shono
Advertisement
World Environment Day 2026

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে 'গোবর্ধন লীলা'র অন্য পাঠ, প্রকৃতিকে ভালোবাসার অনন্য দর্শন

আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানের বহু আগেই দ্বাপর যুগে যমুনা তীরের এক রাখাল বালক প্রকৃতিকে ভালোবাসার পাঠ শিখিয়েছিলেন। সেই পাঠ আজও সমান জীবন্ত, সমান প্রাসঙ্গিক। শ্রীমদ্ভাগবতের সেই চিরন্তন 'গোবর্ধন লীলা' আসলে মানুষ ও প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্কের এক মহাকাব্য। যা কেবল ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পরিবেশ চেতনারও এক গভীর দর্শন।
Published By: Buddhadeb HalderPosted: 02:45 PM Jun 04, 2026Updated: 02:45 PM Jun 04, 2026

চারপাশে কংক্রিটের জঙ্গল। আর বিষাক্ত বাতাস। তারই মাঝে দাঁড়িয়ে মানুষ আজ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই লড়ছে। দিকে দিকে পরিবেশ রক্ষার আর্জি। আগামীর কাছে এ বিশ্বকে বাসযোগ্য করে যাওয়ার মরিয়া প্রচেষ্টা। অথচ আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানের বহু আগেই দ্বাপর যুগে যমুনা তীরের এক রাখাল বালক প্রকৃতিকে ভালোবাসার পাঠ শিখিয়েছিলেন। সেই পাঠ আজও সমান জীবন্ত, সমান প্রাসঙ্গিক। শ্রীমদ্ভাগবতের সেই চিরন্তন 'গোবর্ধন লীলা' আসলে মানুষ ও প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্কের এক মহাকাব্য। যা কেবল ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পরিবেশ চেতনারও এক গভীর দর্শন। লিখছেন ড. সুমন্ত রুদ্র (ডিন, ভক্তিবেদান্ত রিসার্চ সেন্টার)।

Advertisement

বৃন্দাবনের বাসিন্দারা তখন বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্রের আরাধনায় ব্যস্ত। ঠিক সেই মুহূর্তে শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিলেন ঘরের কাছের গোবর্ধন পর্বতের দিকে। কৃষ্ণের যুক্তি ছিল সহজ ও অকাট্য। যে পাহাড় তাঁদের জল দেয়, ফলমূল আর ঔষধি দেয়, গবাদি পশুর চারণভূমি জোগায়, পূজা তো তারই পাওয়া উচিত। এই দর্শনের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল পরিবেশগত ভারসাম্যের মূল মন্ত্র। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় কৃষ্ণ স্পষ্ট বলেছেন, তাঁর অধীনেই প্রকৃতি এই চরাচর বিশ্ব পরিচালনা করে। অর্থাৎ, প্রকৃতি কোনও ভোগের সামগ্রী নয়, তা ঈশ্বরেরই এক পরম রূপ।

ছবি: সংগৃহীত

কৃষ্ণের এই সিদ্ধান্তে ক্রুদ্ধ হয়ে ইন্দ্র যখন প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতে বৃন্দাবন ধ্বংস করতে চাইলেন, তখন কৃষ্ণ নিজের কনিষ্ঠ আঙুলে গোবর্ধন পর্বত ধারণ করে সবাইকে রক্ষা করেন। এই লীলা আমাদের শেখায় অহংকারের পতন নিশ্চিত এবং প্রকৃতির শরণাগতিই একমাত্র মুক্তির উপায়। যুগে যুগে এই ভাবনাই বয়ে নিয়ে চলেছেন মহাত্মারা। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ঐতিহ্যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু গোবর্ধনকে কৃষ্ণেরই অবিনাশী রূপ বলে মানতেন। শ্রদ্ধায় তিনি পাহাড়ে পা রাখতেন না, দূর থেকে প্রণাম করতেন। চৈতন্যচরিতামৃত ও ভাগবতের শ্লোকে গোবর্ধনকে ঈশ্বরের 'শ্রেষ্ঠ ভক্ত' বা পরম কল্যাণকামী সত্তা বলা হয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই দর্শন অত্যন্ত জরুরি। মানুষ আজ নদী দূষিত করছে, অরণ্য ধ্বংস করছে, পাহাড় কেটে ক্ষতবিক্ষত করছে। আইন বা নীতি দিয়ে যা রোখা যাচ্ছে না, মহাপ্রভু তা রুখতে চেয়েছিলেন অন্তরের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা দিয়ে। একবিংশ শতাব্দীর জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়া আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, প্রকৃতিকে শোষণ করে উন্নয়ন সম্ভব নয়। বৃন্দাবনের মানুষ, নদী, পর্বত ও জীবজগতের সেই সহাবস্থানই আজকের পৃথিবীর একমাত্র পথ। এমনকী শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাতেও বলা হয়েছে- "ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূযতে সচরাচরম্" (গীতা ৯.১০)। অর্থাৎ, আমার অধীনে প্রকৃতি এই চলমান ও স্থাবর জগতের সৃষ্টি ও পরিচালনা করে। আদতে প্রকৃতি আমাদের ভোগ্য বস্তু নয়, তা ঈশ্বরের শক্তির প্রকাশ। তাই প্রকৃতির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা এবং দায়িত্বশীল আচরণ অপরিহার্য। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে গোবর্ধন লীলার এই আধ্যাত্মিক শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতিকে রক্ষা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। শোষণের মানসিকতা ত্যাগ করে প্রকৃতির সঙ্গে সুর মেলালেই মিলবে প্রকৃত মুক্তি।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement