২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় তিন দিন পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেছিলেন যে, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করতে চান। কিন্তু তাঁর দল তাঁকে করতে দেয়নি। সেই প্রসঙ্গেই তৎকালীন বিজেপি সাংসদ (বর্তমানে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ) বাবুল সুপ্রিয়র একটা টুইট খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। বাবুল লিখেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই পদত্যাগ করতে চেয়ে নিজের কাছেই ইচ্ছেপ্রকাশ করেছিলেন, এবং তিনি নিজেই নিজেকে পদত্যাগ করতে দেননি। চারিদিকে এই মন্তব্য ভাইরাল হয়। কিন্তু, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেছিলেন এটাই সত্যি। তৃণমূল দল এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক। মমতা দলের সভানেত্রী হলেও, তিনিই দল। তাঁর মুখ দেখেই কর্মীরা দল করেন, বাংলার মানুষ ভোট দেন। যুব রাজনীতি থেকে বাংলার রাজনীতির মুখ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। গ্রামবাংলার মানুষ তৃণমূলকে নয়, ‘দিদি’কে ভোট দেয়।
কিন্তু, ২০১৯-এ তৃণমূল যখন ২২টা আসন পেল, এবং বিজেপি প্রায় ১৮টা সিট নিয়ে বাংলায় নিজের ঘাঁটি গাড়ল, সেটিই তৃণমূলনেত্রীর কনফিডেন্সে প্রথম ধাক্কা দিল। মমতাকে বোঝানো হলো, তাঁর রাজনীতির ঢং ‘ওল্ড স্কুল’, বাংলার মানুষের মন বুঝতে তিনি ব্যর্থ। তাই সেই মনের কথা জানতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় দায়িত্ব নিল আইপ্যাক। প্রশান্ত কিশোরের নেতৃত্বে বিপুল অর্থের বিনিময় স্ট্র্যাটেজি দিতে শুরু করল আইপ্যাক। সেই অনুযায়ী চলতে শুরু করল দল। প্রথমেই ‘বাংলার গর্ব মমতা’ বলে এক ‘ক্যাম্পেন’ তৈরি করে প্রচার চালায় তৃণমূল। অনেকের মতেই, এই প্রচার ছিল মমতার ইমেজের বিরোধী। মমতা যেখানে নিজেকে মানুষের নেত্রী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, সেখানে এই প্রচার কোথাও গিয়ে আত্মতুষ্টি ও দম্ভের ছবি তুলে ধরে। এই প্রচার যখন চলছে তখনও, জেলায় জেলায় প্রভাব বিস্তার করেনি আইপ্যাক। খুব বেশিদিন এই প্রচার চালায়নি। বিপুল অর্থ খরচ হলেও, নতুন ‘ক্যাম্পেন’ আনে তৃণমূল। প্রশান্ত কিশোরের মস্তিষ্কপ্রসূত ‘দিদিকে বলো’ নামক যে প্রচার করেছিল তৎকালীন শাসক দল, তাতে লাভবান হয়েছিল দল। সর্বস্তরের মানুষ হেল্পলাইনে দেওয়া নম্বরে ফোন করে তাঁদের অভাব অভিযোগ জানান্তে পারবেন নেত্রীকে। সেই অনুপাতে ব্যাবস্থা নেবে দল। কতটা নিয়েছিল, জানা নেই। কিন্তু সাড়া ফেলেছিল বিপুল।
২০১৯-এ তৃণমূল যখন ২২টা আসন পেল, এবং বিজেপি প্রায় ১৮টা সিট নিয়ে বাংলায় নিজের ঘাঁটি গাড়ল, সেটিই তৃণমূলনেত্রীর কনফিডেন্সে প্রথম ধাক্কা দিল। মমতাকে বোঝানো হলো, তাঁর রাজনীতির ঢং ‘ওল্ড স্কুল’, বাংলার মানুষের মন বুঝতে তিনি ব্যর্থ। তাই সেই মনের কথা জানতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় দায়িত্ব নিল আইপ্যাক।
