রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়: চাপ চাপ পেশি, ক্রু কাট চুল, গর্বিত গ্রীবা আর আকাশছোঁয়া লাফের সাত নম্বরকে দেখে আবার মনে হল, এ ফুটবলার কিছুতেই নয়। এ জীবন ও ফুটবল-যৌনতার যৌথ ছায়াছবি যেন।
প্রতিভা অল্পবিস্তর সব দেশে থাকে। প্রাতঃস্মরণীয় প্রতিভাও থাকে। ব্রাজিলে আছে। আর্জেন্টিনায় আছে। আছে স্পেনে, ফ্রান্সে, নেদারল্যান্ডসে। লিওনেল মেসির ফুটবল বৃষ্টিভেজা সন্ধেয় প্রেমিকাকে চুম্বনের স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়ে যায়। নেইমারের পায়ে পায়ে মিশে থাকে স্কুললাইফ রোম্যান্সের উচ্ছ্বলতা। গ্রিজম্যান বা দাভিদ সিলভার শিল্পও বড় কম নয়। এঁরাও মাঠে নেমে আপনমনে ছবি আঁকেন। কেউ ভ্যান গঘ। কেউ ভিঞ্চি।
কিন্তু উদ্দাম ফুটবল-যৌনতা? এঁদের ফুটবল দেখে যৌনতৃপ্তির সুখপ্রাপ্তি?
[রাশিয়া বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিক করে স্প্যানিশ আর্মাডা রুখে দিলেন রোনাল্ডো]
নাহ্। আশাহীন জীবনের শেষ আশাবাদ খুঁজে পাওয়া? হেরে যেতে পারি জেনেও কিন্তু ‘কেন যাব’-র মরণখিদে? উহুঁ। গ্রেট, জিনিয়াস, দ্য বিস্ট, ফুটবলের জিরো জিরো সেভেন-ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর আজ পর্যন্ত এ হেন সহস্র নাম, অর্বুদ বিশেষণ শোনা হয়ে গিয়েছে। ভবিষ্যত আরও এ সব তাঁকে উপহার দেবে। কিন্তু শুক্রবারের সোচি রাতের ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর সঙ্গী কোনও নাম বা বিশেষণ হতে পারে না। ও সব নামধাম, বিশেষণ-টিশেষণ আম-প্রতিভাবানের জন্য। পৃথিবী যাদের সাধ্যের সীমারেখা, অনন্ত মহাকাশ নয়। সোচির সিআর তো তা নন। সোচির সিআর দেখে মুমূর্ষ তার শেষ আশাকে জীবিত রাখতে পারবে। সে ভাবতে পারবে, মৃত্যুর পাগলাঘণ্টি শুনতে শুনতেও আমি পারি জীবনের শেষ ফ্রি-কিকটা মারতে। সোচির সিআর দেখে দৈনন্দিন দিন আনি, দিন খাইয়ের দিনমজুর রাতে শুয়ে বিশ্বাস করবে চেষ্টা করলে ঠিক পারব ভাগ্যের চাকাটা ঘোরাতে। সোচির সিআর দেখে নারী কল্পনা করতে পারবে তার স্বপ্নের পুরুষ, পুরুষ ফিরে পাবে তার পুরুষাকার। এরপর তুলনায় অনেক শক্তিশালী এগারোর বিরুদ্ধে সে একা লড়তে ভয় পাবে না। প্রাপ্য কেউ কেড়ে নিতে এলে সে স্বপ্ন দেখবে দাঁড় করিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেওয়ার!
সময় সময় মন বলছে, সোচির সিআর আরও একটা জায়গায় বোধহয় জিতে গেলেন। পর্তুগাল দেশটার গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে, নিজেই আস্ত একটা দেশ হয়ে উঠে। যাকে সমর্থনে কোনও ভেদাভেদ নেই, গোটা পৃথিবীটাই তার সমর্থক। নিজে আমি অন্ধ ব্রাজিল সমর্থক। কিন্তু শুক্রবারের রোনাল্ডোর একক খুনে লড়াই দেখে বারবার মনে হয়েছে, রাশিয়া বিশ্বকাপটা এঁর হাতে উঠলে বেশ হয়। বিশ্বকাপ আবার আসবে, কিন্তু রোনাল্ডো তো আর খেলবেন না। আর শুধু আমি কেন? মধ্যরাতে এক বন্য জার্মান সমর্থককে রোনাল্ডো দেখে এমন উল্লসিত হতে দেখেছি, যা সে ব্রাজিলে জার্মানি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরেও হয়েছিল কি না সন্দেহ! নীল-সাদা রংয়ের বাইরে বর্ণান্ধ এক আর্জেন্টিনা সমর্থককে অফিসের ছাদে খুঁজে পেয়েছি যে আক্ষেপ করেছে, এই নির্মম লড়াইয়ের মননটা যদি মেসির থাকত! বললাম না, রোনাল্ডো নিজেই এখন দেশ। ফুটবলের জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই তাঁর সমর্থক, গোটা পৃথিবী তাঁর সমর্থন। আর আক্ষেপ সত্যিই তো। সুযোগ মেসিও পেয়েছিলেন। কাপ ফাইনালে। এ রকমই একটা ফ্রি-কিক ছিল। কিন্তু মেসি পারেননি। পারলে রোনাল্ডোর সঙ্গে তুলনাটাই আর আসত না।
[স্পেন ম্যাচের আগে বড় ধাক্কা, কর ফাঁকি মামলায় দোষী সাব্যস্ত রোনাল্ডো]
শুক্র গেল। শনি এল। রোনাল্ডো গেলেন। মেসি নামবেন। কে জানে কেন মনে হচ্ছে, আজও কিছু না কিছু ঠিক ঘটবে। মেসি হয় বরফের দেশকে জিনিয়াসের আগুনে ছাই করে দেবেন। নইলে নিজে ছাই হয়ে যাবেন। আইসল্যান্ডকে তো আজ আর মাঠে খেলবেন না লিও। খেলবেন রোনাল্ডোকে। তাঁর তিন গোলকে। মেসি পারলে রোনাল্ডোর সঙ্গে তাঁর মর্যাদার বিশ্বকাপটা প্রলম্বিত হবে। চলবে। আর না পারলে? তখন কিন্তু লিখতে হবে, ফুটবল-দেবতার যিশুসুলভ মুখও নেই, গালভর্তি দাড়িও নেই। বরং তাঁর গায়ে পর্তুগিজ রক্ত আছে!
The post জীবন ও ফুটবল-যৌনতার যৌথ হাতছানি, সোচির রাত দেখল ‘এলিয়েন’ রোনাল্ডোকে appeared first on Sangbad Pratidin.
