কাঁটাতার ভাগ করেছে সবকিছু। কিন্তু মানুষের হৃদয় কি ভাগ করতে পারে? দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজপুর। দেবমাল্য মৌলিকের বাসগৃহ। প্রতিবছর আয়োজিত হয় বাসন্তী পুজো। এ পুজো কেবল পারিবারিক অনুষ্ঠান নয়। বরং দুই বাংলার সংস্কৃতির এক অটুট সেতুবন্ধন। ফরিদপুরের আদি ভিটে থেকে বয়ে আনা ৩০০ বছরের পুরনো পুজো। সেই ঐতিহ্য আজ লেবুতলার আকাশে-বাতাসে উৎসবের সুরে মেতে উঠেছে।
এ পুজোর ইতিহাস শুরু হয়েছিল অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পুজোর প্রাচীনত্বের প্রমাণ মেলে পূর্বপুরুষদের নামে খোদাই করা দেবীঘটে। দেশভাগের সেই উত্তাল সময়ে স্বর্গীয় পরেশ নাথ মৌলিক যখন ভিটেমাটি ছেড়ে এপারে চলে আসতে বাধ্য হন, তখন তাঁর সম্বল ছিল কেবল ৩০০ বছরের পুরনো বরাহদন্ত নারায়ণশিলা এবং সেই পবিত্র দেবীঘট। সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় ওপার বাংলা থেকে এপারে এসেও তিনি বিসর্জন দেননি তাঁর পারিবারিক পরম্পরাকে।
বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে লেবুতলা প্রাঙ্গণ।
মৌলিক বাড়ির প্রতিমার বিশেষত্ব নজর কাড়ে দর্শনার্থীদের। পদ্মশ্রী শিল্পী সনাতন রুদ্র পালের নিপুণ ছোঁয়ায় এখানে দুর্গারূপ ফুটে ওঠে এক ভিন্ন আঙ্গিকে। পূর্ববঙ্গের রীতি মেনে লক্ষ্মীর পাশে থাকেন কার্তিক। আর সরস্বতীর পাশে গণেশ। সাধারণত পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত সজ্জার ঠিক বিপরীত এই বিন্যাসই মৌলিক পরিবারের পুজোর অনন্য বৈশিষ্ট্য। মায়ের ডান পাশে কার্তিকের কাছেই অবস্থান করেন কলাবউ।
আচার-অনুষ্ঠানেও বজায় রাখা হয়েছে আদি বাঙালিয়ানা। নবমীর সন্ধিপুজোর হোম থেকে শুরু করে ৯ কেজি ওজনের বোয়াল মাছের ভোগ— সবটাই সাবেকিয়ানায় মোড়া। দশমীর দুপুরে পান্তা ভাত, কচু শাক আর পুঁটি মাছের পদ ছাড়া দেবীবরণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই খাদ্যাভ্যাস আজও মনে করিয়ে দেয় পদ্মা-আড়িয়াল খাঁ পাড়ের সেই পুরনো দিনের কথা।
বর্তমানে এই পুজো রাজপুর অঞ্চলের এক মিলন উৎসবে পরিণত হয়েছে। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় থেকে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় থেকে স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়— বিনোদন ও রাজনীতির জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে লেবুতলার প্রাঙ্গণ। বংশের বর্তমান প্রতিনিধি দেবমাল্য মৌলিকের কথায়, এই পুজো আমাদের কাছে নিছক উৎসব নয়, বরং এক পবিত্র উত্তরাধিকার। পূর্বপুরুষের সেই ঐতিহ্যকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ইতিহাসের ধুলো মেখে আজও রাজপুরে জীবন্ত হয়ে ওঠে এক টুকরো ফরিদপুর।
