সিনেমার চাইতেও সিনেম্যাটিক বাস্তবের এই কাহিনি। শুনলে সকলের মনেই প্রশ্ন জাগে, এমন আবার সত্যি হয় নাকি? কেবল ভালোবাসার টানে কি সত্যিই সমস্ত বিপত্তি পেরিয়ে এগিয়ে যেতে পারে মানুষ? কেবল সাইকেলের ভরসায় ভারত ছেড়ে সুইডেন পাড়ি দিতে পারে কি?
এ গল্পের নায়ক এক ভারতীয়। নাম প্রদ্যুম্ন কুমার মহানন্দিয়া (Pradyumna Kumar Mahanandia)। জন্ম ১৯৪৯ সালে ওড়িশার অঙ্গুল জেলায়। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা মহানন্দিয়া ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকতে বড় ভালোবাসতেন। কিন্তু দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন তিনি, তাই স্কুলে-পাড়ায় প্রায়শই বৈষম্যের শিকার হতে হত। আহত-ব্যথিত হয়ে বাড়ি ফিরলে, মা কেবল ভরসা দিতেন। হাত দেখে বলতেন, ছেলের ভাগ্যে রয়েছে দূরদেশের এক সুন্দরী, যার সঙ্গে বিয়ে হলেই জীবনের সমস্ত কষ্ট ঘুচে যাবে।
এর পর পেরিয়ে গিয়েছে অনেক বছর। দিল্লির কলেজ অব আর্টে পড়াশোনা করেন প্রদ্যুম্ন, রাজধানীর কনট প্লেসে বসে মাত্র দশ মিনিটে মানুষের প্রতিকৃতি এঁকে জীবিকা নির্বাহ করেন। এতই ভালো তাঁর আঁকার হাত যে, অল্প দিনেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে সুইডেনের তরুণী শার্লট ভন শেডভিন ভারত ভ্রমণে এসে, কনট প্লেসে আসেন।
মহানন্দিয়ার কাছে নিজের প্রতিকৃতি আঁকাতে যান। প্রথম সাক্ষাতেই এতটা মুগ্ধ হন শার্লট যে, এরপরেও ফিরে ফিরে আসেন বারবার। আর সেখান থেকেই গড়ে ওঠে প্রেম। হুড়হুড় করে এগিয়ে চলে প্রেমের গাড়ি। ওড়িশায় মহানন্দিয়ার নিজ গ্রামে উপজাতীয় রীতিতে বিয়ে করেন তাঁরা।
কিন্তু জীবন যে স্বপ্ন নয়। যাবতীয় দায়দায়িত্ব অপেক্ষা করছিল দু'জনের জন্যই। প্রদ্যুম্নের পড়াশুনো বাকি ছিল, শার্লটকেও ফিরতে হত পরিবারের কাছে। পরের এক বছর দুজনের প্রেমের মাঝে সাঁকো হয়ে ছিল কেবল চিঠিপত্র। অবশেষে ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে মহানন্দিয়া নিজের সর্বস্ব বিক্রি করে একটি সেকেন্ড-হ্যান্ড সাইকেল কেনেন। তারপর শুরু করেন সুইডেনের উদ্দেশে দীর্ঘ যাত্রা।
সাইকেলে চেপেই একে একে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক-সহ একাধিক দেশ অতিক্রম করেন তিনি। পথ চলার সময় মুখের ছবি এঁকেই খাবার, থাকার জায়গা ও অর্থের ব্যবস্থা করতেন। টানা কয়েক মাসের কষ্টকর যাত্রার পর সুইডেনে পৌঁছে আবার শার্লটের সঙ্গে মিলিত হন মহানন্দিয়া।
সেখানেই শুরু হয় তাঁদের লাল-নীল নতুন সংসার। দুই সন্তানের জন্ম দেন তাঁরা। সুইডেনে একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন প্রদ্যুম্ন। তাঁদের ভালোবাসার গল্প নিয়ে লেখা হয়েছে বই, তথ্যচিত্রও নির্মিত হয়েছে।
