বরফের চাদরে ঢাকা হিমালয়ের বুক। সেখানে এক অলৌকিক গুহা। প্রতি বছর আষাঢ়ের শেষে ভক্তের দল এখানে ঢল নামান। এবারও যথারীতি শুরু হতে চলেছে ২০২৬ সালের অমরনাথ যাত্রা। আগামী ৩ জুলাই থেকে শুরু হয়ে এই যাত্রা চলবে ২৮ আগস্ট পর্যন্ত। মোট ৫৭ দিনের এই পুণ্যযাত্রায় এবারও শামিল হবেন লক্ষ লক্ষ ভক্ত। কেন এই কঠিন পথ পেরিয়ে মানুষ ছুটে যান অমরনাথের গুহায়? কী তার মাহাত্ম্য?
ফাইল ছবি
হিমালয়ের অনন্ত নিস্তব্ধতার গভীরে লুকিয়ে রয়েছে এক পৌরাণিক আখ্যান। হিন্দু বিশ্বাস মতে, এই অমরনাথ গুহাতেই লুকিয়ে রয়েছে সৃষ্টি ও অমরত্বের পরম রহস্য। দেবাদিদেব এখানেই মাতা পার্বতীকে শুনিয়েছিলেন অমরত্বের গূঢ় কথা, যা ‘অমরকথা’ নামে পরিচিত।
কেন এই নির্জন গুহাকে বেছে নিলেন শিব?
কথিত আছে, দেবী পার্বতী একবার মহাদেবকে প্রশ্ন করেছিলেন, কেন তিনি অমর? অথচ দেবীকে বারবার মৃত্যুবরণ করতে হয়? পার্বতীর বারংবার অনুরোধে শিব তাঁকে অমরত্বের রহস্য বা ‘অমরকথা’ শোনাতে রাজি হন। কিন্তু এই পরম গোপন জ্ঞান মহাবিশ্বের অন্য কেউ শুনুক, তা চাননি মহাদেব। তাই তিনি এক নির্জন স্থানের খোঁজে রওনা হন। গোপনীয়তা বজায় রাখতে শিব তাঁর সমস্ত অলঙ্কার ও সঙ্গীদের একে একে ত্যাগ করেন। পহলগামে তিনি ছাড়েন তাঁর বাহন নন্দীকে। চন্দনবাড়িতে মাথা থেকে নামিয়ে রাখেন চন্দ্রকে। শেষনাগে মুক্ত করেন তাঁর গলার সর্পকুলকে। পঞ্চতরণীতে ত্যাগ করেন পঞ্চভূতকে। এমনকী পুত্র গণেশকেও তিনি রেখে যান মহাগণেশ পাহাড়ে। সবশেষে পার্বতীকে নিয়ে তিনি প্রবেশ করেন এই নির্জন গুহায়।
ফাইল ছবি
পায়রা দম্পতির অমরত্ব লাভ
গুহায় প্রবেশ করে শিব চারদিকের সমস্ত আগুন জ্বালিয়ে দেন, যাতে কোনও জীবন্ত প্রাণী সেখানে অবশিষ্ট না থাকে। এরপর তিনি পার্বতীকে অমরকথা শোনাতে শুরু করেন। কথা শুনতে শুনতেই দেবী পার্বতী একসময় ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু শিব তা খেয়াল করেননি।
সেই সময় গুহার ভেতরে কোনও ভাবে রয়ে গিয়েছিল এক পায়রা দম্পতি। দেবী পার্বতীর পরিবর্তে সেই পায়রা দুটি শিবের মুখে অমরত্বের কাহিনি শুনে ‘হুঁ’ দিতে থাকে। শিব ভাবেন পার্বতীই সাড়া দিচ্ছেন।
কাহিনি শেষ হলে শিবের দৃষ্টি যায় ঘুমন্ত পার্বতীর দিকে। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর অজান্তেই অন্য কেউ এই পরম সত্য জেনে ফেলেছে। শিব ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলে পায়রা দুটি তাঁর শরণাপন্ন হয়। মহাদেব তখন তাদের অভয় দেন।
পৌরাণিক বিশ্বাস, শিবের বর পেয়ে সেই পায়রা দম্পতি আজও অমর। অনেক পুণ্যার্থী আজও নাকি গুহার ভেতর সেই যুগল পায়রার দেখা পান।
এই গুহায় প্রাকৃতিকভাবে জল জমে বরফের এক অলৌকিক শিবলিঙ্গ তৈরি হয়। চাঁদের ক্ষয় ও বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই লিঙ্গের আকারও পরিবর্তিত হয়। এই আদি ও অনন্ত বিশ্বাসের টানেই প্রতি বছর মানুষ সব বাধা পেরিয়ে ছুটে যান অমরনাথে।
