'দ্য কনজুরিং'। ইতিহাসের অন্যতম সফল হরর ফ্র্যাঞ্চাইজি। কিন্তু এই সব কাহিনি নিছক বানানো বিষয় নয়। বাস্তব জীবনের অতিপ্রাকৃত ঘটনাই ছাপ ফেলেছে এই ছবিগুলিতে। ভৌতিক বিষয়ে তদন্তকারী এড ওয়ারেন ও লোরেন ওয়ারেনের সারা জীবনের 'প্যারানর্মাল' অভিজ্ঞতার উপরে ভিত্তি করে লেখা হয়েছে কাহিনি। মার্কিন পপ কালচারে একসময় খ্যাতি, অতি খ্যাতি যাঁদের ঘিরে আবর্তিত হত তাঁরা নতুন করে গোটা বিশ্বের কাছে পরিচিত হয়েছেন 'কনজুরিং' ইউনিভার্স রুপোলি পর্দায় ভেসে ওঠার পর। কিন্তু... বাস্তবটা কি একই রকম ছিল? ভৌতিক উপদ্রবে জেরবার পরিবারগুলির কাছে 'মুশকিল আসান' হিসেবে আবির্ভূত ওয়ারেন দম্পতির 'রিয়েল লাইফ' কি 'রিল লাইফে'র মতোই? নাকি খ্যাতির আড়ালে রয়ে গিয়েছে নানা অপ্রিয় প্রসঙ্গ! অন্যের সমস্যাকে কাজে লাগিয়ে জনপ্রিয়তার তাস খেলেই জনমানসে 'ঘোস্টহান্টার' হয়ে উঠেছিলেন ওই বিখ্যাত দম্পতি? এমনকী করেছেন যৌন কেলেঙ্কারিও!
শুরু থেকে শুরু করা যাক। ১৯৪৪ সালে প্রথম দেখা কিশোর এড ও কিশোরী লোরেনের। দু'জনেই ক্যাথলিক পরিবারের সন্তান। এক স্থানীয় সিনেমা হলে কাজ করতেন এড। সেখানেই মায়ের সঙ্গে ছবি দেখতে আসতেন লোরেইন। ততদিনে লোরেনের জীবনে অলৌকিক অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছে। ৯ বছর বয়স থেকেই নাকি তিনি অন্য মানুষের ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারতেন! এদিকে এডও অল্প বয়সে মৃত বাড়িওয়ালির ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন! দেখেছিলেন কীভাবে জানলা-দরজা হুটহাট খুলে যাচ্ছে!
'কনজুরিং বিশ্ব': ভয়ই যেখানে প্রধান উপজীব্য
ভৌতিক উপদ্রবে জেরবার পরিবারগুলির কাছে 'মুশকিল আসান' হিসেবে আবির্ভূত ওয়ারেন দম্পতির 'রিয়েল লাইফ' কি 'রিল লাইফে'র মতোই? নাকি খ্যাতির আড়ালে রয়ে গিয়েছে নানা অপ্রিয় প্রসঙ্গ!
১৭ বছর বয়সে এড যোগ দেন মার্কিন নৌবাহিনীতে! সেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। যুদ্ধে এডের নৌকা ডুবে গেল! প্রাণে বাঁচার পরই তিনি বিয়ে করলেন লোরেনকে। ১৯৫১ সালে জন্ম নিল কন্যা জুডি। সেনাবাহিনীর কাজ থেকে অবসর নিয়ে এড খুলে ফেললেন আর্ট স্কুল। কিন্তু যত সময় গেল, এড বুঝলেন তাঁদের আসল কাজের জগৎ একটাই- অতিপ্রাকৃত দুনিয়া! এড স্ব-ঘোষিত ডেমোনোলজিস্ট। অন্যদিকে লোরেন অতীন্দ্রিয় শক্তির অধিকারী এবং একজন উৎকষ্ট মিডিয়াম! ১৯৫২ সালে তাঁরা নিউ ইংল্যান্ড সোসাইটি ফর সাইকিক রিসার্চ প্রতিষ্ঠা করেন। ততদিনে বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। যুদ্ধোত্তর আমেরিকায় ক্রমশ বাড়ছে অতিপ্রাকৃতের প্রতি আগ্রহ। তবে ওয়ারেন দম্পতি খ্যাতির মুখ দেখেন সাতের দশকে। সৌজন্যে অ্যানাবেল নাম্নী এক ভৌতিক পুতুল। সেই পুতুলকে দেখতে মিষ্টি হলেও অচিরেই দেখা গেল চোখের কোণ থেকে উপচে পড়ছে রক্তের ধারা! এমনকী রাতের বেলা গলা টিপে ধরারও চেষ্টা করে। বাড়ির লোকের তো অবস্থা তথৈবচ! এই সময়ই আসরে অবতীর্ণ হলেন এড ও লোরেন। অ্যানাবেল নামের পুতুলটিকে পরীক্ষা করে তাঁরা জানিয়ে দেন মোটেই এই পুতুলটি ‘নিরাপদ’ নয়। এর মধ্যে রয়েছে শয়তানের উপস্থিতিও। বাড়িটিতে ‘ভূত তাড়ানোর শুদ্ধিকরণ’ করে অ্যানাবেলকে সঙ্গে করে নিয়ে চলে যান তাঁরা। এই ঘটনা ওয়ারেন দম্পতিকে প্রভূত খ্যাতি এনে দেয়। খুব দ্রুত তাঁরা হয়ে ওঠেন মার্কিন মুলুকের সবচেয়ে খ্যাতিমান প্যারানর্মাল তদন্তকারী।
