কী কী শট নেওয়া নিষিদ্ধ ইন্টারভিউ শুরুর আগেই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে! দেওয়ালির শব্দবাজির মতোই কড়া দমননীতির মধ্যে পড়ছে সেই সব প্রশ্ন যা দুম করে পেলের সামনে ফাটতে পারে। চকোলেট বোম তো চলবেই না। এমনকী এই পরিবেশে কালিপটকাও না। তিনটে প্রশ্ন খুব দ্রুত তৈরি খসড়া থেকে বাদ দিয়ে দিলাম। এক, আপনি মারাদোনাকে পছন্দ করেন না কেন? দুই, এই পর্যায়ের সশ্রদ্ধ অধিষ্ঠান নিয়েও কখনও ফিফার বিরোধিতা করেননি কেন? তিন, গ্যারিঞ্চার পরিবারের অভিযোগ কি সত্যি যে আপনি তাদের এত দুরবস্থা জেনেও পাশে দাঁড়াননি?
[মাত্র ২৫ মিনিটে প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিয়ে ডেনমার্ক ওপেন চ্যাম্পিয়ন শ্রীকান্ত]
২০১৫-র অক্টোবর। কলকাতার সুইসোটেলের দুপুর। এটিকে কর্ণধার সঞ্জীব গোয়েঙ্কার আমন্ত্রণে লাঞ্চে এসেছেন পেলে। এত সময় কম এবং এত সব গণ্যমান্য অতিথি তাঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য ব্যাকুল যে আলাদা করে কোনও সময়ই বার হচ্ছে না ইন্টারভিউয়ের। অথচ তেমনই কথা ছিল যে, ধারের কোনও কেবিনে একান্তে নিয়ে যাওয়া যাবে পেলেকে। উল্টে দেখা যাচ্ছে একটা অভিনব ব্যবস্থা। পর্দা ঘেরা একটা কেবিনে কিছু ভিভিআইপি অতিথির সঙ্গে বসা পেলে। শুরু হয়ে গিয়েছে সেভেন কোর্স লাঞ্চ। জানা গেল অন্তত পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশ মিনিট সময় নেবেন তিনি। সেই সময়ের মধ্যে দফায় দফায় অতিথিরা গিয়ে বসবেন পেলের পাশে। ছবি তুলবেন। উঠে যাবেন। আবার পরের লোক গিয়ে বসবেন। আমার ইন্টারভিউয়ের যদি সুযোগ হয়, লাঞ্চের শেষের দিকে।
মনে মনে যখন সাক্ষাৎকারের অপমৃত্যু দেখছি, পেলে প্রায় মেন কোর্স শেষ করে ফেলার দিকে। এমন সময় এটিকে-র তরফে জয়নীল মুখার্জি অভিনব বক্তব্য নিয়ে হাজির হলেন। এখুনি আমাকে পেলের পাশে বসিয়ে দেওয়া হবে। তিনি লাঞ্চ শেষ করা পর্যন্ত আমার সময়সীমা। মানে বড়জোর পনেরো থেকে সতেরো মিনিট। একান্তে হয়েও একান্তে নয়, কারণ আশপাশে লোক ঠাসা।
[অভিশাপ মুক্ত ব্রাজিল, যুব বিশ্বকাপ থেকে বিদায় জার্মানির]
সেটা যদি বা মানা গেল, এই বেখাপ্পা সেটিংয়ে এমন বিশ্বখ্যাত মানুষকে ইন্টারভিউ করব কী করে? চারপাশে আওয়াজ। দু’হাতের মধ্যে লোক। সামনের টেবিলটা পাঁচ গজ দূরেও নয়। তারা তো সবই শুনতে পাবে। পেলেকে ঘিরে এটা একটা অদ্ভুত পুজো পরিক্রমার দমকা হাওয়া। এর মধ্যে একান্ত ইন্টারভিউ কী করে সম্ভব? হট্টগোলের মধ্যে কে কবে তার প্রার্থিত মহানায়কের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছে?
