মন্দিরের ভিতর জ্বলছে নিভু-নিভু আলো। তাতে চোখ সয়ে গেলে দেখা যাবে দেবীর মুখ। কালো পাথরে খোদাই করে তৈরি দেবীর ভয়াবহ মুখভঙ্গি দেখলে শরীর ঠান্ডা হয়ে যায় যেন। আজকের আলোকোজ্জ্বলতার সময়ে দাঁড়িয়েও এই মন্দিরের দিকে তাকালে মনে হয়, যেন পৌঁছনো গিয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন কোনও সময়ে। আজও এই মন্দিরকে ঢেকে রেখেছে রসহ্যের আবরণ।
সূত্র: ইন্টারনেট।
বৈতাল দেউল এখানে তিনি মুণ্ডিয়া দেউল নামেও পরিচিত। মন্দিরের ছাদের উপরে রয়েছে তিনটি স্বতন্ত্র শিখর, যা থেকে এই নামের উৎপত্তি। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই তিন শিখর দেবীর তিন শক্তি— মহাসরস্বতী, মহালক্ষ্মী ও মহাকালীর প্রতীক।
মন্দিরের শহর ভুবনেশ্বরে শত শত প্রাচীন দেবালয়ের ভিড়ে অন্যতম বৈতাল দেউল। অষ্টম শতকে ভৌম-কর রাজবংশের শাসন কালে নির্মাণ হয়েছিল। এখানকার অধিষ্ঠাত্রী দেবী চামুণ্ডা। 'একমরা ক্ষেত্র' ভুবনেশ্বরের অষ্ট চণ্ডীর একজন এই দেবী। তবে এখানে তিনি ধরা দেন দেবী কপালিনী (Devi Kapalini) নামে। এই মন্দিরের মিল ওড়িশার গুরুত্বপূর্ণ শক্তিপীঠগুলোর সঙ্গে থাকলেও, আদতে এ এক তান্ত্রিক উপাসনাকেন্দ্র। বৈতাল দেউল কলিঙ্গ স্থাপত্যের বিরল খাখরা শৈলীর অন্যতম সেরা নিদর্শন হিসেবেও পরিচিত।
মন্দিরের গর্ভগৃহে বিরাজমান মা কপালিনীর মূর্তি প্রথম দর্শনেই বিস্মিত করে। দেবীকে ভয়ংকর রূপে কল্পনা করা হয়েছে এখানে। তিনি দশভুজা, গলায় ঝুলছে নরমুণ্ডের মালা। হাতে ত্রিশূল, তলোয়ার, ধনুক, সর্প, বজ্র-সহ নানা অস্ত্র। মৃতদেহের উপর আসীন দেবী। তাঁর দুই পাশে রয়েছে শৃগাল ও পেঁচা। এই দুই প্রাণী তন্ত্রশাস্ত্রে মৃত্যু, সময়, অন্ধকার ও গুপ্ত জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। দেবীর এই রূপ ভয় প্রদর্শনের জন্য নয়; বরং অহংকার, ভয়, মায়া এবং মৃত্যুভীতিকে জয় করার আধ্যাত্মিক বার্তা বহন করে।
বৈতাল দেউল এখানে তিনি মুণ্ডিয়া দেউল নামেও পরিচিত। মন্দিরের ছাদের উপরে রয়েছে তিনটি স্বতন্ত্র শিখর, যা থেকে এই নামের উৎপত্তি। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই তিন শিখর দেবীর তিন শক্তি— মহাসরস্বতী, মহালক্ষ্মী ও মহাকালীর প্রতীক। মধ্যযুগে এই মন্দির ছিল তন্ত্রসাধক ও কাপালিক সম্প্রদায়ের সাধনাক্ষেত্র। সেই কারণেই মন্দিরের গায়ে খোদাই ভাস্কর্যে তান্ত্রিক আচার, দেবদেবীর উগ্র রূপ ও জীবনের নশ্বরতার নানা প্রতীক ফুটে উঠেছে। তবে তারই সঙ্গে রয়েছে অর্ধনারীশ্বর, নটরাজ, সূর্যদেব, পার্বতী, নৃত্যশিল্পী, যুগলমূর্তি ও প্রকৃতিনির্ভর অলঙ্করণ।
বৈতাল দেউল।
ঐতিহাসিকদের মতে, একসময় এখানে বলিপ্রথা প্রচলিত ছিল। মন্দির প্রাঙ্গণে এখনও একটি পাথরের বলি-স্তম্ভ দেখা যায়। দেউলের অর্ধবৃত্তাকার দীর্ঘ ছাদ অনেকটা দক্ষিণ ভারতের গোপুরমের কথা মনে করিয়ে দেয়। গবেষকদের মতে, এই স্থাপত্যশৈলী মূলত শক্তি উপাসনার মন্দিরগুলির জন্যই ব্যবহৃত হত।
ভুবনেশ্বরের বিন্দুসাগর সরোবরের কাছে, ও বিখ্যাত লিঙ্গরাজ মন্দির থেকে অল্প দূরেই অবস্থিত বৈতাল দেউল। আজও শক্তি উপাসক, তন্ত্রসাধক, ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং দেশ-বিদেশের পর্যটকরা এই মন্দিরে আসেন। প্রায় বারোশো বছর পেরিয়েও বৈতাল দেউল আজও দাঁড়িয়ে আছে কলিঙ্গের শিল্প, স্থাপত্য ও তান্ত্রিক সংস্কৃতির জীবন্ত সাক্ষী হয়ে।
