রাত তখন গভীর। চারদিকে নিস্তব্ধতা। রাজপ্রাসাদের শয়নকক্ষে নিভৃতে ঘুমাচ্ছিলেন রানি ত্রিশলা। সেই রাতেই তাঁর চেতনার অলিন্দে ভিড় করে এল ষোলোটি দিব্য স্বপ্ন। লৌকিক জগতের সীমানা ছাড়িয়ে সেই স্বপ্নগুলি বয়ে আনল এক অলৌকিক বার্তা। জৈন ধর্মের চব্বিশতম তীর্থঙ্কর ভগবান মহাবীরের জন্মলগ্নের ঠিক আগে এভাবেই প্রকৃতি সেজে উঠেছিল সেদিন।
রানি ত্রিশলা তাঁর অদ্ভুত স্বপ্নের কথা জানালেন রাজা সিদ্ধার্থকে। রাজা সিদ্ধার্থ কেবল সুশাসকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত ও জ্যোতিষবিদ। রানির মুখে একে একে ষোলোটি স্বপ্নের কথা শুনে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়লেন তিনি। সেই তেরোটি বা কারো মতে ষোলোটি স্বপ্নের প্রতিটি ছিল আগামীর এক অমোঘ ইঙ্গিত। রাজা জানালেন, রানি এক মহাশক্তিধর ও জগৎগুরু সন্তানের জন্ম দিতে চলেছেন।
ছবি: সংগৃহীত
রানি দেখেছিলেন এক বিশাল সাদা হাতি, যা আভিজাত্যের প্রতীক। দেখেছিলেন এক সাদা চামড়া ও লাল চোখবিশিষ্ট একটি সিংহ, যা সাহস ও শৌর্যের ইঙ্গিত দেয়। তাঁর স্বপ্নে ধরা দিয়েছিল জোড়া মাছ, এক বিশাল সমুদ্র এবং প্রস্ফুটিত পদ্মফুল, সাদা ষাঁড়, সুগন্ধী ফুলের মালা, পদ্মফুলে পরিপূর্ণ সরোবর। কখনও আবার তিনি দেখেছিলেন রত্নখচিত সিংহাসন, রত্নস্তূপ কিংবা ধোঁয়াবিহীন আগুন। আবার কোনও স্বপ্নে ছিল উদীয়মান সূর্য, পূর্ণিমা, সমুদ্রের ঢেউ, সর্পরাজ কিংবা পদ্মপাতা দিয়ে ঢাকা দুই পাত্র। প্রতিটি স্বপ্নের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ। কোনওটির অর্থ, আগত শিশুটি হবে অহিংসার মূর্ত প্রতীক। আবার কোনওটিতে বোঝা যায় সে হবে তিন লোকের অধিপতি।
জৈন পুরাণ মতে, এই স্বপ্নগুলিই ছিল মহাবীরের আগমনের আগাম বার্তা। তিনি কেবল একজন রাজপুত্র হিসেবে জন্মাননি, জন্মেছিলেন সত্য, অহিংসা ও ত্যাগের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে। রাজা সিদ্ধার্থের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তাঁর সন্তান হবে ‘ত্রিকালদর্শী’। অর্থাৎ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ যাঁর করায়ত্ত।
স্বপ্নগুলি কেবল দৃশ্য ছিল না, ছিল মানবসভ্যতার জন্য এক শান্তির পূর্বাভাস। মহাবীরের সেই পঞ্চশীল নীতি— অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহের ভিত্তি যেন রচিত হয়েছিল রানি ত্রিশলার সেই স্বপ্ন দেখার রাতেই। আজও মহাবীর জয়ন্তীর পুণ্যলগ্নে ধর্মপ্রাণ মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন রানি ত্রিশলার সেই ষোলোটি দিব্য স্বপ্নকে, যা বিশ্বকে দিয়েছিল এক মহামানবের আগমন বার্তা। চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মহাবীর। জৈন্যরা এই দিনটি মহাবীর জয়ন্তী হিসেবে পালন করেন। উদয় তিথি অনুসারে আজ ৩১ মার্চ পালিত হচ্ছে মহাবীর জয়ন্তী।
