shono
Advertisement
Jagannath Rath Yatra 2026

শবরদের আরাধ্য থেকে জগতের নাথ, মহাপ্রভুর রথযাত্রার অলৌকিক ইতিবৃত্ত জানেন?

আষাঢ়ে মেঘের ঘনঘটা। বেজে ওঠে শঙ্খ। কাঁসর-ঘণ্টা। পুরী থেকে বাংলা, আপামর ভক্তকূলের পরম প্রতীক্ষা। এই বুঝি রথের রশিতে টান পড়ল বলে!
Published By: Buddhadeb HalderPosted: 08:46 PM Jul 03, 2026Updated: 08:46 PM Jul 03, 2026

আষাঢ়ে মেঘের ঘনঘটা। বেজে ওঠে শঙ্খ। কাঁসর-ঘণ্টা। পুরী থেকে বাংলা, আপামর ভক্তকূলের পরম প্রতীক্ষা। এই বুঝি রথের রশিতে টান পড়ল বলে! রথযাত্রার নেপথ্যে রয়েছে এক চিরন্তন আখ্যান। যিনি একদিন অরণ্যের নিভৃতে শবরদের আরাধ্য ‘নীলমাধব’ ছিলেন, তিনিই আজ বিশ্বচরাচরের ‘জগন্নাথ’। ব্রাত্য অন্ত্যজের ঈশ্বর কীভাবে রাজাধিরাজ হয়ে উঠলেন, সেই ইতিহাস আজও অলৌকিকতায় মোড়া। কী সেই ইতিবৃত্ত?

Advertisement

ফাইল ছবি

ইতিহাসের চাকা ঘোরে দ্বাপর যুগে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর দ্বারকায় একদিন এক বৃক্ষতলে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। জরা নামের এক ব্যাধ তাঁর রাঙা চরণকে দূর থেকে পাখি ভেবে বাণবিদ্ধ করে। মহাপ্রয়াণ ঘটে লীলাপুরুষোত্তমের। অর্জুন দ্বারকায় ছুটে এসে দেহ সৎকারের চেষ্টা করেন। কিন্তু এ কী অলৌকিক কাণ্ড! অগ্নিসংযোগের পরও প্রভুর নাভিদেশ পুড়ল না। তখনই আকাশবাণী হয়, ‘ইনিই পরমব্রহ্ম। অর্জুন, এঁকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করো।’ অর্জুন সেই নাভি সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দিলেন। আর সমুদ্রের তীর ধরে সেই নাভিকে অনুসরণ করে ছুটে চললেন অনুতপ্ত শবর জরা। দ্বারকা থেকে পুরী। সেখানেই ভক্তকে স্বপ্ন দিলেন কৃষ্ণ। জানালেন, এবার থেকে শবরদের হাতেই তিনি ‘নীলমাধব’ রূপে পুজো নেবেন। অরণ্যের নিভৃতে শুরু হল গোপন আরাধনা।

কালক্রমে এল কলিযুগ। কলিঙ্গের বিষ্ণুভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন শ্রীক্ষেত্রে এক বিশাল মন্দির গড়লেন। কিন্তু গর্ভগৃহ বিগ্রহহীন। রাজসভায় নীলমাধবের মহিমার কথা শুনে রাজা চারদিকে দূত পাঠালেন। রাজপুরোহিত বিদ্যাপতি অরণ্যে পথ হারিয়ে আশ্রয় নিলেন শবররাজ বিশ্ববসুর গৃহে। বিশ্ববসুর কন্যা ললিতার সঙ্গে তাঁর প্রেম ও পরিণয় হল। বিদ্যাপতি লক্ষ্য করলেন, শ্বশুরমশাই রোজ ভোরে কোথাও যান। ললিতার কাছে জানতে পারলেন গোপন নীলমাধব পুজোর কথা। বিগ্রহ দর্শনের জন্য ব্যাকুল বিদ্যাপতিকে চোখ বেঁধে নিয়ে যেতে রাজি হলেন বিশ্ববসু। চতুর বিদ্যাপতি পথ চিনতে ছড়াতে ছড়াতে গেলেন সর্ষের দানা।

ফাইল ছবি

নীলমাধবকে দর্শন করে ধন্য হলেন বিদ্যাপতি। ঠিক তখনই দৈববাণী হল, এবার আমি রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের মহাউপাচারে পুজো নিতে চাই। ইষ্টদেবতাকে হারানোর আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ বিশ্ববসু জামাতাকে বন্দি করলেন। পরে কন্যার আকুতিতে মুক্ত পেয়ে বিদ্যাপতি রাজাকে সব জানালেন। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন সদলবলে গুহায় পৌঁছে দেখলেন বিগ্রহ উধাও। অনুতপ্ত রাজাকে শ্রীহরি স্বপ্নে জানালেন, সমুদ্রের জলে ভেসে আসা দারু বা কাঠ দিয়েই গড়তে হবে বিগ্রহ। কিন্তু সেই বিশাল কাঠ কেউ তুলতে পারল না। অবশেষে জাতপাতের ভেদাভেদ ভুলে ব্রাহ্মণ বিদ্যাপতি আর শবররাজ বিশ্ববসু দুই প্রান্ত ধরতেই অনায়াসে তীরে উঠে এল সেই মহাদারু।

কিন্তু সাধারণ ছেনি-হাতুড়িতে সেই কাঠ কাটা যায় না। তখন ছদ্মবেশে হাজির হলেন স্বয়ং দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। শর্ত দিলেন, একুশ দিন বন্ধ ঘরে তিনি মূর্তি গড়বেন, কেউ দরজা খুলতে পারবে না। কিন্তু চৌদ্দ দিনের মাথায় রানির কৌতুহলে রাজা দরজা খুলতেই দেখা গেল কারিগর উধাও। পড়ে আছে হাত-পা হীন তিনটি অসমাপ্ত বিগ্রহ। অনুতপ্ত রাজাকে জগন্নাথ স্বপ্ন দিয়ে বললেন, ‘আমি এই রূপেই পূজিত হতে চাই।’ ভক্তের ভগবান এভাবেই রয়ে গেলেন।

ফাইল ছবি

আষাঢ়ের শুক্লা দ্বিতীয়ায় বলরাম ও সুভদ্রাকে নিয়ে জগন্নাথদেব রথে চড়ে যান মাসির বাড়ি অর্থাৎ গুন্ডিচা মন্দিরে। সাতদিন পর ফিরে আসেন, যা উলটোরথ নামে পরিচিত। বাংলায় এই রথযাত্রার সংস্কৃতি জনপ্রিয় হয় শ্রীচৈতন্যদেবের নীলাচল গমনের পর। বৈষ্ণব ভাবাবেগে জারিত হয়ে বাঙালি একে আপন করে নেয়। এই পবিত্র দিনেই সূচনা হয় বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গোৎসবের কাঠামোপুজোর। শবরদের কুটির থেকে রাজপ্রাসাদ হয়ে বাঙালির হৃদয়মন্দিরে জগন্নাথের এই যাত্রা চিরকালীন আধ্যাত্মিকতার এক পরম দলিল।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement