হিমালয়ের উত্তুঙ্গ শৃঙ্গ। এক চিরন্তন নীরবতা। চারধারে শুধু ধবধবে সাদা বরফ। সেই হিমশীতল স্তব্ধতার বুকে ধ্যানমগ্ন এক তরুণ সন্ন্যাসী। পার হয়ে গিয়েছে বছরের পর বছর। ঋতু পরিবর্তনের আবর্তে ৯০ বার বরফ গলে জল হয়েছে, আবার জমেছে। কিন্তু টলেনি তাঁর আসন। অবশেষে একদিন ভোরের প্রথম আলো যখন সেই তপস্বীর জটায় এসে পড়ল, উদ্ভাসিত হয়ে উঠল চারদিক। গুহা থেকে বেরিয়ে বৃদ্ধ গুরু দেখলেন, শিষ্যের আসনে কোনও মানুষ নয়, অধিষ্ঠিত স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব! চোখের পলক ফেলতেই আবার তিনি চেনা শিষ্য। গুরুর চোখের বিভ্রান্তি মুছে সেদিন মর্ত্যের মাটিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। সেই সিদ্ধপুরুষই হলেন বাঙালির পরম আরাধ্য বাবা লাইনাথ, যাঁকে ভক্তরা ডাকেন 'শিব লোকনাথ' বলে।
আজ ৩ জুন, বুধবার (১৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩২)। লোকনাথ বাবার মহাপুণ্যময় তিরোধান দিবস। প্রতি বছর এই বিশেষ দিনে এবং জন্মাষ্টমী তিথিতে প্রতি বাঙালি হিন্দু পরিবারে পরম শ্রদ্ধায় পূজিত হন এই মহাযোগী। ১৭৩০ খ্রিষ্টাব্দে তদানীন্তন যশোহর জেলার বারাসতের চৌরশী চাকলা গ্রামে তাঁর জন্ম। মাত্র ১১ বছর বয়সে মা কমলা দেবী ও বাবা রাম নারায়ণের কোল ছেড়ে সন্ন্যাসের পথে পা বাড়ান লোকনাথ। সঙ্গে ছিলেন বাল্যবন্ধু বেণীমাধব এবং গুরু ভগবান গঙ্গোপাধ্যায়। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে কালীঘাটে এসে শুরু হয় তাঁদের কঠোর যোগ সাধনা।
কিন্তু শিষ্যের আসল পরিচয় প্রকাশ পেল হিমালয়ের তুষারাবৃত নির্জনতায়। যেখানে সাধারণ মানুষের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব, সেখানে খোলা আকাশে মরণজয়ী সাধনায় মগ্ন হলেন লোকনাথ। দীর্ঘ ৯০ বছরের সেই কঠোর ব্রত শেষে গুরু ভগবান গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর প্রিয় শিষ্যের মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছিলেন স্বয়ং শিবের পূর্ণ রূপ। গুরু হয়েও তিনি প্রণাম করেছিলেন শিষ্যকে। সেই থেকেই তিনি লোকমুখে পরিচিত হন 'শিব লোকনাথ' নামে।
তাঁর পুজোও অত্যন্ত সরল, ঠিক যেমন দেবাদিদেবের। নীল শাপলা বা নীল শালুক ফুল, সাদা ফুল আর মহাদেবের প্রিয় বেলপাতা ছাড়া তাঁর পুজো অসম্পূর্ণ। নৈবেদ্যেও জাগতিক আড়ম্বর নেই। তালশাঁস, কালোজাম, মিছরি, তালমিছরি কিংবা যে কোনও সাধারণ সাদা মিষ্টিতেই পরম তৃপ্ত হন এই ত্যাগী সন্ন্যাসী। বিপদে-আপদে আজও কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে ধ্বনিত হয় তাঁর সেই অভয়বাণী— ‘রণে বনে জলে জঙ্গলে যেখানেই বিপদে পড়িবে, আমাকে স্মরণ করিও আমি তোমাকে রক্ষা করিব’। মহাযোগী থেকে ঈশ্বর হয়ে ওঠার এই অলৌকিক কাহিনি আজও বাঙালির ভক্তিচেতনার এক পরম আশ্রয়।
