প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়: সা দেনি—তে স্তাদ দে ফ্রান্সের গ্যালারিতে বসে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখেছি। আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে। তবু আজ যখন যুবভারতীতে ঢুকব, নির্ঘাত মনের ভিতর একটা অালাদা উত্তেজনা হবে। আমার দেশ, আমার শহরে বিশ্বকাপ ফাইনাল! অনূর্ধ্ব সতেরো-টতেরো কোনও ব্যাপার নয়। বিশ্বকাপ ফাইনাল ইজ বিশ্বকাপ ফাইনাল!
দিনকয়েক আগে যুবভারতীর মাঠে ঢুকেছিলাম। মাঠ জুড়ে মখমলের মতো ঘাস। এরকম মাঠে বলের বাউন্স একইরকম থাকে। সারাক্ষণ বল একভাবে গড়ায়। হঠাৎ লাফিয়ে ওঠার আশঙ্কা নেই। আচমকা আটকে যাওয়ার দুশ্চিন্তা নেই। শেষ অক্টোবরে সান্ধ্য কলকাতার আবহাওয়া নব্বই মিনিট খেলার পক্ষে মনোরম। বছরের এরকম সময় ইংল্যান্ড গিয়েছি। স্পেনে ঘোরারও অভিজ্ঞতা আছে। দেখেছি, এখনকার কলকাতার মতোই ২৫-২৭ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকে কোনও কোনও সময়। দুই ফাইনালিস্ট টিমের এখনও পর্যন্ত টুর্নামেন্টে পারফরম্যান্স যদি দেখি, সেরা দু’টো দলই শনিবার যুব বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলছে।
[ ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপকেও হার মানাতে চলেছে যুব বিশ্বকাপের খুদেরা ]
ইংল্যান্ড সব ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠেছে। যার মধ্যে ব্রাজিলকে দাঁড় করিয়ে রিহান ব্রিউস্টাররা সেমিফাইনালে হারিয়েছে। স্পেন আবার একেবারে ঠিক সময় পিক করেছে। এই পর্যায়ের বিশ্বমানের টুর্নামেন্ট জিততে যেটা ভীষণ দরকার যে কোনও দলের কাছে। গ্রুপের প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের কাছে হারার পর আবেল রুইজদের খেলায় শুধুই উন্নতি ঘটেছে। সেমিফাইনালে মালির বিশাল শরীরের ছেলেদের প্রচণ্ড টাফ ফুটবলকে বশে আনা যায় স্প্যানিশরা দেখিয়ে দিয়েছে। ইংল্যান্ড—স্পেন, দু’টো টিমেরই স্কিল, ফিটনেস এই পর্যায়ের ফুটবলে টপ ক্লাস। একবিংশ শতাব্দীতে ফিফার সর্বোত্তম ফুটবলের জন্য স্লোগান হল, সর্বোচ্চমানের পিচ। যেখানে ম্যাচটা হবে। এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দু’দলকে খেলার সবদিক দিয়ে টপক্লাস স্কিলফুল এবং ফিট হতে হবে। আমার মতে আজ যুবভারতীতে বিশ্বকাপ ফাইনাল ফিফার দেওয়া সর্বোত্তম ফুটবলের ওইসব শর্ত পালন করার যোগ্য। টুর্নামেন্টের সেরা ম্যাচ হতে চলেছে ইংল্যান্ড বনাম স্পেন কাপ ফাইনাল।
[ ব্র্যান্ড ভ্যালুর নিরিখে মেসিকেও ছাপিয়ে গেলেন বিরাট ]
ব্রাজিল ম্যাচে ইংল্যান্ড গোলকিপার অ্যান্ডারসনের বুক থেকে বারদুয়েক বল বেরিয়ে গিয়েছিল ঠিকই। যার থেকে রিবাউন্ডে একটা গোলও খেতে হয়েছে সেদিন ইংল্যান্ডকে। কিন্তু অ্যান্ডারসনকে এই বিশ্বকাপে আমার সেরা গোলকিপার মনে হচ্ছে। অসাধারণ কিছু ওয়ান-টু-ওয়ান সেভ করেছে। দুর্ধর্ষ আউটিং, সাহস, অ্যান্টিসিপেশন। টুর্নামেন্টের একমাত্র টাইব্রেকারে একমাত্র পেনাল্টি সেভও অ্যান্ডারসনের। ইংল্যান্ড ভার্সেস জাপান প্রি-কোয়ার্টারে। ইংরেজদের ডিপ ডিফেন্স নিখুঁত না হোক যথেষ্ট নিরাপদ। অর্গানাইজড। বিপক্ষের কাউন্টার অ্যাটাকের সময় নিজেদের ডিফেন্সিভ থার্ডে ভুল বোঝাবুঝি কম। আর যেটাই করে খুব স্পিডে করে।
এরপর ইংল্যান্ডের মাঝমাঠ থেকে অ্যাটাকিং থার্ড তো সোনায় মোড়া। দুই উইংহাফ ফোডেন আর হাডসন গোটা দলটাকে খেলায়। ৪-৫-১ ফর্মেশনে পাঁচ মিডফিল্ডারেরই অফ দ্য বল মুভমেন্ট দুর্দান্ত। আর সিঙ্গল ফরোয়ার্ড ব্রিউস্টার তো এই বিশ্বকাপের সুপারস্টার। ওকে দেখে আমার পাওলো রোসিকে মনে পড়ে যাচ্ছে। আমাদের খেলোয়াড়জীবনে টিভিতে যতটুকু বিশ্বকাপ দেখতে পেয়েছি, রোসিকে দেখতাম ম্যাচে প্রায় নেইই। কোথায় রোসি? মাঠে খুঁজে পাওয়া দায়! কিন্তু ওরে বাবা, ইতালির কাউন্টার অ্যাটাকের সময় ঠিক অপোনেন্টের স্কোরিং এরিয়ায় পৌঁছে যেত রোসি। আর ছোট বক্সের মধ্যে রোসির পা কিংবা মাথায় বল মানে দশবারে সাড়ে ন’বার গোল! ব্রিউস্টার অনেকটা সেরকম দুর্ধর্ষ সুযোগসন্ধানী। ওকে আটকাতে আজ পুলিশ ম্যান লাগালে ভাল করবে স্পেন। জোনাল মার্কিং করে লাভ নেই। এধরনের স্ট্রাইকার মাঠের কখন কোথায় থাকবে কেউ জানে না!
