দাজ করতে পারেননি সঞ্জয় গান্ধী। যার জেরে বিমানের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন তিনি। নিয়ন্ত্রণহীন বিমানের একটি ডানা ধাক্কা খায় একটি নীম গাছে। সকাল ৮টা ১০, অর্থাৎ ঠিক ১২ মিনিটের মধ্যে ভেঙে পড়ে বিমানটি। ঘটনাস্থলে সঞ্জয়ের শুধু মৃত্যু হয়েছিল।
সঞ্জয়ের মৃত্যু ঠিক কেন ঘটেছিল? নেপথ্যে কি কোনও ষড়যন্ত্র ছিল? সে নিয়ে পরে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। বিস্তর জল্পনা, কল্পনাও হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে রাজনৈতিকভাবে কার লাভ হচ্ছে, সেসব অঙ্কও কষা হয়েছে। কিন্তু সেসব প্রশ্নের উত্তর আজও অধরা। তবে সঞ্জয়ের মৃত্যু অর্থাৎ ওই ১২ মিনিটের ওই উড়ান ভারতীয় রাজনীতিতে অনেক বদল এনে দিয়েছে।
অনেকে মনে করেন, ইন্দিরার থেকে অনেক বেশি আগ্রাসী, অনেক বেশি ক্ষুরধার এমনকী অনেকবেশি 'নিষ্ঠুর' ছিলেন সঞ্জয়। তবে তাঁর দূরদৃষ্টি নিয়ে কারও কোনও সংশয় ছিল না। সঞ্জয় আধুনিক ভারতের স্বপ্ন দেখতেন, দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ্ব ভারতের স্বপ্ন দেখতেন। আজকের দিনে এসে সরকার যে সব ভাবনাচিন্তা করছে সেই সাতের দশকে তাঁর ভাবনায় সেসব পরিলক্ষিত হত।
জরুরি অবস্থার সময় ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এবং কংগ্রেসের ভেতরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করার দায়িত্ব সঞ্জয়ের হাতে ছিল। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বসতি উচ্ছেদ, স্বচ্ছ্বতার নীতি, সেসময় সমালোচিত হলেও সেগুলির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ছিল না কারও। বস্তুত সামান্য সময়ে কংগ্রেসের অন্দরে কার্যত একাধিপত্য কায়েম করে ফেলেছিলেন সঞ্জয়। অনেকেই তাঁর মধ্যে ইন্দিরার ছায়া দেখতে পেতেন।
শোনা যায়, ইন্দিরা গান্ধীও সঞ্জয়কেই নিজের উত্তরাধিকারী হিসাবে দেখছিলেন। সেকারণেই দলীয় নেতাদের কাছে বিস্তর অভিযোগ পাওয়া সত্ত্বেও কখনও সঞ্জয়কে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেননি। বরং তিনি অনেক ক্ষেত্রেই তাঁকে ছাড় দিয়েছেন। অনেক 'অন্যায়' প্রশ্রয় দিয়েছেন। তাছাড়া রাজীব গান্ধী ইন্দিরার বড় ছেলে হওয়া সত্ত্বেও সেভাবে রাজনীতিতে আগ্রহ দেখাননি। তিনি রাজনীতি থেকে দূরে থেকে ব্যবসা বাণিজ্যেই মত্ত থাকতেন। পরিবারের অন্দরেও সকলের কাছে স্পষ্ট ছিল সঞ্জয় ইন্দিরার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হবেন।
কিন্তু ওই বিমান দুর্ঘটনা সবটা বদলে দিল। ছোট ছেলেকে হারিয়ে ধীরে ধীরে বড় ছেলেকে রাজনীতিতে নিয়ে এলেন। ইন্দিরার আকস্মিক মৃত্যুর পর রাজীব গান্ধীই দল ও সরকারের উত্তরাধিকার পান। অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী হতে হয় রাজীবকে। তারপর থেকে দলের ব্যাটন চলে যায় রাজীব পরিবারের হাতে। পরে কংগ্রেসের সভাপতি হন সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধীরা। রাজীবের পর সোনিয়ার নেতৃত্বেও সরকার চালিয়েছে কংগ্রেস।
সমস্যা হল, বর্তমানে কংগ্রেসের যে অবক্ষয় সেটা শুরু হয় রাজীবের আমলের শেষের দিকেই। দল দুর্বল হতে থাকে। ধর্মনিরপেক্ষতা হারাতে থাকে। কেন্দ্রীয় স্তরে শক্তিশালী নেতা না থাকায় সংগঠনের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারায় শীর্ষ নেতৃত্ব। রাজীবের মৃত্যুর পর কংগ্রেস ক্রমশ দুর্বলই হয়ে গিয়েছে। সোনিয়া গান্ধী সরকার চালালেও সেটা জোড়াতালি দিয়ে। আর রাহুলের আমলে ক্রমশ ভোটে হেরেই চলেছে কংগ্রেস। এই মুহূর্তে দেশের মাত্র ৩ রাজ্যে কংগ্রেসের সরকার।
Published By: Subhajit MandalPosted: 05:13 PM Jan 29, 2026Updated: 05:13 PM Jan 29, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
