বীর চিলারায়ের ইতিহাস বুকে নিয়ে বয়ে চলেছে তোর্সা। সুবে-বাংলার আফগান শাসকদের সঙ্গে তাঁর লড়াইয়ের গল্প ঘুরে মুখে মুখে। অতীতের সেই অধ্যায়কে হাতিয়ার করেই আজ উঠছে 'গ্রেটার কোচবিহারে'র দাবি। রাজবংশীদের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবি করছেন অনন্ত মহারাজ। পাশাপাশি, জীবন সিংহের সশস্ত্র সংগঠন লড়াই চালাচ্ছে 'কামতাপুরে'র জন্য। এই প্রেক্ষাপটেই গণতন্ত্রের বৃহত্তম উৎসবে শামিল হচ্ছে কোচবিহার জেলা। একদিকে মমতার 'উন্নয়নের পাঁচালি' অন্যদিকে মোদির মুখে 'সোনার বাংলা'! স্লোগানযুদ্ধে বাজিমাত করবে কে? কার উপর আস্থা রাখবে উত্তরের জনতা? কোন সমীকরণে তথাকথিত পদ্ম-গড়ে ফুটতে পারে জোড়াফুল? কোন অঙ্কেই বা লোকসভার নিরিখে হারানো জমি ফিরে পেতে পারে বিজেপি?
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বিগত দিনে উদয়ন বনাম নিশীথ সংঘাত চর্চায় থাকলেও একসময় কোচবিহার ছিল 'বামদূর্গ'। প্রায় চার দশক ধরে কোচবিহারের সাংসদ ছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা অমর রায়প্রধান। আরএসপি নেতা কমল গুহের দাপটও কম ছিল না। দিনহাটা, সিতাই থেকে শুরু করে মেখলিগঞ্জ, কোচবিহার উত্তর বা কোচবিহার পশ্চিম, বেশিরভাগ বিধানসভা কেন্দ্রেই বাম শরিকরাই ছিলেন অধিপতি। তবে সেই বাম-রাজত্ব আর নেই। পালাবদলের পর একটু একটু করে কমেছে বামেদের শক্তি। এখন প্রবল রক্তাল্পতায় প্রায় পঙ্গু দলটি।
তথ্য বলছে, ২০০৬ সালের নির্বাচনেও কোচবিহারের প্রায় সবকটি আসনে জয়লাভ করেছিল বামপন্থীরা। কিন্তু ২০১১ সালে পরেশ অধিকারী এবং উদয়ন গুহর মতো হাতেগোনা নেতারা বাদে বাকি বাম প্রার্থীরা সবাই পরাজিত হন। বামেদের জমি অনেকটাই আলগা হয়। আজ সেই পরেশ অধিকারী তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক তথা প্রার্থী, আর এক দাপুটে ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা কমল গুহর ছেলে উদয়ন গুহ তৃণমূলের বিদায়ী মন্ত্রী।
উল্লেখ্য, বর্তমানে এই জেলায় বিজেপির দাপটও চোখে পড়ার মতো। জেলার ৯ বিধানসভা কেন্দ্রের ৭ আসনেই ২০২১-এ জয়ী হয়েছিল বিজেপি। কিন্তু চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে হারানো জমি অনেকটাই পুনরুদ্ধার করেছে জোড়াফুল শিবির । ২টি আসন থেকে নিজেদের শক্তি বারিয়ে ৫টি আসনে লিড নিয়েছিল শাসকদল। নবান্ন দখলের লড়াইতে কোচবিহারে কে বাকিমাত করতে পারে, সেই দিকেই নজর থাকবে সকলের ।
একনজরে বিধানসভা আসনগুলি-
মেখলিগঞ্জ, মাথাভাঙ্গা, কোচবিহার উত্তর, কোচবিহার দক্ষিণ, শীতলকুচি, সিতাই, দিনহাটা, নাটাবাড়ি এবং তুফানগঞ্জ।
গত নির্বাচনের পরিসংখ্যান -
গত ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে কোচবিহারের ৯টি আসনের মধ্যে ৭টি বিজেপি পেয়েছিল, দুটি তৃণমূল পেয়েছিল। মেখলিগঞ্জে এবং সিতাইতে জয় পায় তৃণমূল। এই জেলা থেকে তৃণমূলের বিধায়ক হন পরেশ অধিকারী ও জগদীশ চন্দ্র বর্মা বসুনিয়া। বাকি আসনগুলিতে জয় পায় বিজেপি। দিনহাটা থেকে বিজেপির টিকিটে জয়ী হলেও সাংসদ পদ রেখে বিধায়ক পদ ছেড়ে দেন নিশীথ প্রামাণিক। পরে সেই আসনে উপনির্বাচন হয়। আর প্রায় দেড় লক্ষেরও বেশি ভোটে উদয়ন গুহ জয় পান। বর্তমানে তৃণমূলের হাতে রয়েছে এই জেলার তিনটি আসন এবং বিজেপির হাতে ৬টি।
নজরকাড়া প্রার্থী -
নজরকাড়া প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন দিনহাটায় উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহ, মেখলিগঞ্জে প্রাক্তন মন্ত্রী পরেশ চন্দ্র অধিকারী, মাথাভাঙায় বিজেপি নেতা তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিশীথে প্রামাণিক। পরেশ অধিকারী একসময় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। পরে তাঁর মেয়ের নাম নিয়োগ দুর্নীতিতে জড়ায়। এরপর মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েন তিনি। অনেকেই এবার মনে করেছিলেন পরেশ অধিকারীকে এবার হয়তো প্রার্থী করা নাও হতে পারে। কিন্তু সাংগঠনের ক্ষেত্রে পরেশ অনেক বেশি শক্তিশালী। বিশেষ করে মেখলিগঞ্জ শহর এবং মেখলিগঞ্জ ব্লক, হলদিবাড়িতে ভালো শক্তি রয়েছে। আর সেই কারণে ২৬ এর নির্বাচনেও পরেশকে এবারও প্রার্থী করে দল বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছে বলেই মত রাজনৈতিকমহলের।