তার চেয়েও বড় সমস্যা এমন ক্ষণজন্মা মেগাস্টার ভিনদেশে অতিথি হয়ে খেতে বসেছে। খাওয়ার মধ্যে তাকে প্রশ্ন করাটা চরম অসৌজন্য। দুই, খেতে খেতে সে উত্তর দেবে কী করে? উত্তরগুলো তো মোনোসিলেবলসের মতো হয়ে যাবে। হুঁ। হ্যাঁ। না। কিন্তু। সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা বুঝিয়েছে, টেস্ট ব্যাটসম্যানের রান তোলার সেরা সময় যেমন লাঞ্চ থেকে টি-র মধ্যবর্তী সেশন। তেমনই বেস্ট কোয়ালিটি ইন্টারভিউ পাওয়ার সেরা সময় প্রার্থিত ব্যক্তি খাওয়া শেষ করে ওঠার পর। সেটা ব্রেকফাস্ট হতে পারে। লাঞ্চ হতে পারে। ডিনার হতে পারে। খাওয়ার মধ্যে কখনও নয়। ইন্টারভিউয়ের প্রশ্নে ফুলঝুরি আর রংমশাল জ্বালিয়ে বসে থাকতে হবে, সে তো পরের কথা। তার চেয়ে বিপজ্জনক হল, এই সেটিং অ্যাদ্দিনকার উপলব্ধিকে যে তীব্র স্লাইডিং ট্যাকল করছে।
[বৃথা গেল বিরাটের সেঞ্চুরি, শুরুতেই নিউজিল্যান্ডের কাছে হার ভারতের]
দ্রুত বোঝা গেল বেগার্স কান্ট বি চুজার্স। এই পেলের হাতে যতই স্টিক থাকুক। মুখচোখ নিস্তেজ ভাব দেখাক। রোজকার মতো আজও তিনি মোনোপলি সেলার্স মার্কেট। তাঁর শর্তে তাঁকে মানতে হবে। বেগড়বাই করলে স্প্যাম খোলা। সাক্ষাৎকারের শেষে অবশ্য চমৎকৃত লেগেছিল। মানুষটা কী আদ্যন্ত পেশাদার। এত সব লোক ঘাড়ের ওপর। একটা ড্রিঙ্ক আধখানা শেষ করেছেন। ডেজার্ট শুরু হবে। খাওয়ার স্নিগ্ধতায় ক্রমাগত বাধা বসাচ্ছে অপরিচিত মিডিয়া। তাকে পেনাল্টি বক্সে অনায়াসে ড্রিবল করে যাওয়া। পেলে বলেই সম্ভব। ঘাড় কাত করে এমন নিচু গলায় উত্তরগুলো দিলেন যে, আমিই শুধু শুনতে পেলাম…
ডন ব্র্যাডম্যান আপনার খুব পরিচিত ছিলেন?
পেলে: ব্র্যাডম্যান? না তো! ঠিক বুঝলাম না।
অস্ট্রেলিয়ায় ব্র্যাডম্যানের উপর লেখা বিশেষ বইতে আপনাদের পাশাপাশি দাঁড়ানো হাসিমুখের ছবি দেখেছি। সেটা তো অ্যাডিলেডে ব্র্যাডম্যানের বাড়ির ড্রয়িংরুমেই তোলা।
পেলে: (একটু ভেবে) এবার বুঝতে পেরেছি। হুবল ঘড়ি কোম্পানির হয়ে আমি ইন্টারন্যাশনালি অ্যাড ক্যাম্পেন করেছি বহু বছর। আমি ওদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডর। হুবল-ই আমাকে অ্যাডিলেডে মিস্টার ব্র্যাডম্যানের বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল।
সেটাই পেলে-ব্র্যাডম্যান প্রথম ও শেষ দেখা?