এড ও লোরেনের মুখ থেকেই আমরা জেনেছি অতিপ্রাকৃত জগতের হাতছানির কথা
কিন্তু এড ও লোরেনের এই খ্যাতির সমান্তরালে রয়েছে বিতর্কও। এডের মৃত্যুর পরে ২০১৪ সালে এক মহিলা, নাম জুডিথ পেনি অভিযোগ করলেন এডের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। যদিও তা যখন শুরু হয় জুডিথ পঞ্চদশী, অন্যদিকে এড তখন মধ্য তিরিশে। এমনকী জুডিথ নাকি ওয়ারেন পরিবারের সঙ্গে থাকতেও শুরু করেন। যে কারণে ১৯৬৩ সালে গ্রেপ্তারও হতে হয়েছিল তাঁকে। কেননা কোনও বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে অবিবাহিত নারীর একত্রবাস সেই সময় আমেরিকায় বেআইনি। যাই হোক, ১৯৭৮ সালে জুডিথ অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন বলে দাবি। এবং তা একান্তই এডের ঔরসজাত! জুডিথের ভয়ংকর অভিযোগ, তাঁকে ধর্ষণ করেন এড। পরে হুমকি দেন, হয় জুডিথকে বলতে হবে সন্তানের বাবা কে তিনি জানেন না। নাহলে গর্ভপাত করিয়ে নিতে হবে! এখানেই শেষ নয়। জুডিথের আরও অভিযোগ, তাঁরই ছবি তুলে 'ভূতের ছবি' বলে চালাতেন এড!
বাস্তবের এড-লোরেন
এড ও লোরেনের খ্যাতির সমান্তরালে রয়েছে বিতর্কও। এডের মৃত্যুর পরে ২০১৪ সালে এক মহিলা, নাম জুডিথ পেনি অভিযোগ করলেন এডের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল।
এখানে দু'টি দিক উঠে আসে। এক, চলচ্চিত্রে যতই এড ও লোরেনকে এক মিষ্টি পরোপকারী দম্পতি হিসেবে দেখানো হোক না কেন, আসলে তাঁরা ছিলেন মুখোশধারী! দুই, যে অতীন্দ্রিয় কার্যকলাপ করে তাঁরা এত বিখ্যাত, সেটাও কি 'সাজানো'? স্রেফ দৃষ্টিভ্রম! বলাই বাহুল্য জুডিথের দাবি উড়িয়ে দিয়েছিলেন লোরেন। ২০১৯ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি সাফ বলেছেন, এডের সঙ্গে জুডিথের সম্পর্কের বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। এবং জুডিথ তাঁদের পরিবারের সদস্য হওয়ার সময়ই ছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক। এই কথা মেনে নিলে জুডিথের গ্রেপ্তারির কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে কোথায় যেন ভিত্তিহীন মনে হতে থাকে লোরেনের দাবি। ক্রমশ জোরালো হয়েছে ওয়ারেন দম্পতির 'ধাপ্পাবাজ' তকমা! অনেকেই বলছেন, আসলে যে সব ঘটনা ছবিতে দেখে আমরা শিউরে উঠি তার সবটাই সাজানো। শুধুমাত্র খ্যাতির মোহেই মানুষের সরল বিশ্বাসকে ব্যবহার করেছেন ওয়ারেন দম্পতি!
রুপোলি পর্দার এড-লোরেন
রোমাঞ্চের গভীরে এভাবেই উজ্জ্বল হয়ে উঠছে অবিশ্বাস ও প্রতারণার বীজ! সম্প্রতি ওটিটি মঞ্চে মুক্তি পেয়েছে 'কনজুরিং' সিরিজের শেষ ছবি। বাকি ছবিগুলির মতোই এখানেও কিন্তু বিতর্কের অংশগুলিকে সযত্নে পরিহার করা হয়েছে। এড, লোরেন, তাঁদের কন্যা, জামাই- সকলেই রয়েছেন এখানে। কিন্তু অদৃশ্য থেকে গিয়েছে বিতর্ক। তবে ছবিতে না দেখানো হলেও জুডিথের অভিযোগের পর থেকেই কিন্তু বিখ্যাত ভূতশিকারীদের খ্যাতির সমান্তরালে 'নেগেটিভ'-এর ছায়া আরও ঘন হয়েছে। আসল সত্যি কি কোনওদিন জানা যাবে? নাকি সবটাই থেকে যাবে অতীন্দ্রিয় জগতের মতোই ধোঁয়াটে হয়ে? উত্তর মেলে নাই।
