বর্ষা আসতে আরও মাস দুয়েক। ওই সময়ে রায়গঞ্জের কুলিক পাখিরালয়ে রেকর্ড সংখ্যক পরিযায়ী পাখি আসে। তা সে ধূসর রঙা শামুকখোল হোক, নিশি বক হোক, পানকৌড়ি হোক বা ছোট করচে বক। পাখির আনাগোনা অবশ্য শুধু কুলিক পাখিরালয়ে নয়, শহর রায়গঞ্জে এবং রায়গঞ্জের গ্রামীণ এলাকাতেও শুরু হয়েছে। তাঁরা মূলত 'ভোটপাখি'। হবে না-ই বা কেন, ভোট আসতে আর মোটে হপ্তা তিনেক। উত্তরবঙ্গের অন্যতম ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর ভোটের বাজারে সরগরম হয়ে উঠবে, সেটাই তো প্রত্যাশিত।
এই প্রতিবেদন লেখা হওয়া পর্যন্ত রায়গঞ্জের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ভোটারের সংখ্যা ১,৬৭,১৬১। এসআইআরে বাদ গিয়েছে ৩,৮৯৫ ভোটারের নাম। বিচারাধীন আরও ১৮ হাজারের বেশি। উত্তর দিনাজপুর জেলার ৩টি হিন্দুপ্রধান বিধানসভার অন্যতম রায়গঞ্জ। এই বিধানসভা কেন্দ্রের কমবেশি ২০ শতাংশ ভোটার সংখ্যালঘু। তফসিলি জাতি ৩৪ শতাংশ। উপজাতি ৪ শতাংশ।
রায়গঞ্জের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ভোটারের সংখ্যা ১,৬৭,১৬১। এসআইআরে বাদ গিয়েছে ৩,৮৯৫ ভোটারের নাম। বিচারাধীন আরও ১৮ হাজারের বেশি। উত্তর দিনাজপুর জেলার ৩টি হিন্দুপ্রধান বিধানসভার অন্যতম রায়গঞ্জ।
জনসংযোগে তৃণমূল প্রার্থী কৃষ্ণ কল্যাণী। ছবি: সোশাল মিডিয়া।
রায়গঞ্জ বিধানসভা একটা সময় কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত ছিল। বামফ্রন্টেরও ভালো জনসমর্থন ছিল এই কেন্দ্রে। চমকপ্রদ হলেও ঐতিহাসিকভাবে রায়গঞ্জে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিরও একটা চর্চা দীর্ঘদিন ধরেই হয়ে আসছে। তবে রাজ্যে পালাবদলের পরও রায়গঞ্জের রাশ পেতে শাসকদলকে অপেক্ষা করতে হয় ২০২১ সাল পর্যন্ত। সে বার বিজেপির টিকিটে জিতে আসা বিধায়ক কৃষ্ণ কল্যাণী শাসকদলে যোগ দেন। পরে ২০২৪ সালের বিধানসভা উপনির্বাচনে জোড়াফুল প্রতীকে ফের জয়ী হন তিনি। আসলে রাজ্যে তৃণমূল এবং কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর অন্যান্য প্রান্তের মতো রায়গঞ্জেও ভোটের হাওয়া বদলাতে শুরু করে। একটা সময় যে বাম ও কংগ্রেস চূড়ান্ত প্রভাবশালী ছিল, তারা এখন ক্ষয়িষ্ণু। সেই শূন্যস্থানের দখল নিয়েছে তৃণমূল ও বিজেপি।
বিজেপি প্রার্থী কৌশিক চৌধুরী। ছবি সোশাল মিডিয়া।
২০১৬ সালের বিধানসভায় রায়গঞ্জে শেষবার জয়ী হন কংগ্রেসের মোহিত সেনগুপ্ত। সেবার মোহিতবাবুর অর্ধেকেরও কম ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন তৃণমূলের পূর্ণেন্দু দে। ২০২১ সালের ফলাফল অনেকটা বদলে যায়। কুলিকের তীরে প্রথমবার পদ্ম ফোটে। প্রায় ২০ হাজার ভোটে জিতে বিধায়ক হন কৃষ্ণ কল্যাণী। আসলে একুশে গোটা উত্তরবঙ্গ জুড়েই বিজেপির হাওয়া কাজ করেছে, সেটার সুফল পান কৃষ্ণও। এরপর ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনেও রায়গঞ্জ শহরে বিপুল ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি। যদিও সে বছর বিধানসভার উপনির্বাচনে ফের জয়ী হন বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়া কৃষ্ণ কল্যাণী। এবার বিধায়ক কৃষ্ণ কল্যাণীকে ফের প্রার্থী করেছে শাসকদল। বিজেপি প্রার্থী করেছে তরুণ সাংগঠনিক নেতা কৌশিক চৌধুরীকে। প্রায় ২০ বছর বাদে ওই কেন্দ্রে এবার প্রার্থী পড়েছে কাস্তে হাতুড়ি তারা চিহ্নের। সিপিএম প্রার্থী করেছে জীবনানন্দ সিংহকে। তিনিও বাম সংগঠনের সঙ্গে বেশ কিছুদিন ধরে যুক্ত। কংগ্রেস পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ মোহিত সেনগুপ্তকে ফের টিকিট দিয়েছে। এ ছাড়াও আরও একাধিক দলের প্রার্থী রয়েছেন। তবে উল্লেখযোগ্য প্রার্থী এই চারজনই।
কংগ্রেসের মোহিত সেনগুপ্ত। ছবি সোশাল মিডিয়া।
সাংগঠনিক দিক থেকে রায়গঞ্জ শহরে প্রায় সমানে সমানে পাল্লা দিচ্ছে বিজেপি এবং তৃণমূল। যদিও পঞ্চায়েত ও পুরসভা স্তরে তৃণমূল নিরঙ্কুশ। রায়গঞ্জ পুরসভায় শেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৭ সালে। সেবার বিরোধীশূন্য ভাবে বোর্ড দখল করে শাসকদল। ২০২৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনেও কার্যত একচ্ছত্র সাফল্য পায় ঘাসফুল শিবির। তবে বিজেপির অ্যাডভান্টেজ হল তাঁদের দলীয় সংগঠন ছাড়াও রায়গঞ্জ শহর ও সংলগ্ন এলাকায় আরএসএসের বিভিন্ন সংগঠন এবং হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠন সমাজসেবার আড়ালে ডালপালা বিস্তার করেছে। খুব সুক্ষ্মভাবে ভোটারদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করারও চেষ্টা করছে এই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। যার সুফল ভোটবাক্সে পড়তে পারে।
সিপিএমের জীবনানন্দ সিংহ। ছবি সোশাল মিডিয়া।
রায়গঞ্জের নির্বাচনে স্থানীয় ইস্যু বলতে গেলে সবচেয়ে বেশি করে বলতে হয় পুরসভা স্তরের দুর্নীতির অভিযোগের কথা। প্রায় ৯ বছর পুরভোট হয়নি। প্রশাসক বসিয়ে কাজ চলছে। ফলে পরিষেবা অনেক ক্ষেত্রে থমকে গিয়েছে। রায়গঞ্জ পুরসভার ২৭টি ওয়ার্ডেই রাস্তাঘাটের পরিস্থিতি খারাপ। জল নিকাশি পরিকাঠামোও পুরো ভেঙে পড়েছে। খারাপ রাস্তার জন্য কিছুদিন আগে রায়গঞ্জ শহরে এক কলেজ পড়ুয়ার বাইক থেকে পড়ে মৃত্যু জনমানসে ক্ষোভ তৈরি করেছিল। সেই ক্ষোভের আঁচ এখনও রয়ে গিয়েছে। তাছাড়া এসআইআর রাজ্যের আর পাঁচটা কেন্দ্রের মতো এখানেও বড় ইস্যু। সংখ্যালঘু ভোটারদের একটা বড় অংশের ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। ফলে সেটা সার্বিক ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া গোটা রাজ্যের মতো তৃণমূলের উন্নয়ন বনাম দুর্নীতির অভিযোগও বড় ইস্যু। চার বছর ধরে পুরভোট না হওয়াটা শাসক শিবিরকে কিছুটা পিছিয়ে দিচ্ছে। তাছাড়া এর আগে ২০২৪ উপনির্বাচনে ভোটের সময় চোরাগোপ্তা রিগিংয়ের অভিযোগও উঠেছিল।
এসআইআর রাজ্যের আর পাঁচটা কেন্দ্রের মতো এখানেও বড় ইস্যু। সংখ্যালঘু ভোটারদের একটা বড় অংশের ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। ফলে সেটা সার্বিক ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া গোটা রাজ্যের মতো তৃণমূলের উন্নয়ন বনাম দুর্নীতির অভিযোগও বড় ইস্যু। চার বছর ধরে পুরভোট না হওয়াটা শাসক শিবিরকে কিছুটা পিছিয়ে দিচ্ছে।
ভোট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারে রায়গঞ্জের মূল লড়াই তৃণমূলের কৃষ্ণ কল্যাণী এবং বিজেপির কৌশিক চৌধুরীর মধ্যে। কংগ্রেসের হেভিয়েট মোহিত সেনগুপ্ত এবং সিপিএমের তরুণ জীবনানন্দ রয়েছেন বটে, তবে তাঁদের লড়াই মূলত তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানের জন্য। প্রার্থীদের মধ্যে জনসংযোগ এবং প্রতিপত্তির বিচারে গেলে কৃষ্ণ কল্যাণীর ধারেকাছে নেই বিরোধী শিবিরের অন্য প্রার্থীরা। শাসকদলের দাবি, এলাকার বিধায়ক সবসময় মানুষের পাশে থাকেন। উন্নয়নের কাজ করেন। সমাজসেবা করেন। তাঁর নিজের জনসংযোগও বিরাট বড় ইস্যু। সে তুলনায় বিজেপি প্রার্থীর পরিচিতি কম। তবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয়তা তাঁরও কম নয়। তাছাড়া দলের সাংগঠনিক শক্তি তাঁর পক্ষে কাজ করতে পারে। বিজেপির দাবি, সার্বিকভাবে গোটা উত্তরবঙ্গেই এবার ভালো ফলের পথে গেরুয়া শিবির। সেই উত্তুরে হাওয়ার ঢেউ রায়গঞ্জেও আছড়ে পড়বে। আর তৃণমূল ভরসা রাখছে মমতার উন্নয়ন আর কৃষ্ণ কল্যাণীর জনসংযোগে।