কিন্তু এরপরেও থেমে থাকেনি আইপ্যাক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর সঞ্জীবনী দিয়েছিল এই পেশাদারি সংস্থা। প্রশান্ত কিশোরের স্ট্র্যাটেজিতে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ও ‘দুয়ারে সরকার’ তৃণমূলকে ২০২৬-এও ডিভিডেন্ড দিয়ে গেছে। প্রতিবার টাকা বাড়িয়ে মমতা মহিলা ‘ভোটব্যাঙ্ক’কে নিরাপদ রেখেছিলেন। প্রতি নির্বাচনে সংখ্যালঘুর পাশাপাশি এই মহিলা ভোট ‘দিদি’র জয়ের পথ সুগম করে দিয়েছিল। একুশে বিপুল আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসেন মমতা। প্রশান্ত কিশোর ভোটকুশলীর পেশা থেকে অব্যাহতি নেন। আগমন ঘটে প্রতীক জৈনের। তিনি আইপ্যাকের অন্যতম কর্ণধার। ‘পিকে’ মালিক ছিলেন না। ছিলেন আইপ্যাকের মগজ। প্রশান্তের বিদায়ের পর মমতার পাশাপাশি অভিষেককে ‘সেনাপতি’ করার দায়িত্বও নেয় আইপ্যাক। একাধিক ফ্যানক্লাবের জন্ম দেওয়া হয়। আইপ্যাকেরও প্রভাব বাড়ে। রাজ্যে এবং দলে। বিপুল জয়ের জন্য অনেকেই কৃতিত্ব দিতে শুরু করে এই পেশাদারি সংস্থাকে। কিন্তু পেশাদারিত্ব জেতালেও, জয় এনে দিয়েছিল মমতার মুখ। ‘বাংলা নিজের মেয়েকে চায়’, এই স্লোগানেই মুখরিত হয় একুশের কোভিড পরবর্তী নির্বাচন। দলনেত্রীর ভরসার জায়গায় চলে আসে আইপ্যাক। মমতাও বিশ্বাস করতে শুরু করে, ডেটা দিয়েও দল চলতে পারে। তাতেই, গোটা কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ক্যামাক স্ট্রিটের হাতে।
প্রতীক জৈন। ফাইল ছবি।
অভিষেক দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমেই ‘অবজার্ভার’ পদ তুলে দেওয়া হয় জেলায় জেলায়। কিন্তু, সেই পদ তুলে দিলেও, আইপ্যাকের ‘ছেলেরা’ ছড়ি ঘোরাতে শুরু করে দেয়। নিজেদের ইচ্ছেমতো লোকজনের নাম প্রস্তাব করে বলেও অনেকে অভিযোগ করেন। বিনিময় টাকা নেওয়ারও অভিযোগ ওঠে। ক্যামাক স্ট্রিটের নিয়ন্ত্রণ যেহেতু, ‘যুব’দের প্রাধান্য বাড়তে শুরু করে জেলায়। আদি-নব্যের যে দ্বন্দ্ব, তারও অন্যতম কারণ এই আইপ্যাক। আপ্তসহায়ক ও পেশাদারি সংস্থার ‘মার্ক্সে’র উপর নির্ভর করত দলে কে কতটা গুরুত্ব পাবে। ক্যাম্যাক স্ট্রিটের নতুন সচিবালয়ে ডাক পড়লেও, অনেক সময় কারওর সঙ্গে কথা না বলেই চলে আসতে হতো নেতাদের। আইপ্যাকের কর্মীরা যেভাবে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে প্যারালাল দল চালাচ্ছিল প্রতিটা বিধানসভা কেন্দ্রে, অনেকেই মনে করতে শুরু করেছিল এরাই তাহলে দল চালাক।
একুশের জয়ের পর, যখন প্রশান্ত কিশোর চলে গেলেন, তৃণমূলের ক্যাম্পেনেও বদল আসে। মমতা নির্ভর প্রচার থেকে সরে গিয়ে হঠাৎ দল এবং বাংলা নির্ভর প্রচার শুরু করে বর্তমান বিরোধী দল। ২০২৪-এও মমতাকে মুখ না করে, ‘জনগনের গর্জন, বাংলাবিরোধীদের বিসর্জন’ নামক একটা ক্যাম্পেন আনে। সেটার উদ্বোধনে আধুনিকতম ব্রিগেড দেখেছিল বাংলার মানুষ। কিন্তু সেই স্লোগান অনেকটাই শক্ত হয়ে গিয়েছিল বলেই মনে করেছেন অনেকেই। প্রাণোচ্ছল নয় বরং খানিক তাত্বিক বলেই মনে হয়েছিল। এমন ধারণা মমতারও। তাই তিনি নিজেই পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন সেই স্লোগান। একাধিক জনসভায় তৃণমূলনেত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘বাংলার গর্জন, বিজেপির বিসর্জন’। আসলে, মমতা মানুষের পালস বোঝেন। আইপ্যাক বোঝে না। বোঝার কথাও না। কিন্তু ক্যামাক স্ট্রিটের নিদান, ‘দাদার সেনারা’ বাই দ্য বুক চলবে। তাই সেই স্লোগানেই ভোট করেছিল তৃণমূল। কিন্তু সেই স্লোগান ছাড়াও, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুফল সেবারেও পেয়েছিলেন মমতা। ২৯টা সিট পেয়েছিল তৃণমূল। কিন্তু তাতে আইপ্যাকের খুব একটা ক্রেডিট ছিল না বলেই মনে করেছিল অনেকে। আইপ্যাক সমগ্র দলের পাশাপাশি, হীরক বন্দরে ‘ডায়মন্ড মডেল’ করতে ব্যাস্ত ছিল বলেই মনে করেন দলের একাংশ। সেই ‘মডেলেই’ রেকর্ড ভোট নিয়ে সাংসদ হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
আই প্যাকের দপ্তরে মমতা-অভিষেক। ফাইল ছবি।
আইপ্যাক আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। লোকসভা নির্বাচনে জয়ের পরেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে এই ভোটকুশলী সংস্থা। নতুন নতুন মুখের আমদানি ঘটে। জেলায় যাতায়াত বাড়ায়। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যার কথা সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করেছে, যারা নতুন এসেছে তাদের মধ্যে সকলেই প্রায় অবাঙালি। ভাষাগত সমস্যায় অর্ধেক জিনিস তাঁরা নাকি বুঝতেই পারেনি। সম্প্রতি, আইপ্যাক এক জনপ্রিয় মুখপাত্রের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিল। ভোটের আগে। বিষয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গোটা সাক্ষাৎকার শেষ হওয়ার পর, সেই মুখপাত্র আইপ্যাকের ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করেন, “আমার কথাগুলো ঠিক ছিল তো?” উত্তরে সেই যুবক এক মুহুর্ত না ভেবে বলেন, “হামকো বাঙ্গালি সামাঝ মে নেহি আতা”। মুখপাত্র অবাক। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারলেন না, কারণ, ছেলেটি আইপ্যাকের।
প্রার্থীতালিকায় যে বিপুল সংস্কার এনেছিল দল, রাজনৈতিক অভিজ্ঞদের মতে, সেটিই ছিল তৃণমূলের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। নতুন মুখ, তারকাখোচিত নয়, ক্যামাক স্ট্রিট ও আপ্তসহায়কের রেকোমেন্ডশনেই প্রার্থী পদ দিয়েছিল তৃণমূল। প্রতীক জৈন ছিলেন সেই উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম সদস্য। যারা অভিষেকে কালীঘাট অফিসের বৈঠকে গিয়েছিলেন, বেরিয়ে অনেকেই বলেছিলেন, প্রতীক জৈনই তলে নম্বর ৩। তার কথাতেই প্রার্থীতালিকা তৈরি হয়। মমতার অভিষেকের প্রতি সীমাহীন স্নেহ ও আইপ্যাকের প্রতি অগাদ বিশ্বাসই কাল হলো বলে মনে করছেন অনেকেই। বিধানসভা নির্বাচনের জন্য যে প্রচার করেছিল তৃণমূল, তাতে বাংলাকে গুরুত্ব দিলেও সেইটিই ছিল সবচেয়ে ছোট। প্রথমে মমতার সাথে অভিষেকের ছবি থাকলেও, পরে শুধু সভানেত্রীর ছবিই দেখা যায় হোর্ডিংজুড়ে।