পেলে: হ্যাঁ, আর মনে পড়ছে না কখনও ওঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে বলে। আমি এমনিতে দুমদাম অপরিচিত কারও বাড়িতে যাই না। কিন্তু হুবল-ই প্রস্তাব দেয় যে, আমি যাতে ওঁর বাড়ি যাই। মনে হয় ব্র্যাডম্যান অস্ট্রেলিয়াতে ওদের মডেল ছিলেন। সেটাই হয়তো আমাদের দু’জনকে পাশাপাশি দাঁড় করাবার কানেক্টিং পয়েন্ট হয়ে থাকতে পারে।
ব্র্যাডম্যান সম্পর্কে আর বিশেষ কিছু হুবল-র লোকেরা বলেনি?
পেলে: বলেছিল (হাসি) যে উনি হলেন ক্রিকেটের পেলে (হাসি)।
তাজ বেঙ্গলের প্রেস কনফারেন্সে সেদিন যখন আপনাকে জিজ্ঞেস করা হল, পারতেন এই আমলের তীব্র ম্যান মার্কিংয়ের যুগে নিজের পুরনো শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে? তখন আপনি তীব্র ব্যঙ্গের সঙ্গে বললেন, তাহলে তো বলতে হয় বিথোফেন এখনকার দিনে বাজাতে পারতেন না?
পেলে: ঠিকই তো বলেছি। আপনার স্কিল যদি সর্বোচ্চ মাপের হয়, তাহলে সে সব আমলেই বিপক্ষকে হটিয়ে নিজের জায়গা করে নেবে। টপ লেভেল স্কিল শতাব্দী মানে না।
কিন্তু এখন তো নজরদারির সূক্ষ্মতা অনেক বেড়েছে। স্লো মোশন রিপ্লেতে কেটে কেটে বিশ্লেষণ হয়। স্ট্রাইকারের রহস্যকেই উধাও করে দেওয়ার সুযোগ হাতের কাছে।
পেলে: তাই কি? তাহলে আজকের দিনে আমরা এত মেসিকে নিয়ে কথা বলি কেন? কেন নেইমার এত সফল? ওদের উপর কি গবেষণা হয় না।
আধুনিক সময়ের হার্ড ট্যাকল…
পেলে: (থামিয়ে দিয়ে) কীসের হার্ড ট্যাকল? এখন তো ফিফা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার বা ফরোয়ার্ডদের কত রকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা করেছে। ছুঁলেই ডিরেক্ট ফ্রি কিক পাওয়া যায়। বক্সের মধ্যে হলে পেনাল্টি। আমার প্লেয়িং লাইফের বেশির ভাগ সময় তো দেখার কেউ ছিল না। সিক্সটি সিক্সের ইংল্যান্ডে যখন এইরকম মার খেয়েছিলাম কে পাশে ছিল? আমাকেই টুর্নামেন্ট থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল।
আশ্চর্য লাগছে। পঞ্চাশ বছর হয়ে গেছে ঘটনার। তবু এমন যন্ত্রণার সঙ্গে বলছেন যেন পঞ্চাশ মিনিট আগের কথা।
পেলে: এ জন্যই জ্বলজ্বলে আছে যে, ওই মার কেরিয়ারের ফরদাফাই করে দিতে বসেছিল। ইংল্যান্ডে বসে মনে হয়েছিল ফুটবল জীবনটাই অনিশ্চিত হয়ে গেল। মেক্সিকো নাইনটিন সেভেনটির ওয়ার্ল্ড কাপ তাই আমার কাছে খুব ইমপর্ট্যান্ট ছিল।
ইমপর্ট্যান্ট বলতে?
পেলে: লোকে হয় আমায় মুছে দেওয়ার জন্য তৈরি ছিল। অথবা আর এক শ্রেণির লোক খুব বেশি চাইছিল আমার কাছে। দুটোই ছিল এক্সট্রিম। বেশ বুঝতে পারি, সেভেনটির ওয়ার্ল্ড কাপ না জিতলে আমার ট্যালেন্ট নিয়ে বোধহয় গণসন্দেহ তৈরি হত।
পেলের ঔজ্জ্বল্য থাকত না?
পেলে: (উত্তর না দিয়ে ঘাড় নাড়ালেন)।
ষাট বছর হল ফুটবল নিয়ে ঘাঁটছেন। সুইডেনে ওইরকম চমকপ্রদ আবির্ভাবের পরেই তো আপনি পেলে হয়ে গিয়েছিলেন।
পেলে: ইয়েস সুইডেন ওয়াজ ভেরি সুইট (এটাও এমনভাবে বললেন যেন এখুনি ঘটল)। সুইডেনে ওরা আমাকে দারুণ সম্মান দিয়েছিল। খুব ভালবেসে ছিল। তার আগে অবশ্য ব্রাজিলে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়েছিল। মনে রাখবেন আমি যখন সান্টোসের মতো জবরদস্ত টিমের হয়ে প্রথম খেলি তখন আমি সবে পনেরো।
আজও তাই বলা হয় অন্য তারকারা দুর্ধর্ষ ফুটবল খেলত। আপনি খেলতেন অন্য কিছু!
পেলে: আমি ঈশ্বরের কাছে আজও কৃতজ্ঞ যে, অবিশ্বাস্য ট্যালেন্ট দিয়ে উনি আমায় পাঠিয়েছিলেন। আজও পৃথিবীর সর্বত্র যখন ফুটবল নিয়ে ঘুরি, কথা বলি। সভা-সমিতিতে যাই। তখন মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিই। সবই ওঁর মহিমা।
মাঠের মধ্যে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় আপনি যে সব সিদ্ধান্ত নিতেন। সেগুলো ওই মিলি সেকেন্ডে কীভাবে নেওয়া সম্ভব ছিল?
পেলে: উত্তর দিতে পারব না। এটাই বোধহয় ট্যালেন্ট। এটাই বোধহয় ঈশ্বরের দান। আর আমার বাবার আশীর্বাদ। রিটায়ারমেন্টের পরে এই প্রশ্নটা আমায় বহু বার করা হয়েছে। আমায় বলতে হয়েছে ফিল্মের পেলেকে দেখে বাস্তবের পেলে নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেছে। তার বল কন্ট্রোল যতই নিখুঁত আর স্পিডি থাক। কী করে ওই স্পিডে সে ঠিক ডিসিশনগুলো নিত? আমি নিজেই জানি না।
বলা হয়ে থাকে প্রত্যেক ক্ষণজন্মা প্রতিভার মধ্যে অতিরিক্ত এনার্জির যে ঢেউ থাকে সেটাকে কন্ট্রোল করার জন্য তার একটা আধারের প্রয়োজন হয়। নইলে সেই প্রতিভা নিজেকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেবে। আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়াবে। যেমন হয়েওছে অনেক জিনিয়াসের ক্ষেত্রে। আপনি ব্যতিক্রম। কারণ আপনার প্রতিভা নাকি আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিল ক্যাথলিক ধর্মের রক্ষণশীলতায়।
পেলে: (সোজা হয়ে বসলেন) ইন্টারেস্টিং বিষয়। আমার নিজের বিশ্বাস, আমাকে বয়ে যেতে দেয়নি আমার বাবার শিক্ষা। ধর্মভীতির চেয়েও এটাকে আমি বড় করে দেখতে চাই উনি আমায় নাম করার পর কী বলেছিলেন। সেটাকেই জীবনের মন্ত্র মনে করে আমি এগিয়েছি।
কী বলেছিলেন?
