যত দিন যাচ্ছে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারত এবং চিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই জোরাল হচ্ছে। পাশাপাশি, ভারত মহাসাগরেও থাবা বাড়াচ্ছে বেজিং। স্থলে দু'দেশের 'সংঘাত' বহু পুরনো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সাগরে বেজিং-নয়াদিল্লির কৌশলগত 'লড়াই' নয়া মাত্রা পেয়েছে। চিন যখন 'স্ট্রিং অফ পার্লস' বা 'মুক্তোর মালা'য় ভারতকে জড়িয়ে চাপে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে, তখন পালটা ‘সাগরমালা’য় পালটা চক্রব্যূহ তৈরি করছে নয়াদিল্লি। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অস্ট্রেলিয়া সফর যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মত বিশ্লেষকদের। তাঁদের মতে, এই সফর কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন নয়। বরং এই সফরের কেন্দ্রে রয়েছে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চিনকে 'সায়েস্তা' করা।
কিন্তু কী এই 'স্ট্রিং অফ পার্লস' বা 'মুক্তোর মালা'? আসলে চিন বহু বছর ধরেই ভারত মহাসাগরের আশপাশে বন্দর এবং অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করে নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করছে। বলা চলে কার্যত একটা 'চেইন' গড়ে তুলে ঘিরে ফেলছে ভারতকে। 'ড্রাগনে'র এই কৌশলই 'স্ট্রিং অফ পার্লস' বা 'মুক্তোর মালা' নামে পরিচিত। পাকিস্তান থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কার হামবানটোটা বন্দর - একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্রে বেজিংয়ের উপস্থিতি চিন্তা বাড়িয়েছে ভারতের। নয়াদিল্লির আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এই কেন্দ্রগুলিকে নিজেদের সামরিক সুবিধা হিসাবেও ব্যবহার করতে পারে বেজিং।
ড্রাগনের এই 'আগুন' প্রতিহত করতে সমুদ্রনীতি অবলম্বন করেছে ভারতও। পালটা ‘সাগরমালা’য় চক্রব্যূহ তৈরি করছে নয়াদিল্লি। ‘সাগরমালা’ হল ভারতের বিশেষ একটি প্রকল্প। এর উদ্দেশ্যে হল দেশের বন্দরগুলির আধুনিকীকরণ, উপকূলভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা এবং সামুদ্রিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা। কিন্তু এর পাশাপাশি ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়িয়ে সাগরে চিনের আধিপত্য রোখাও নয়াদিল্লির অন্যতম কৌশল। বলে রাখা ভালো, আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি, ‘কোয়াড’ বা ‘চতুর্দেশীয় অক্ষ’কে আরও সক্রিয় করে তোলাও এই কৌশলের অঙ্গ।
এই প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। অস্ট্রেলিয়া শুধু ভারতের এক বাণিজ্যিক অংশীদার নয়। বরং ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগস্থলে দেশটির অবস্থান অস্ট্রেলিয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করেছে। পাশাপাশি, অস্ট্রেলিয়া ‘কোয়াড’-এরও অংশ। এই জোটের মূল লক্ষ্য হল একটি উন্মুক্ত ও নিয়মভিত্তিক ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় জোট গড়ে তোলা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমে আগ্রাসী হয়ে উঠছে ‘ড্রাগন’। তাই চিনের দাপটকে প্রতিরোধ করাও এই জোটের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মোদির অস্ট্রেলিয়া সফর যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এই সফরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল আরও শক্তিশালী করতে তিনি অজি প্রদানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজের সঙ্গেও বৈঠক করবেন। এছাড়া ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বেজিং 'রক্তচক্ষু' দেখালেও ভারত এখন একা নয়, সেই বার্তাও স্পষ্ট হবে।
