shono
Advertisement
Bankura Shikal Bandha Durga

ঠাকুরদালানে বেঁধে রাখা হয় দেবীকে, বাংলার 'শিকল বাঁধা দুর্গা'র মাহাত্ম্য জানেন?

এই ব্যতিক্রমী প্রথার নেপথ্য কারণ ঘিরেই রয়েছে পরিবারের পুরনো এক কাহিনি।
Published By: Sayani SenPosted: 08:00 AM Sep 15, 2026Updated: 04:16 PM Sep 14, 2026

দুর্গাপুজোয় মায়ের আরাধনা হয় নানা রীতি রেওয়াজ মেনে। কোথাও প্রাচীন আচার, কোথাও বিশেষ ভোগ, কোথাও আবার রয়েছে বংশপরম্পরায় চলে আসা নিজস্ব নিয়ম। কিন্তু মেজিয়ার পালবাড়ির দুর্গাপুজোর রীতি যেন সব কিছুকে ছাপিয়ে আলাদা। এখানে দুর্গাপ্রতিমাকে কাঠের পাটাতন-সহ শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। পুজোর দিনগুলিতে দেওয়ালের একটি আংটার সঙ্গে সেই শিকল দিয়ে বাঁধা থাকে প্রতিমা। এই অদ্ভুত প্রথার কারণ ঘিরেই রয়েছে পরিবারের পুরনো এক কাহিনি।

Advertisement

বাঁকুড়ার মেজিয়ার পালবাড়িতে দুর্গাপুজো চলে আসছে প্রায় ৩০০ বছর ধরে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সেই পুজোয় আজও মানা হয় পুরনো রীতিনীতি। তবে প্রতিমাকে কেন শিকলে বাঁধা হয়, ঠিক কবে থেকে এই প্রথার সূচনা তার নির্দিষ্ট উত্তর পরিবারের বর্তমান সদস্যদের কাছেও নেই। পাল পরিবার সূত্রে জানা যায়, কোনও এক সময়ে অষ্টমীর দিন পুজো চলাকালীন হঠাৎই নাকি কেঁপে উঠেছিল প্রতিমা। পরিবারের সদস্যদের কথায়, প্রতিমা কিছুটা হেলে পড়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই নাকি পুজোর দিনগুলিতে প্রতিমা-সহ কাঠের পাটাতন শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার রীতি শুরু হয়। তবে ঘটনাটি ঠিক কোন সময়ে ঘটেছিল, তার নির্দিষ্ট সাল বা সময়কাল পরিবারের জানা নেই। ফলে লোককথা, পারিবারিক স্মৃতি এবং প্রাচীন রীতির মিশেলেই আজও টিকে রয়েছে ‘শিকল বাঁধা দুর্গা’র কাহিনি।

মেজিয়ার পালবাড়িতে চলছে প্রতিমা গড়ার কাজ। নিজস্ব চিত্র

শিকলটি কোনওভাবেই প্রতিমার সঙ্গে সরাসরি বাঁধা থাকে না। কাঠের পাটাতন-সহ প্রতিমাকে শিকল দিয়ে আটকে রাখা হয় দেওয়ালের একটি আংটার সঙ্গে। পুজোর দিনগুলিতে এই রীতিই মেনে চলেন পরিবারের সদস্যেরা। পরিবারের সদস্য আশিস কুমার পাল বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁরা শুনে আসছেন অষ্টমীর দিন পুজো চলাকালীন মায়ের প্রতিমা হঠাৎ চঞ্চল হয়ে ওঠার কথা। কেঁপে উঠেছিল মায়ের বেদি। পরিবারের লোকজন মিলে ধরে প্রতিমাকে শান্ত করেছিলেন বলেই তাঁদের কাছে প্রচলিত কাহিনি। সেই সময় থেকেই পুজোর দিনগুলিতে প্রতিমা-সহ কাঠের পাটাতন শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার রীতি চলে আসছে বলে পরিবারের ধারণা। কিন্তু ঠিক কোন সময় থেকে এই প্রথা শুরু হয়েছিল, তার কোনও লিখিত তথ্য তাঁদের হাতে নেই। তাই ইতিহাসের নথির চেয়ে পারিবারিক স্মৃতিই এখানে বেশি জোরালো। কয়েক প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে চলে আসা সেই কাহিনিই আজ মেজিয়ার পালবাড়ির দুর্গাপুজোর অন্যতম পরিচয়। প্রতিমা শিকলে বাঁধা দৃশ্যটি প্রথম দেখায় বিস্ময় জাগাতে পারে। প্রশ্নও উঠতে পারে, দেবীকে কেন এভাবে বাঁধা? কিন্তু পাল পরিবারের কাছে এটি কেবল কোনও অস্বাভাবিক রীতি নয়। প্রায় ৩০০ বছরের পারিবারিক ঐতিহ্য, বিশ্বাস এবং স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক নিয়ম।

হুগলির সপ্তগ্রাম থেকে আসা মেজিয়া পাল পরিবারের ইতিহাসও বেশ পুরনো। পরিবার সূত্রে জানা যায়, তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন হুগলি জেলার আদি সপ্তগ্রামের বাসিন্দা। বর্গি আক্রমণের সময় নিরাপত্তার কারণে তাঁরা মেজিয়ায় চলে আসেন। পরে সেখানেই পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেন পরিবারের পূর্বপুরুষেরা। সেই সময় থেকেই ধীরে ধীরে মেজিয়ায় পাল পরিবারের পরিচিতি তৈরি হয়। তাঁদের দুর্গাপুজোও হয়ে ওঠে পরিবারের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্য। একসময় ছিল নহবতের আসর পরিবারের সদস্যদের কথায়, একসময় এই পুজো ছিল জাঁকজমকে ভরা। আর্থিক স্বচ্ছলতার কারণে ধুমধাম করে আয়োজন করা হত পুজো। পুজোর দিনগুলিতে বসত নহবত। আত্মীয়পরিজন, বন্ধুবান্ধব এবং স্থানীয় মানুষজনের উপস্থিতিতে কয়েকদিন ধরে উৎসবের পরিবেশ থাকত পালবাড়িতে।

এখন অবশ্য আগের সেই আড়ম্বর নেই। কিন্তু পুরনো রীতি-রেওয়াজ এখনও যথাসম্ভব ধরে রেখেছে পরিবার। মেজিয়ার পালবাড়িতে তাই দুর্গাপুজো এলেই ফিরে আসে সেই পুরনো প্রশ্ন কেন শিকলে বাঁধা থাকেন মা? উত্তর আজও নিশ্চিত নয়। কিন্তু সেই রহস্যই যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পুজোর আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement