কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন আপনি। আর আপনার টেবিলের কয়েক ইঞ্চি দূরেই আস্ত এক লোকোমোটিভ ইঞ্জিন। আপনার গা ঘেঁষে সশব্দে বেরিয়ে যাচ্ছে ট্রেন। চিত্রটা ঠিক এমনই। সমাজমাধ্যমের যুগে যা হয়ে উঠেছে অন্যতম ‘ইনস্টা-ডেঞ্জারাস’ স্পট। স্রেফ একটা হাড়হিম করা সেলফি বা রিলস বানানোর নেশায় এখানে ভিড় জমান হাজার হাজার মানুষ। হ্যাঁ, আমি কথা বলছি ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের ‘ট্রেন স্ট্রিট’ প্রসঙ্গে। এই স্থানের বিপজ্জনক পর্যটক-উন্মাদনায় এবার পাকাপাকিভাবে যবনিকা পড়তে চলেছে।
ছবি: সংগৃহীত
সরু গলি। দুপাশে সারিসারি দোকান ও ক্যাফে। মাঝে রেললাইন। ওই রেললাইনের উপরই চেয়ার টেবিল বিছিয়ে চলে দেদার কেনাবেচা। ট্রেন আসার মুহূর্তে গোটানো হয় তলপিতলপা। আর চলে গেলে আবারও বিছিয়ে দেওয়া হয় টেবিল-চেয়ার। শুর হয় বিক্রিবাটা। এটাই এখানকার দস্তুর। এই ট্রেনের অপেক্ষাতেই বসে থাকেন পর্যটকরা। টেবিলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় লেন্সবন্দি হয় সেই অসম্ভব ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্ত।
ছবি: সংগৃহীত
বিপজ্জনক এই পর্যটন কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে এবার চরম পদক্ষেপ করতে চলেছে হ্যানয় পিপলস কমিটি। এতদিন রেললাইনের ধারের ক্যাফেগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করত প্রশাসন। কিন্তু পর্যটকদের ভিড় সামলানো যায়নি। তাই এবার ওই নির্দিষ্ট রুটে ট্রেন চলাচলই বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তাব আনা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, দক্ষিণমুখী ট্রেনগুলি হ্যানয় স্টেশনে যাত্রা শেষ করবে। আর উত্তরমুখী ট্রেনগুলি থামবে গিয়া লাম স্টেশনে। ফলে পর্যটকদের প্রিয় ওই সরু গলি দিয়ে আর ট্রেনের চাকা ঘুরবে না। চিরতরে স্তব্ধ হবে ইঞ্জিনের গর্জন।
ভিয়েতনাম রেলওয়ে দপ্তর বারবার সতর্ক করেছে যে, পর্যটকদের এই খামখেয়ালি আচরণ যে কোনও সময় বড়সড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তবে কেবল নিরাপত্তা নয়, এই এলাকাকে এক বিশাল সাংস্কৃতিক করিডোর হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের মধ্যে এই রেল পরিকাঠামো সংস্কারের কাজ শুরু হবে। ফরাসি দূতাবাসের সহায়তায় ঐতিহাসিক ‘লং বিয়েন ব্রিজ’ সংস্কার এবং ১৩১টি প্রাচীন পাথরের খিলানকে হেরিটেজ জোন হিসেবে সাজিয়ে তোলা হবে। ওল্ড কোয়ার্টারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে থাং লং ইম্পেরিয়াল সিটাডেলের।
ছবি: সংগৃহীত
যাঁদের বাকেট লিস্টে হ্যানয়ের এই ট্রেন স্ট্রিট রয়েছে, তাঁদের হাতে সময় খুব কম। প্রস্তাবটি বর্তমানে সে দেশের নির্মাণ মন্ত্রকের অনুমোদনের অপেক্ষায়। সবুজ সংকেত মিললেই এই রুক্ষ, শিল্পায়ন-ঘেঁষা গলিটি একটি মার্জিত ‘সাংস্কৃতিক ও পর্যটন অঞ্চলে’ পরিণত হবে। রেললাইনের ধারের ক্যাফেগুলি হয়তো হেরিটেজ সাইট হিসেবে টিকে থাকবে, কিন্তু টেবিলের পাশ দিয়ে দানবীয় ট্রেন চলে যাওয়ার সেই রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা আর পাওয়া যাবে না। পর্যটকদের জন্য যা একইসঙ্গে স্বস্তির এবং বিচ্ছেদেরও বইকি!
