হিমালয়ের নিস্তব্ধতা ফুঁড়ে জেগে উঠছে এক অলৌকিক আহ্বান। চারপাশের বরফাবৃত শৃঙ্গগুলি যেন কোনও এক মহাজাগতিক মন্ত্রে দীক্ষিত। এ কোনও সাধারণ যাত্রা নয়। অনন্তকালের খোঁজে এ যেন এক অন্তহীন পথচলা। কৈলাস-মানস সরোবর—শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছেই নয়, বৌদ্ধ, জৈন ও অন্যান্য অনুসারীদের কাছেও তা পরম পবিত্র ভূমি। তবে, এ ২০২৬-এর এই যাত্রা অন্য সব বছরের চাইতে অনেকটাই আলাদা। এক অদ্ভুত মহাজাগতিক সংযোগে বছরটি হয়ে উঠেছে অনন্য আধ্যাত্মিক মহোৎসব। অনেকে একে বলছেন ‘কৈলাস মহাকুম্ভ’।
ফাইল ছবি
তিব্বতি ও বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালটি হল পবিত্র ‘অশ্ব বছর’ বা ‘হর্স ইয়ার’। বারো বছরে একবার ঘুরে আসে এই বিশেষ সময়। কিন্তু এবার মাহাত্ম্য আরও গভীর। কারণ, শুধু অশ্ব বছরই নয়, ৬০ বছর পর এবার ফিরে এসেছে ‘অগ্নি অশ্ব বছর’। তিব্বতি জ্যোতিষশাস্ত্রে ঘোড়া হল শক্তি, স্বাধীনতা এবং আধ্যাত্মিক অগ্রগতির প্রতীক। আর অগ্নি এনে দেয় শুদ্ধিকরণ এবং রূপান্তরের অমিত তেজ। এই দুইয়ের মিশেলে কৈলাস পর্বতের আধ্যাত্মিক শক্তি এখন তুঙ্গে। ভক্তদের বিশ্বাস, এই সময়ে মহাবিশ্বের সমস্ত ইতিবাচক শক্তি পুঞ্জীভূত হয়েছে দেবাদিদেব মহাদেবের এই পুণ্য বাসভূমিতে।
ফাইল ছবি
কৈলাস যাত্রার মূল আকর্ষণ হল ‘পরিক্রমা’ বা ‘কোরা’। বরফমোড়া দুর্গম পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ৫২ কিলোমিটারের এই পথ অতিক্রম করা ভক্তের কাছে চরম চ্যালেঞ্জের। বৌদ্ধ বিশ্বাস মতে, এই বিশেষ অগ্নি অশ্ব বছরে একবার কৈলাস পরিক্রমা করলে অন্য সাধারণ বছরের ১৩ বার পরিক্রমার সমান পুণ্য লাভ হয়। অর্থাৎ, আধ্যাত্মিক প্রাপ্তি এক ধাক্কায় বেড়ে যায় ১৩ গুণ। এর পাশাপাশি রয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৫৯০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত পবিত্র মানস সরোবর। লোকবিশ্বাস মতে, এই অগ্নি অশ্ব বছরে মানস সরোবরের হিমশীতল জলে ডুব দিলে জন্মের পর জন্ম ধরে জমে থাকা অশুভ কর্মফল ও পাপ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। মানুষ মুক্তি পায় সমস্ত নেতিবাচক সংস্কার থেকে।
ফাইল ছবি
২০২৬-এর কৈলাস যাত্রা এক বিরল সুযোগ। দুর্গম পথ, অক্সিজেনের ঘাটতি আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডা সত্ত্বেও লক্ষ লক্ষ মানুষ স্পর্শ করতে চান এই পুণ্যভূমি। কারণ, জীবনের সমস্ত জটিলতা কাটিয়ে এক নতুন ভোরের আলো দেখার এর চেয়ে বড় সুযোগ আর হয়তো কখনও আসবে না। এই সুযোগ হারালে আবার অপেক্ষা করতে হবে আগামী ২০৩৮ সাল পর্যন্ত। তাই জটাজটধারী শিবের ডাক উপেক্ষা করার সাধ্যই বা কার! সব মিলিয়ে, এবারের কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা প্রতিটি পুণ্যার্থীর জীবনে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হতে চলেছে।
