শেষ চৈত্রেও শরীর পুড়ে যাওয়ার রোদের তেজ নেই। অযোধ্যা পাহাড় থেকে নেমে আসছে না গরম হাওয়া। পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি, ঝালদা ১ ব্লক পাহাড়তলিতে সন্ধ্যা নামলেই বসন্তের শুরুর আমেজ। মাঝ ফেব্রুয়ারি পর যেমনটা থাকে ঠিক যেন তেমনই। তাই হয়তো ভোটের বাজারও এখনও গরম হয়নি। অন্তত পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা এই বাঘমুন্ডি বিধানসভায়। শনিবার বিকালে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই বাঘমুন্ডির মাটি থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ বঞ্চনার অভিযোগ তুলে হুঙ্কার দেওয়ার পরেও। কেমন যেন থম মেরে আছে অযোধ্যা পাহাড় চূড়ার জিলিংসেরেঙ থেকে আড়শা ব্লকের সিরকাবাদ পাহাড়তলি। ছৌ মুখোশ গ্রাম চড়িদা থেকে অযোধ্যা হিলটপ। পাহাড়ি এই জনপদ যেন অদ্ভুতভাবে নীরব। নির্বাচনের চেনা তাপ-উত্তাপটাই যেন হারিয়ে গিয়েছে গত শীতে অযোধ্যা হিলটপ জুড়ে 'গ্রাউন্ড ফ্রস্ট'-র জেরে!
পাহাড়ের বুক চিরে ছুটছে বন্দে ভারত। বাঘমুন্ডি বিধানসভার ঝালদায়। ছবি: সুমিত বিশ্বাস।
তাই ওই ভূমি তুহিনের মতই 'শীতল' বাঘমুন্ডির ভোট বাজার। আর এই 'শীতল' আবহে কোন ফুলের পাল্লা ভারী ভোটের সপ্তাহ দুয়েক আগেও বলা বেশ মুশকিল। কারণ 'বাঘমুন্ডির বাঘ' পুরুলিয়া জেলা কংগ্রেসের সভাপতি, প্রাক্তন বিধায়ক নেপাল মাহাতো যে এবারও প্রার্থী। সঙ্গে ভোট কাটাকুটির অঙ্কে এই প্রথম ঝাড়খন্ডি দল ঝাড়খন্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারি মোর্চা বাংলার ভোটে অংশ নিয়ে এই আসনে প্রার্থী দিয়েছে। তাহলে কি শাসকের সুবিধা? আবার কি তৃণমূল বাঘমুন্ডি আসন ধরে রাখতে পারবে? কিন্তু ২৪-র লোকসভা ভোটের হিসাব বলছে ১১,২৪০ ভোটে পিছিয়ে তৃণমূল। যেখানে একুশের বিধানসভায় শাসকের মার্জিন ছিল ১৩,৯৬৯।
বাঘমুন্ডির তৃণমূল প্রার্থী সুশান্ত মাহাতোর ভোট প্রচার। ছবি: সুমিত বিশ্বাস।
তাহলে কি আবার 'গেরুয়া গড়' হবে বাঘমুন্ডি? ত্রি-মুখী লড়াইয়ে বড় ফ্যাক্টর ওই 'বাঘমুন্ডির বাঘ'! সেই সঙ্গে এনডিএর ছোট শরিক আজসু (অল ঝাড়খন্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়ন)-কে এই আসন না ছাড়া। ফলে বিজেপির পালে আজসু কতটা হাওয়া দেবে তা বোঝা দুষ্কর ওই শাহী সভার পরেও। আর তারপরে অতীতের সিংহ 'গড়'-এ ফরওয়ার্ড ব্লকের ভোটও কিছুটা হলেও ফ্যাক্টর।
ছৌ মুখোশ গ্রাম বাঘমুন্ডির চড়িদা। ছবি: সুমিত বিশ্বাস।
তথ্য-পরিসংখ্যানের দিকে চোখ রাখলে এই বিধানসভার অধীনে সম্পূর্ণভাবে দুটি ব্লক ও পুরসভা রয়েছে। বাঘমুন্ডি ও ঝালদা ১। সেই সঙ্গে আড়শা ব্লকের মাত্র দুটি গ্রাম পঞ্চায়েত সিরকাবাদ ও হেঁটগুগুই। আছে নানান জটিল সমীকরণে ঝালদা পুরসভা। বাঘমুন্ডি ব্লকে মোট ৮টি গ্রাম পঞ্চায়েত। তার মধ্যে ৬ টিতে তৃণমূল। ২ টি বিজেপির। ঝালদা ১ ব্লকে ১০ টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে ৪ টি তৃণমূল, ১ টি বিজেপি, ৩ টি কংগ্রেস, ১ টি সিপিএম, আরেকটি ফরওয়ার্ড ব্লক প্রধানের সঙ্গে শাসক বিরোধী জোট ক্ষমতায়। একনজরে দেখতে গেলে এই বিধানসভার ২০টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে ১১ টি গ্রাম পঞ্চায়েত তৃণমূলের। ৩টি করে বিজেপি ও কংগ্রেসের। ১২ ওয়ার্ডের পুরসভায় নানান জটিলতার পর কংগ্রেসের সমর্থনে তৃণমূলের পুরবোর্ড। তবে সেখানেও শাসক দ্বন্দ্ব। এ গেল ভোটের অঙ্কে ক্ষমতা দখলের চিত্র।
বাঘমুন্ডি ব্লকে মোট ৮টি গ্রাম পঞ্চায়েত। তার মধ্যে ৬ টিতে তৃণমূল। ২ টি বিজেপির। ঝালদা ১ ব্লকে ১০ টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে ৪ টি তৃণমূল, ১ টি বিজেপি, ৩ টি কংগ্রেস, ১ টি সিপিএম, আরেকটি ফরওয়ার্ড ব্লক প্রধানের সঙ্গে শাসক বিরোধী জোট ক্ষমতায়। একনজরে দেখতে গেলে এই বিধানসভার ২০টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে ১১ টি গ্রাম পঞ্চায়েত তৃণমূলের। ৩টি করে বিজেপি ও কংগ্রেসের। ১২ ওয়ার্ডের পুরসভায় নানান জটিলতার পর কংগ্রেসের সমর্থনে তৃণমূলের পুরবোর্ড।
এবার আসা যাক এসআইআর-এ। রাজ্যের অন্যান্য বিধানসভার মতো সামগ্রিক পুরুলিয়া বা হটস্পট এই বাঘমুন্ডি বিধানসভায় নিবিড়ভাবে ভোটার তালিকা সংশোধনে ভোটারের হেরফেরের সংখ্যা সেভাবে কোন প্রভাব ফেলবে না। বাদ যাওয়ার নিরিখে মৃত ভোটারের সংখ্যা যে সবচেয়ে বেশি। যা সাধারণভাবে স্বাভাবিকভাবেই বাদ যেত। সেই বাদ যাওয়ার সংখ্যা ২৮ শে ফেব্রুয়ারির চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী ২১,৭৩৩। আর একটু বিশদে বললে এই বিধানসভায় বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা ছিল ২,৮৮৩। যার মধ্যে যুক্ত হয়েছে ২৩০২। বাদ পড়েছে ৫৮১। এই বিচারাধীন ভোটারের নিষ্পত্তি শেষে একাধিক সাপ্লিমেন্টারির পর এই বিধানসভায় মোট ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৫১ হাজার ১৮৩। যা আগে ছিল ২ লাখ ৭০ হাজার ৪০৩। ফলে বাদ পড়ার প্রভাব পড়বে না ভোটের অঙ্কে।
তবে কাজ করবে আজও অযোধ্যা পাহাড়ে পানীয় জলের সমস্যা। এবার বসন্ত শেষে প্রখর রৌদ্র বা দাবদাহ না থাকলেও জলকষ্ট কিন্তু শুরু হয়ে গিয়েছে। পাহাড়ি ঝোরার বালি খুঁড়েও হাড়ি ভর্তি হচ্ছে না। পানীয় জল ইস্যুর পাশাপাশি পর্যটন পরিকাঠামো উন্নয়নের পরেও কর্মসংস্থান সমস্যা রয়ে গিয়েছে। যে সকল পরিযায়ী 'বাংলাদেশী' আতঙ্কে আর ভিন রাজ্যে যাচ্ছেন না, তারা যে সকলে-ই রাজ্যের ভাতা পান, তা কিন্তু নয়। অনেকেই নানা কারণে রাজ্যের পরিযায়ী কল্যাণমূলক প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সেই সঙ্গে উপজাতিদের হোস্টেল বন্ধ। যা বাঘমুন্ডি বিধানসভায় অন্যতম বড় ইস্যু। ফলে আদিবাসী ভোট একটা বড় ফ্যাক্টর। কারণ এই বিধানসভায় আদিবাসী সংখ্যা অনেকটাই বেশি। যার তুলনায় একেবারেই কম সংখ্যালঘু ভোটার। তফসিলি জাতি ভোটারের সংখ্যাও কম। বরং রয়েছে কুড়মি জনজাতির ভোট। যা এই বিধানসভায় শাসক যতই খেলা ঘোরাক ঝাড়খন্ডি লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারি মোর্চা ছাড়া ওই ভোট পদ্মে পড়বেই।
