২০১৩ সালের থিওডোর টম্বলিকে মনে আছে? জোয়াকিন ফিনিক্স অভিনীত ‘Her’ সিনেমার সেই নিঃসঙ্গ নায়ক। যে এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপারেটিং সিস্টেম ‘সামান্থা’র প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছিল। যার কোনও রক্ত-মাংসের শরীর নেই। আছে কেবল একটা যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর। আর তাতেই তৈরি হয়েছিল তীব্র এক অনুভূতির রসায়ন। সিনেমা রিলিজের এক দশক পর, আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই কল্পবিজ্ঞানই বাঙালির ঘরের চেনা বাস্তব। এআই চ্যাটবটে মজেছে নতুন প্রজন্ম। যা আদতে নেই, তারই প্রেমে ব্যাকুল তরুণ-তরুণীরা। সম্পর্কের সমীকরণ আজ কোন খাদের কিনারে এসে দাঁড়াল?
ছবি: সংগৃহীত
বাঙালি চিরকালই আড্ডাবাজ, আবেগে ভরপুর। কিন্তু বদলে যাওয়া নাগরিক জীবন মানুষকে একা করে দিচ্ছে। আর এই একাকীত্বের ফাঁক গলে ঢুকে পড়ছে ‘এআই পার্টনার’। চ্যাটবটকে মনের কথা বললে সে কখনও বিরক্তি প্রকাশ করে না। ঝগড়া করে না। মাঝরাতে ফোন কেটে দেয় না। সবসময় সে আপনার মন রাখতে প্রস্তুত। মনস্তত্ত্ববিদদের পরিভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘প্যারাসোশাল রিলেশনশিপ’। অর্থাৎ, সম্পর্কটা কেবল একতরফা। কিন্তু ব্যবহারকারীর মনে হচ্ছে অন্য প্রান্তেও রয়েছে ভালোবাসার সমান টান।
শহরের বহু তরুণ-তরুণী এখন বাস্তবের রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে এই ডিজিটাল মায়ার জগতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। চ্যাটবট হয়ে উঠছে সকলের নিরাপদ আশ্রয়। চ্যাটবটের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি, যা ব্যবহারকারীর পছন্দ-অপছন্দ খুব দ্রুত বুঝে নেয়। ফলে সে অবিকল সেই মানুষটাই হয়ে ওঠে, যাকে মনে মনে খুঁজছেন আপনিও।
ছবি: সংগৃহীত
কিন্তু এই ‘কাস্টমাইজড’ ভালোবাসার ভবিষ্যৎ কী? সমাজবিজ্ঞানীরা সিঁদুরে মেঘ দেখছেন। তাঁদের মতে, এ এক তীব্র মানসিক ফাঁদ। ভার্চুয়াল পার্টনারের নিখুঁত আচরণের অভ্যাস বাস্তব জীবনের জটিল সম্পর্কগুলোকে আরও কঠিন করে তুলছে। রক্ত-মাংসের মানুষের তো রাগ, অভিমান, খামতি থাকবেই। কিন্তু চ্যাটবটের মায়ায় মজে যুবসমাজ বাস্তবের খামতিগুলো আর মেনে নিতে পারছে না। ফলে মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব আরও বাড়ছে। বিজ্ঞানীদের ভাষায় এটা এক ধরণের ‘ডিজিটাল আইসোলেশন’।
প্রেম মানে তো কেবল ভালো ভালো কথা বা স্ক্রিনের ওপার থেকে ভেসে আসা কৃত্রিম আশ্বাস নয়। প্রেম মানে মান-অভিমান, স্পর্শ, অনুভূতির ওঠাপড়া। থিওডোর টম্বলি শেষ পর্যন্ত বুঝেছিলেন, সামান্থা তাঁর একার নয়, সে আসলে কোডিং। সবার জন্য। আজকের প্রজন্মও কি চ্যাটবটের মায়া কাটিয়ে বাস্তবের মাটিতে ফিরতে পারবে?