বিজেপি যেখানে সমস্ত সমস্যার কথা তুলে ধরে প্রচার করেছিল, কি কি পাবে মানুষ, সেই দিকে নজর দিয়েছিল, তুলনায় মমতার প্রচারের টার্গেট বোঝা যায়নি। এই ক্যাম্পেনে আন্তরিকতা ছিল না। বিপুল পরিমানে করলেও, মানুষের হ্রদয়ে জায়গা করে নিতে পারেনি এই প্রচার। তুলনায় সপ্তম পে কমিশন, দুর্নীতি, অনুপ্রবেশ ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে পদ্মশিবির যেভাবে প্রচার চালিয়েছে, সেটা অনেক বেশি চোখ টেনেছে মানুষের। ‘দিদির দশ প্রকল্পে’ নতুন কিছু ছিল না। ভোটের আগেই মানুষ সেই সব সুবিধা পেতে শুরু করে দিয়েছিলেন।
ভোটের মাঝে এসে, আই প্যাক তৈরি করল দরজার ওপর লাগানো এক স্টিকার। নববর্ষ উপলক্ষে। অনেকটা আমপাতা ও কদমফুলের স্টাইলে। সকল প্রার্থীদের কাছে পেটিতে পৌছে গেলো সেই স্টিকার। বলা হলো, বাড়ি বাড়ি গিয়ে দরজার ওপরে লাগিয়ে দিতে হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ তার বাড়ির উপর কেন এই স্টিকার লাগাতে দেবে, সেটা তারা ভাবল না। পেটির পর পেটি ‘মাল’ প্রার্থীদের নির্বাচনী কার্যালয়ে পড়ে রইল। পরের ধাপে এলো লুডো। কার্ডবোর্ডের তৈরি লুডো, যাতে তৃণমূলের উন্নয়ন হলো সিড়ি আর বিজেপির অত্যাচার হলো সাপ। প্রতিটা কর্মীকে বলা হলো, বাড়ি বাড়ি গিয়ে লুডো খেলতে হবে। এটাই নির্দেশ। প্রতি পরিবার পিছু ১০ মিনিট সময় দিয়ে, পরিবারের লোকজনের সাথে লুডো খেললে, কর্মীরা সংগঠন করবে কখন ।
আসলে খাতায়কলমে সব হয় না। সব ভাবনায় বাস্তবের সাথে মিল থাকে না। আইপ্যাক সেটাই বুঝতে পারেনি। তৃণমূলের অলিন্দে এখন কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, আইপ্যাকের ইডি হানার পরেই, তারা কম্প্রোমাইজড হয়ে গেছেন। কীভাবে হয়েছে, তাতে নানা মুনির নানা মত। তীরের কাছে এসে যেভাবে তরী ডোবালো আইপ্যাক, তাতেই এই চর্চা আরো জোরালো হচ্ছে। প্রথম দফা ভোটের আগে, মধ্যরাতে যেমনভাবে মেল পাঠানো হল তাতেই সবটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু, তারপরেও আইপ্যাক খারাপ একথা বলতে চান না অনেকেই। খালি দল বিপদে পড়লে তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘আরজি কর’ অধ্যায় যখন চরমে, তখন তাদের দূরবীন দিয়েও দেখা যায়নি। এরা সুখের পায়রা। মমতার ছবিকে সামনে রেখে ‘স্ট্র্যাটেজি’ করেছিল। ভোট মমতার মুখেই হয়েছিল, খালি ক্রেডিট নিয়ে গেছে ‘প্যাক প্যাক’। এক অভিজ্ঞ রাজনীতিকের মতে, আইপ্যাক আসলে দলের হয়ে নয়, লোকসভা নির্বাচনের পর এই ভোটকুশলী সংস্থা ‘ক্যামাক স্ট্রিটের’ হয়ে কাজ করছিল। বাকি? সামাঝদারো কে লিয়ে, ইশারা কাফি হায়!