তবে পানীয় জল, আদিবাসী হোস্টেল বন্ধ এমন জ্বলন্ত সমস্যা থাকলেও রাজ্য সরকারের উন্নয়নের কাজ হয়েছে ঢালাও। রাজ্যে পালাবদলের পর ঝাঁ চকচকে মসৃণ রাস্তায় একের পর এক পাহাড়ি গ্রাম জুড়ে গিয়েছে। আর সেই রাস্তার হাত ধরে খুলে গিয়েছে পর্যটনের দরজা। তাই তো অযোধ্যা পাহাড়ের এক সময়ের প্রত্যন্ত, দুর্গম তেলিয়াভাসার মতো গ্রামেও রেস্তোরাঁ খুলেছে। পাহাড় জুড়ে ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে হোম স্টে, পর্যটক আবাস। এছাড়া সাম্প্রতিককালে পথশ্রী-রাস্তাশ্রীর সড়ক উন্নয়নের 'ক্রিটিক্যাল গ্যাপে'র সেতুবন্ধন করে দিয়েছে। আর রাজ্যের স্বাস্থ্যসাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার যুবসাথীর মত মেগা প্রকল্পের সুবিধা তো মিলেইছে। মিলেছে বাংলার বাড়ির সুবিধাও। তার মধ্যেও কয়েকটি রাস্তা না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যাকে ঘিরে ঝালদা ১ ব্লকে ভোট বয়কটের ইস্যু থাকলেও নির্বাচনে প্রভাব পড়ার মতো কিছু নেই। তবে সেই অনুন্নয়নের প্রচারে 'শীতল' ভোটের বাজারে গরম করার মত পরিস্থিতি হতেই পারে। যদিও তৃণমূল প্রার্থী তথা এই কেন্দ্রের বিদায়ী বিধায়ক সুশান্ত মাহাতো বলেন, "তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে বাঘমুন্ডি আমূল বদলে গিয়েছে। বাম জমানার বাঘমুন্ডি। আর ২০২৬-র এই পাহাড়ি জনপদ আকাশ-পাতাল তফাত। রাস্তাঘাটে পর্যটন পরিকাঠামোর উন্নয়ন বা পর্যটনকে ভর করে কর্মসংস্থান শুধু নয়। এলাকার চাষাবাদকে উন্নতি করতে ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প। ভাঙাচোরা বাড়ি এখন মাথার উপর পাকা ছাদ। সৌরচালিত পানীয় জল প্রকল্পের সংখ্যা তো নেহাত কম নয়। আগের চেয়ে পানীয় জলের সমস্যা অনেক মিটে গিয়েছে। ঘরে ঘরে শৌচাগার, কমিউনিটি টয়লেট এছাড়া রাজ্যের নানান মেগা প্রকল্পের সুবিধা। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলবো। একেবারে উন্নয়নের নিরিখে ভোট হবে। তাই জয় হবে তৃণমূলের।" কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ কম নয় এই এলাকার তৃণমূল নেতৃত্ব থেকে আমজনতার। সাধারণ মানুষের প্রয়োজনেও যে তিনি ফোন ধরেন না। সেই সঙ্গে তাঁর অহমিকায় অন্তর্ঘাতের আশঙ্কাও রয়েছে।
কংগ্রেস প্রার্থী নেপাল মাহাতো বলছেন, "আমি আগে যখন বিধায়ক ছিলাম তখন যেখানে উন্নয়নের কাজ শেষ হয়েছে। তারপর থেকে আর উন্নয়নের কোন কাজ এগোয়নি এই পাহাড়ি জনপদে। আদিবাসীদের শিক্ষা কার্যত থমকে গিয়েছে। একের পর এক আদিবাসী হোস্টেল বন্ধ। অযোধ্যা পাহাড়ে পানীয় জলের হাহাকার। শুধু ভাতার উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে। সামগ্রিক উন্নয়ন কোথায়? বেকার সমস্যার সমাধান কোথায়? গ্রামে গ্রামে কাজ নেই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকদেরকে ভিনরাজ্যে যেতে হচ্ছে। এবার এইসবের বিরুদ্ধে ভোট হবে। ফলে জয় আমারই।"