এদিকে, এবার নাটাবাড়ি বিধানসভা আসন থেকে বিজেপি টিকিট দেয়নি বিদায়ী বিধায়ক মিহির গোস্বামীকে। প্রার্থী করা হয়েছে গিরিজা শঙ্কর রায়কে, যিনি গ্রেটার নেতা বংশীবদন ঘনিষ্ঠ নেতা বলেই খবর। ফলে এই আসনের দিকেও এবার নজর থাকবে। যদিও গিরিজা শঙ্কর রায়কে প্রার্থী করা নিয়ে ইতিমধ্যে বিজেপি কর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ।
কোচবিহারের ইস্যু কোনগুলি
এসআইআর: কোচবিহারের রাজনীতিতে এবার সবচেয়ে বড় ইস্যু এসআইআর। সীমান্ত সংলগ্ন জেলা। এখানে হাজার হাজার সংখ্যালঘু নাম 'ডিলিট' হয়ে যাচ্ছে বলে সূত্রের খবর। এই নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে সংখ্যালঘুদের মধ্যে। কিছু ক্ষেত্রে রাজবংশীদেরও নাম বাদ পড়েছে বলে জানা যাচ্ছে, যা নিয়ে রাজবংশী ভোটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক এবং ক্ষোভ। রাজনৈতিক মহলের আশঙ্কা, এবার কোচবিহারের ভোটে এসআইআর বড় ফ্যাক্টর হতে পারে।
অনুপ্রবেশ: বাংলার ভোটে এবারের বড় ইস্যু অনুপ্রবেশ। এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলে অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে বলে দাবি করেছে বিজেপি। অনুপ্রবেশের জন্য শাসক দল তৃণমূলকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে গেরুয়া শিবির। আর কোচবিহার যেহেতু বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা জেলা, তাই এবারের নির্বাচনে এই জেলায় 'অনুপ্রবেশ' হতে পারে একটা বড় ইস্যু।
রাজবংশী ভোট: কোচবিহারের রাজনীতিতে রাজবংশী সম্প্রদায়ের ভোট জয়-পরাজয়ের অন্যতম নির্ণায়ক। গ্রেটার কোচবিহার মুভমেন্ট এবং রাজবংশী আবেগকে কাজে লাগাতে সব পক্ষই তৎপর থাকে। রাজবংশী নেতা, যিনি গ্রেটার কোচবিহারের পক্ষে বারবার সওয়াল করেন, সেই অনন্ত মহারাজের সঙ্গে কখনও বৈঠক করেন অমিত শাহ, কখনও বৈঠক করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে রাজ্যসভার সাংসদ করেছিল বিজেপি। সম্প্রতি তাঁকে বঙ্গবিভূষণ সম্মান দিয়েছে তৃণমূল। আর এরপর থেকেই অনন্ত মহারাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে শাসকদল তৃণমূলের। অনন্ত ঘনিষ্ঠ হরিহর দাসকে শীতলকুচি থেকে তৃণমূল প্রার্থীও করেছে। এই অবস্থায় গ্রেটার সংগঠনের বড় অংশ অনন্ত মহারাজের সঙ্গে রয়েছে এবং তারা তৃণমূলকে সমর্থন করবে বলেই আশাবাদী ঘাসফুল শিবির। যদি অনন্তর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হতেই তৃণমূল শিবির থেকে নিজেদের শিবিরে গ্রেটার নেতা বংশীবদন বর্মনকে টানতে সফল হয়েছে বিজেপি। এই অবস্থায় কোচবিহারের মানুষ কোনদিকে থাকবে সেদিকে অবশ্যই নজর থাকবে।
তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দল: কোচবিহারে শাসকদলের অন্যতম মাথাব্যথার কারণ গোষ্ঠীকোন্দল। কোচবিহার জেলায় দুটি গোষ্ঠী বিভাজন রয়েছে তৃণমূলে। একদিকে রবীন্দ্রনাথ ঘোষ এবং পার্থপ্রতিম রায়ের গোষ্ঠী, অপরদিকে রয়েছেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী উদয়ন গুহ, সাংসদ জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া এবং তৃণমূলের জেলা সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিকের গোষ্ঠী। এর প্রভাব গত বিধানসভা নির্বাচনে পড়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে! এমনকী ২৬-এর নির্বাচনেও তৃণমূলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ গোষ্ঠীকোন্দলই।
এবার দলের প্রবীণ নেতৃত্বদের কাউকেই টিকিট দেয়নি তৃণমূল। রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, বিনয়কৃষ্ণ বর্মনের মতো নেতৃত্বরা বিক্ষুব্ধ রয়েছেন। সেটা তৃণমূলের জন্য মাথাব্যথার কারণ। প্রচারের দিক থেকে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে তৃণমূল। সার্বিকভাবে সাংগঠনিক দিক থেকেও কোচবিহার জেলায় গেরুয়া শিবির থেকে অনেকটাই এগিয়ে শাসকদল। আর এই প্রেক্ষাপটে বিজেপি কি ডিভিডেন্ট পাবে? সেদিকেই নজর সবার।