পেলে: বাবা বলতেন সব সময় লোকের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করবে। কখনও কাউকে ছোট করে দেখবে না। মনে রাখবে নিজেকে সেরা ভাবতে শুরু করলে ফুটবলার হিসাবে তোমার গ্রোথ বন্ধ হয়ে যাবে। আর তুমি এগোতে পারবে না। বাবাই আমার হিরো। বাবাই আমার জীবনের গাইডিং লাইট। যত বয়স বাড়ছে তত যেন বাবার শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাটা বুঝতে পারছি।
উনি খেলতেন?
পেলে: একটা লেভেল অবধি চুটিয়ে খেলতেন। ইন ফ্যাক্ট আমার বাবার একটা রেকর্ড আছে যা হাজারের ওপর গোল করেও আমি কখনও ভাঙতে পারিনি (হাসি)।
তাই?
পেলে: হ্যাঁ একটা ম্যাচে ড্যাড পাঁচ গোল করেছিলেন। পাঁচটা গোলই হেড করে। আমি ফুটবল জীবনে হাজারের উপর গোল করেছি। কখনও হেডে পাঁচ গোল করতে পারিনি (খিলখিল হাসি)।
জানতাম না আপনি নিজের বাবার কাছে এত ঋণী। কোথাও পড়িওনি।
পেলে: আমার জীবনটা ওঁর দর্শন মেনেই। আর একটা কথা বলেছিলেন যা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছি।
কী?
পেলে: বলেছিলেন আঁকড়ে পড়ে থেকো না। তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিও। নইলে সমালোচকেরা গুলি করার সুযোগ পাবে। আমি সেই সুযোগ কাউকে দিইনি।
স্যান্টোস স্টেডিয়ামের ঠিক উল্টো দিকে একটা চুল কাটার ছোটখাটো সেলুন রয়েছে। তার মালিক দাবি করেছিলেন, চল্লিশ বছর ধরে আপনি নাকি ওই সেলুনে চুল কাটছেন।
পেলে: (হাসি) অনেকটাই সত্যি। আমার পুরনো বন্ধু, পুরনো মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ কখনও বদলায়নি।
ষাট বছর ধরে ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন। কাকে দেখেছেন আপনার ট্যালেন্টের সবচেয়ে কাছাকাছি?
পেলে: এটা এক কথায় বলা খুব শক্ত। এত সব বড় ফুটবলার খেলে গেছে।
গ্যারিঞ্চা?
পেলে: গ্যারিঞ্চা দুর্ধর্ষ ছিল। গ্যারিঞ্চা বল নিয়ে জাদু দেখাত। কিন্তু আমি বোধহয় সামান্য আগে রাখব জর্জ বেস্টকে।
কেন?
পেলে: বেস্ট আরও কমপ্লিট প্লেয়ার ছিল।
জর্জ বেস্ট বলছেন এত ভাল। তাহলে তাঁর সেই ব্যাপ্তি বিশ্ব ফুটবলে ফুটে বার হয়নি কেন?
পেলে: পসিবলি হি ওয়াজ উইথ দ্য রং কোম্পানি অ্যাট দ্য রং টাইম।
গ্যারিঞ্চা নিয়ে ব্রাজিল আজও আবেগে ভরপুর। গ্যারিঞ্চার বাড়িতে ওঁর আত্মীয়দের সঙ্গে আমি দেখা করতে গেছিলাম। ওঁরা বলছিলেন…
পেলে: (পেলে একটু মুখ তুলে তাকালেন) গ্যারিঞ্চা ভাল বন্ধু ছিল। ওর পরিবারের সঙ্গে আমি তো নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। (এই জায়গাটায় মনে হল পেলে সত্যি বলছেন না। কারণ গ্যারিঞ্চার পরিবারের তীব্র ক্ষোভ, পেলের সম্পূর্ণভাবে তাঁর সহ খেলোয়াড়কে ভুলে যাওয়া। কিন্তু পরিবেশ এমন যে এখানে আক্রমণাত্মক ফলোআপ প্রশ্ন সম্ভব নয়)।
মারাদোনাকে কোথায় রাখবেন?
পেলে: খুব ভাল। তবে গ্যারিঞ্চাকে সামান্য এগিয়ে রাখব।
এই যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফুটবলারকে ঘিরে আলোচনা হয়েছে ‘নতুন পেলে’ বলে। কখনও ক্রুয়েফ। কখনও জিদান। কখনও জিকো। কখনও রোনাল্ডো। কখনও মারাদোনা। তখন আসল পেলে কী ভেবেছেন?
পেলে: ভেবেছে যে, কী করে সম্ভব? বাবা-মা তো বহু বছর মেশিন বন্ধ করে পরপারে চলে গিয়েছেন (অট্টহাসি)।
বিশ্বকাপে ব্রাজিল যেদিন জার্মানির কাছে ১-৭ হারল আপনি বেলো হরাইজন্তের মাঠেই ছিলেন। ফিফার ভিভিআইপি বক্সে বসে ছিলেন। অনেক চেষ্টাতেও সেদিন আপনাকে ধরতে পারিনি। আজ জিজ্ঞেস করছি, কী মনে হয়েছিল ব্রাজিলের ওই হেনস্তা দেখে?
পেলে: সেদিন এমনিতেও আমার কথা বলার মতো অবস্থা ছিল না। আই ওয়াজ টেরিবলি শকড। আমার আজও মনে হয় আমাদের স্ট্র্যাটেজিতে গন্ডগোল ছিল। ব্রাজিল তার নিজস্ব পদ্ধতি ফলো করলে এই জিনিস ঘটত না। আমি কোচকে দায়ী করতে চাই।
নিজস্ব পদ্ধতি বলতে?
পেলে: ক্রিয়েটিভিটি অনুসরণ করা। ওটাই আমাদের ফুটবলের মাহাত্ম্য-জিঙ্গা। ব্রাজিলকে সৃষ্টিশীল ফুটবল খেলতে হবে। ওটাই তার ‘এজ’ (জিঙ্গা কাকে বলে, সেটা পরের বছরে ‘পেলে’ ফিল্ম দেখে বুঝতে শিখি। ইন্টারভিউ নেওয়ার সময় জানতাম না)।
আধুনিক ফুটবল পণ্ডিতদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী জার্মানদের মতো টাফেস্ট ফুটবল মেশিনের বিরুদ্ধে নিছক ক্রিয়েটিভিটি অচল।
পেলে: (অপাঙ্গে তাকিয়ে) সেজন্যই সেদিন বলছিলাম বিথোফেন আজ জন্মালে লোকে কি তাঁর বাজনা শুনত না? ক্রিয়েটিভিটি যে কোনও সিস্টেমকে হারাতে পারে।
ফুটবল নিয়ে গোটা বিশ্বের চেতনাকে বলতে গেলে আপনিই ঘুরিয়ে দিয়েছেন।
পেলে: আমি আবার নিজেকে লাকি বলতে চাই। বলতে চাই আমি যেভাবে এত বছর সারভাইভ করেছি, সেটাও ঈশ্বরের একটা আশীর্বাদ। আমার মনে আছে ‘এসকেপ টু ভিকট্রি’ যখন শুটিং হচ্ছিল, তখন সিলভেস্টার স্ট্যালোন আমাকে বলেছিল, তুমি গোলকিপার দাঁড়াও। আমি শট মেরে গোল করব। তার পরে বলে লাথি-টাথি মেরে আমায় বলেছিল, ফুটবল খুব কঠিন খেলা। শুনে খুব মজা পেয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল সেটা আমার চেয়ে ভাল কে জানে (হাসি)?
সাক্ষাৎকার সৌজন্য: সঞ্জীব গোয়েঙ্কা।
The post ‘আমাকে বখে যেতে দেননি আমার বাবা’ appeared first on Sangbad Pratidin.
