আজ থেকে কয়েক শতাব্দী আগের কথা। এই রাজবাড়িতেই পায়ের ধুলো পড়েছিল কবিগুরুর। বর্তমানে রাজপাট আর নেই। একাধিক ছবির শুটিং হয় সেখানে। রাজপাট না থাকলেও পুজোর নিয়মে কোনও ছেদ নেই। আজও নিয়ম মেনে বলির সময় স্থান পরিবর্তন করা হয় কুলদেবতার। সেই সুরুল রাজবাড়ির পুজোর (Surul Rajbari's Durga Puja) আয়োজনে ব্যস্ত পরিবারের লোকজন-সহ স্থানীয় সকলেই।
সুরুল রাজবাড়ির দুর্গাপ্রতিমা। ফাইল ছবি
অষ্টাদশ শতাব্দীতে বর্ধমানের বাঁকা নদীর ধারে নীলপুরে ভরতচন্দ্র ঘোষ নামে জনৈক এক ধার্মিক ব্যক্তি বসবাস শুরু করেন। ওই ব্যক্তির কোনও সন্তান ছিল না। তাঁরা বারাণসীতে তীর্থ করতে যাওয়ার জন্য মনস্থির করেন। মাঝপথে যাত্রাভঙ্গ করে বীরভূমের সুরুলে পৌঁছন। সেখানে গুরুদেব বাসুদেব ভট্টাচার্যের বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। ওই বাড়িতে শ্যামসুন্দরের নিত্য পুজো করতেন। ঈশ্বর প্রার্থনায় সাড়া দেন। ভরতচন্দ্র ও তাঁর স্ত্রীর কোল আলো করে জন্মায় পুত্রসন্তান। তিনিই হলেন কৃষ্ণহরি দাস।
অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কৃষ্ণহরি সরকার মাটির ঠাকুরদালান গড়ে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। সেই থেকেই শুরু হয় সুরুল সরকার বাড়ির দুর্গোৎসব। যা আজ শুধু সুরুল গ্রামের নয়, গোটা বীরভূমের গৌরব। আজও দুর্গাপুজোর সময় সরকারবাড়ির সামনে বিরাট মেলা বসে। সরকারবাড়ির নাটমন্দিরে পুজোর তিনদিন ধরে চলে যাত্রাপালা। কৃষ্ণহরি সরকারের পৌত্র শ্রীনিবাস সরকার পরে মাটির ঠাকুরদালান ভেঙে প্রাসাদসম অট্টালিকার সঙ্গে খিলানযুক্ত চকমিলান পাকা ঠাকুরদালান তৈরি করেন। এইসময় সরকার পরিবার উন্নতির শিখরে পৌঁছয়। ফরাসি ও ইংরেজ কুঠিয়ালদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত হয়ে প্রভূত অর্থ উপার্জন করেন। নীলচাষ ছাড়াও চিনি ও কাপড় তৈরি ছিল পরিবারের মূল ব্যবসা৷
সুরুল রাজবাড়ি
বেলজিয়াম থেকে নানা রঙের ঝাড়বাতি নিয়ে আসা হয়েছিল। আজও দুর্গাপুজোর সময় রেড়ির তেলে জ্বলা ঝাড়বাতিগুলোকে দেখা যায় ঠাকুরদালান, নাটমন্দিরে। আধুনিক বিজলি বাতির সঙ্গে তেলের ঝাড়বাতির সহাবস্থান রাতের ঠাকুরদালানকে আরও মোহময় করে তোলে। রথের দিন বাড়ির ঠাকুরদালানে কাঠামো পুজো করে শুরু হয় মূর্তি গড়া। একই কাঠামোতে প্রতি বছর মাটি লাগিয়ে মূর্তি গড়েন শিল্পী। ছাঁচে নয়, শিল্পী নিজে হাতে গড়েন মায়ের মুখ। বোধন হয় ষষ্ঠীতে। সপ্তমীর সকালে পালকি করে নবপত্রিকা বড় নতুন পুকুরে স্নানে নিয়ে যাওয়া হয়। স্নান থেকে ফিরে আসার পর হয় মায়ের চক্ষুদান। লুচি, তরকারি, সুজি, কদমা, মিহিদানা, বোঁদে, রসগোল্লা, পান্তুয়া, নারকেল নাড়ু থেকে শুরু করে নানা রকমের ফল মাকে অন্নভোগ হিসেবে দেওয়া হয়। পুজোর তিনদিনই হয় বলি। সপ্তমীতে চালকুমড়ো, অষ্টমীতে পাঁঠা ও নবমীতে চালকুমড়ো ও আঁখ বলি দেওয়া হয়। তবে পাঁঠাবলির সময় নারায়ণের স্থান পরিবর্তন করা হয়।
সারাবছর এই রাজবাড়িতে শুটিংয়ের ভিড় থাকে। নিঃসন্দেহে ভিড় যেন দ্বিগুণ হয়ে যায় দুর্গাপুজোয়। আজও দুর্গাপুজোর সময় ঠাকুরদালান, নাটমন্দির ভরে ওঠে দেশ ও বিদেশের পর্যটকে৷ হাওড়া থেকে গণদেবতা এক্সপ্রেস বা শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসে শান্তিনিকেতন। সেখান থেকে টোটো, রিকশা বা গাড়িতেই পৌঁছে যাওয়া যায় সুরুল সরকারবাড়ি৷ দশমীর দিন সকালে হয় অপরাজিতা পুজো। তারপর মশাল জ্বালিয়ে দুর্গামূর্তি নিয়ে যাওয়া হয় কালীসায়রে। ঢাকের সঙ্গে ফাটতে থাকে আতসবাজি। কালীসায়রে রাজকীয় মর্যাদায় বিসর্জিত হয় মায়ের মূর্তি। আবার এক বছরের প্রতীক্ষায় দিন গোনা শুরু করেন স্থানীয়রা।