বাঘমুন্ডির কংগ্রেস প্রার্থী নেপাল মাহাতোর ভোট প্রচার। ছবি: সুমিত বিশ্বাস।
বাঘমুন্ডির বিজেপি প্রার্থী রহিদাস মাহাতো বলেন, "এই বাঘমুন্ডি বিধানসভা বিজেপির 'গড়'। কোন উন্নয়ন হয়নি। তৃণমূল যে সকল রাস্তাঘাটের কথা বলে উন্নয়ন দেখাচ্ছে। তার বাইরে বহু রাস্তা রয়েছে যা মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। যার জন্য মানুষের জীবন থমকে গিয়েছে। কিন্তু সেই রাস্তা হয়নি। এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে ভোট হবে। আগামী দিনে বিজেপির সুশাসনের পক্ষে ভোট হবে। ফলে এবার বিধানসভায় পদ্ম ফুটবেই।" কিন্তু প্রার্থী নিয়ে যে ক্ষোভের চোরাস্রোত এখনও দানা বাঁধছে এই এলাকার বিজেপি নেতৃত্বে। পুরুলিয়া জেলা পরিষদের বিজেপি সদস্য দলের বাঘমুন্ডি বিধানসভার আহবায়ক রাকেশ মাহাতো এই কেন্দ্রে প্রার্থীর দাবিদার ছিলেন। দলের ক্ষোভ রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক তথা পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো তাদের লবির রহিদাস মাহাতোকে প্রার্থী করেন। ফলে দলের অন্দরে সাংসদকে নিয়ে ক্ষোভ আছে। যে ক্ষোভ মেটেনি শাহর সভার পরেও। সেই সঙ্গে কাঁটা হয়ে রয়েছে ঝাড়খন্ডি দল আজসু। কারণ এই বিধানসভায় আজসু সুপ্রিমো তথা ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী সুদেশ মাহাতো এনডিএ প্রার্থী হবেন এই বিষয়টি হাওয়ায় ভাসছিল গত বছর জুলাই মাস থেকে। কিন্তু তিনি প্রার্থী হওয়া তো দূর বাঘমুন্ডি বিধানসভা আসন একুশের ভোটের মতো তাদের ছাড়া হয়নি। ফলে আজসু স্থানীয় থেকে জেলা নেতৃত্ব এখানে প্রার্থী দেওয়ার কথা বললেও দলের হাইকমান্ড সেই দাবিতে শিলমোহর দেয়নি। তাই একুশের ভোটে বিজেপিতে যেমন অন্তর্ঘাত হয়েছে বলে অভিযোগ। তার পুনরাবৃত্তি যে এবারে হবে না তা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারছে না বিজেপি নেতৃত্ব।
ভোট প্রচারে বাঘমুন্ডির বিজেপি প্রার্থী রহিদাস মাহাতো। ছবি: সুমিত বিশ্বাস।
তাছাড়া কুড়মি ভোটের একাংশ যে ঝাড়খন্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারি মোর্চার সুপ্রিমো তথা ঝাড়খণ্ডের ডুমরির বিধায়ক টাইগার জয়রাম মাহাতো টানবেন তা একেবারে পরিষ্কার। কারন টাইগার নামে 'পাগলপারা' বাঘমুন্ডি, ঝালদা। তবে এই ঝাড়খন্ডি দলে ভাঙন হয়ে এখন তৃণমূলের শক্তি বাড়িয়েছে। অন্যদিকে এই এলাকার একটা বড় অংশের ভোটার যারা মূলত তরুণ। তারা বিজেপির দিকে ঝুঁকে ছিলেন। কিন্তু প্রার্থী পছন্দ না হওয়ায় তারা 'হাতে'র হাত শক্ত করতে ভোটের ময়দানে নেমে গিয়েছেন। ফলে দুই ফুলের মাঝে বসন্তের শুরুর হাওয়ার মতো নেপাল হাওয়াও বইছে এই পাহাড় থেকে পাহাড়তলিতে।
