শিব-পার্বতীর মিলনোৎসব ঘিরে ভক্তদের উৎসাহ তুঙ্গে। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রবিবার, মহাশিবরাত্রি। ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রতি মহাশিবরাত্রিতেই নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন শিব ও শক্তি। কঠোর ব্রত পালনের পর মহাদেবের উদ্দেশে অর্ঘ্য নিবেদন করেন ভক্তদল। এ’দিন শিবের পুজো করলে নাকি মনমতো বর মেলে, বিশ্বাস তাঁদের।
ভারতের বিভিন্ন জায়গাতেই অত্যন্ত ধুমধামের সঙ্গে পালন হয় এই ধর্মীয় উৎসব। তবে বারানসীর ক্ষেত্রে যেন এক অনন্য মাত্রা পায় মহাশিবরাত্রি। জাত-ধর্ম ভেদে সারা পৃথিবীর মানুষ আসেন সেখানে, পশুপতিনাথের পুজোয় অংশ নেন আগ্রহভরে। তাছাড়া প্রতি বছর এখানে মহাসমারোহে আয়োজন করা হয় শিবের বরযাত্রীর!
ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয়ে যায় পুজোর তোরজোড়। বারাণসীর ঘাটে এসে হাজির হন উপোসি ভক্তেরা। পবিত্র গঙ্গায় ডুব দিয়ে উঠে, কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। মন্দিরের সামনে দীর্ঘ অপেক্ষার পর সুযোগ মেলে ভিতরে যাওয়ার। সেখানে মহাদেবকে অর্পণ করা হয় দুধ, ঘি, জল, বেলপাতা ও ফুল।
এলাকার প্রতিটি শিবমন্দিরই ফুল-আলোর মালায় সেজে ওঠে। বিকেল থেকে শুরু হয়ে সারা রাত জুড়ে চলতে থাকতে মহাদেবের উদ্দেশে ভজনকীর্তন। মধ্যরাতে আরতি শুরু হয়। আকাশ বাতাস মেতে ওঠে ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনিতে।
বারাণসীর মহাশিবরাত্রি অনুষ্ঠানের সবচাইতে আকর্ষণীয় অংশ হল ‘শিব বারাত’। পার্বতীর সঙ্গে বিবাহ হবে, তাই যাত্রী সমেত চলেছেন দেবাদিদেব। কোনও এক ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হয়, যিনি শিবের আদলে সেজে ওঠেন। কোমরে বাঘছাল, হাতে ত্রিশূল, গলায় জড়ানো সাপ। কেউ কেউ আবার সাহস করে সত্যিকারের সাপ জড়িয়ে নিয়েছেন গলায়, এমনটাও দেখা গিয়েছে! অন্যান্যরা কেউ গণেশ, কেউ ব্রহ্মা, বিষ্ণু, নরহিংস—প্রভৃতি দেবতার আদলে সেজে ওঠেন। কেউ কেউ আবার ভূতপ্রেত, উট-হাতিও সাজেন। সময় বিশেষে নাগা সন্ন্যাসীর দলকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে দেখা গিয়েছে এই যাত্রায়।
ব্যান্ডপার্টির ড্রাম-ট্রাম্পেটের ধবনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক। তিলভন্ডেশ্বরের হরিশ্চন্দ্র ঘাট থেকে একটি ‘বারাত’ পথ চলতে শুরু করে দুপুরবেলাতেই। দেড়সি পুলে পৌঁছে, আবার একই রাস্তায় ফেরত আসে। অন্যটি মৃত্যুঞ্জয় মহাদেব মন্দিরে শুরু হয়ে, শেষ হয় দেড়সি পুলে। কেদার মন্দির সংলগ্ন এলাকায় পূজিত হন শিব পার্বতীর আকাশছোঁয়া মূর্তি।
সন্ধে নামলে ‘পাঁচক্রোশী পরিক্রমা’ শুরু করেন হাজার হাজার ভক্ত। খালি পায়ে ‘হর হর বম বম’ বলতে বলতে এগিয়ে চলেন তাঁরা। তাঁদের জন্য পথের দুপাশে গজিয়ে ওঠে জল, ফল ও ঠান্ডাইয়ের দোকান। স্থানে স্থানে মেলা বসে। এ সময়ে গোটা শহর জুড়েই রমরম করে বিক্রি হয় বাদাম মেশানো ঠান্ডাই। থাকে নানা ধরণের মিষ্টিও।
মহাশিবরাত্রি তখন আর কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান থাকে না, হয়ে ওঠে বারাণসীর অন্যতম বৃহৎ মিলনমেলা।