ইংল্যান্ডের বাচ্চা ফুটবলারগুলোর খেলা ঠিক ওদের দেশের ট্র্যাডিশনাল ফুটবল নয়। কিক অ্যান্ড রান, লং বল, এরিয়াল পাসের বদলে এরা অনেক বেশি গ্রাউন্ড পাস, থ্রু পাসে দেখবার মতো খেলছে! টিমের প্রত্যেকে ইপিএলের কোনও না ক্লাবের অ্যাকাডেমি বা ইউথ টিমের প্লেয়ার। বোঝাই যায়, ইংল্যান্ড গ্রাসরুট থেকে খেলার স্টাইল বদলাতে শুরু করে দিয়েছে। রেজাল্টও পাচ্ছে। এবছর অনূর্ধ্ব ২০ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার দোরগোড়ায়।
তবে কাজটা বিন্দুমাত্র সহজ হবে না। স্পেনের অ্যাটাকিং ফোর্সও দুর্ধর্ষ। রুইজ, ফেরান টোরেস, সিজার, সের্জিও গোমেজ, মোখলিস-মিডল থার্ড থেকে অ্যাটাকিং থার্ডে প্রতিটা পজিশনে এক-একজন স্কিলফুল প্লেয়ার আছে। রুইজ তো হাফ ইনস্টেপে এই বিশ্বকাপে গোল করে দেখিয়েছে! তুলনা করাটা হয়তো বাড়বাড়ি হয়ে যাবে। তবু লেখার লোভ সামলাতে পারছি না। আমাদের সময় শ্যাম থাপা এরকম গোল করত। বক্সের মধ্যে বল রিসিভ করে ইনস্টেপের হালকা একটা পুশে গোল। এতটাই দুর্দান্ত রিফ্লেক্স ছিল। রুইজ মাত্র সতেরোতেই সেই ‘অ্যাকুইরেসি’-তে পৌঁছে গিয়েছে!
[ মোহনবাগান যতদিন চাইবে, ততদিন এই ক্লাবেই খেলার আশ্বাস সোনির ]
স্পেনের জুনিয়র টিম তিকিতাকা খেলে, মিডল থার্ডে টানা ১০-১৫টা স্কোয়ার পাস খেলতে খেলতে আচমকা একটা নিখুঁত থ্রু পাস বাড়ায় সামনে। সঙ্গে ঠিক সেই মুহূর্তে এক বা দু’জন অফ দ্য বল প্রচণ্ড গতিতে ওপেন স্পেসে চলে গিয়ে বিপক্ষ ডিফেন্সকে ধাঁধায় ফেলে দিচ্ছে। এটা নতুন। স্পেনের এই তিকিতাকা আর ডাইরেক্ট ফুটবল মেশানো অ্যাটাককে যদি ইংল্যান্ড ডিফেন্স আটকাতে না পারে, তাহলে ঘোর বিপদ। তারজন্য স্প্যানিশদের মাঝমাঠে খুব ক্লোজ মার্কিং করতে হবে। গায়ে লেগে থাকা দরকার। তাতে দু’-একটা ফাউল, কার্ড-টার্ড হলে হবে ইংল্যান্ডের। প্রিভিউতে কি আমাকে ইংল্যান্ডের সাপোর্টার মনে হচ্ছে? সেটা যদি নাও হই। ফাইনালে কিন্তু ইংল্যান্ডকে এগিয়ে রাখব। ৬০-৪০।
The post যুবভারতীতে রুইজ বনাম ব্রিউস্টার, মেগা ফাইনাল ঘিরে তুঙ্গে উত্তেজনা appeared first on Sangbad Pratidin.
