'তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে..।' ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়। মৃত্যু ও বিরহ সত্ত্বেও জীবনের গভীরে যে প্রেম, তার অস্তিত্ব, তার চিহ্ন ঠিকই থেকে যায়। রয়ে যায় আনন্দ ধারা। রবি ঠাকুরের গানেও আমরা তেমনটাই শিখেছি। এই প্রেম, এই ভালোবাসার কোনও মৃত্যু হয় না। কোনও বিনাশ হয় না। আর সেজন্যই বোধয় মৃত্যুর ওপার থেকেও মায়ার জ্যোৎস্নায় পথ হাঁটে পার্থিব হৃদয়।
সময়টা ১৯৭৭ সাল। মাত্র ২৫ বছর বয়সে চার সন্তানকে রেখে পৃথিবী ছেড়েছিলেন অন্তঃসত্ত্বা গ্রাসিয়েলা। তাঁর অকালপ্রয়াণে ভেঙে পড়েছিলেন স্বামী। আর্জেন্টিনার এক বিষণ্ণ কৃষকের বুকের ভেতরে তুষের আগুনের মতো জেগেছিল বেদনা। আঁকড়ে ধরে বেঁচেছিলেন পুরনো সুখস্মৃতিকে।
ছবি: সংগৃহীত
একদা বিমানে ওঠার পর উপর থেকে নিচে দেখা এক অদ্ভুত নকশার খামার দেখে স্ত্রীকে আনন্দিত হতে দেখেছিলেন পেদ্রো মার্টিন উরেতা। স্ত্রী আবদার করেছিলেন, তাঁদের নিজেদের জমিতেও যদি গাছ দিয়ে একটি বিশালাকার গিটারের আকৃতি ফুটিয়ে তোলা যায়! গিটার যে তাঁর ভীষণ প্রিয়! পেদ্রো তখন কাজের চাপে বলেছিলেন, 'পরে ভাবা যাবে।' কিন্তু সেই ‘পরে’ যে কোনও একদিন স্বপ্নের মতো সত্যি হয়ে উঠবে, তা-ই বা কে জানত!
স্ত্রী চলে যাওয়ার দু’বছর পর শুরু হল এক নীরব একলব্য আন্দোলন। সেন্ট্রাল আর্জেন্টিনার লাবোলায়ে শহরের কাছে নিজের খামারবাড়িতে ক্যানভাস পাতলেন পেদ্রো। পেশাদার ল্যান্ডস্কেপাররা তাঁকে পাগল ভেবেছিল। কিন্তু প্রেমে যে উন্মাদনা থাকেই! কোনও আধুনিক মাপন যন্ত্র নয়, পেদ্রো তাঁর চার সন্তানকে নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড় করিয়ে গাছের সারি চিহ্নিত করতেন। একে একে চার দশক ধরে রোপণ করা হল প্রায় সাত হাজার চারা গাছ।
কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য জেদে একসময় সবুজ রূপ নিল সেই স্থান। সাইপ্রেস গাছের ঘন সবুজ পাতায় ফুটে উঠল গিটারের বডি। আর ব্লু ইউক্যালিপটাস গাছের নীলচে ছটায় তৈরি হল গিটারের সুন্দর গ্রীবা বা নেক। আকাশ থেকে দেখলে মনে হয়, যেন প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এক সবুজ স্বরগ্রাম শুয়ে আছে সবুজ আর্জেন্টিনার বুকে।
ছবি: সংগৃহীত
আশ্চর্যের বিষয় হল, বিমানের ভীতি থাকার কারণে পেদ্রো নিজে কোনওদিন আকাশ থেকে তাঁর তৈরি এই আশ্চর্য প্রেমের স্মারক দেখতে পাননি। কিন্তু তাতে কী! নাসা-র স্যাটেলাইট থেকে শুরু করে গুগল ম্যাপস—সবাই আজ কুর্নিশ জানায় এই সবুজ গীতি আলেখ্যকে। উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া বিমানযাত্রীদের চোখ আটকায় এই গিটার অরণ্যে।
এক শোকাতুর মানুষের বিরহ কীভাবে আস্ত এক অরণ্যে পরিণত হতে পারে, পেদ্রোর তৈরি এই বিরহগাথা তার দৃষ্টান্ত। যেখানে গাছের পাতার মর্মরে আজও যেন শোনা যায় অকালপ্রয়াত স্ত্রীর কণ্ঠস্বর। সম্রাট শাহজাহান তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজের জন্য যেমন যমুনার তীরে তাজমহল গড়েছিলেন, ঠিক তেমনটাই পেদ্রোর এই গিটার অরণ্য প্রেমের এক অমর নিদর্শন হয়ে থেকে যাবে।
