গত বছরের 'ভুল' থেকে শিক্ষা নিয়ে যুদ্ধনীতিই বদলে ফেলেছে ইরান। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-সহ একাধিক শীর্ষকর্তার মৃত্যুর পরেও সেই নতুন রণকৌশলেই আস্থা রাখছে তারা। তার উপর ভর করে যদি এই সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে পারে তেহরান, তাহলেই পশ্চিম এশিয়ায় বিপাকে পড়বে ওয়াশিংটন। উদ্বেগ বাড়বে ইজরায়েলেরও। অন্তত তেমনটাই মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
তেহরানের পরমাণু প্রকল্পের বিরোধিতায় গত বছরেও ইরানের সঙ্গে ইজরায়েলের সংঘাত বেধেছিল। তাতে জড়িয়ে পড়েছিল আমেরিকা। ১২ দিনের সংঘাতে ইজরায়েলের হামলার প্রত্যাঘাতে তেল আভিভ লক্ষ্য করে মুহূর্মুহূ ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করেছিল ইরান। কিন্তু সেগুলির অধিকাংশই প্রতিহত করে ইহুদি সেনা। ইজরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থারও সেই অর্থে কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মত, সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে তেহরান। গতবারের মতো তারা মুহূর্মুহূ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে না। এবার তাদের লক্ষ্য অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট। শুধু তা-ই নয়, সংঘাতের শুরুতেই আমেরিকা বা ইজরায়েল যেভাবে উন্নতমানের যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করছে, ইরান তা করছে না। বরং, মাঝারি মানের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। তা দিয়েই আমেরিকার এবং ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছে তারা, যাতে উন্নতমানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, ইরান চাইছে এই সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে। তাদের কৌশল হল, পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা বজায় থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য মার খাবে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা এবং ইজরায়েলের উপর চাপ সৃষ্টি করবে তাদের বন্ধুদেশগুলি। এই বিষয়টি উসকে দিতেই বাহরিন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েতের মতো আমেরিকার বন্ধুদেশগুলিকে নিশানা করেছে তেহরান। সেই হামলাও অনেক পরিকল্পনামাফিক। বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমণের পাশাপাশি ইরানের লক্ষ্যবস্তু ছিল বিভিন্ন অসামরিক পরিকাঠামো, বন্দর, হোটেল। এই সব হামলায় তারা যে সব অস্ত্র ব্যবহার করেছে, তা-ও বহু পুরনো। আর সেই সব অস্ত্র আটকাতে অত্যাধুনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কাজে লাগাচ্ছে আমেরিকা। বিশেষজ্ঞদের দাবি, ইরানের অস্ত্রভান্ডারে এখনও অন্তত ২৫০০ অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে। যা পরবর্তী কালে ব্যবহার করার জন্য ভেবে রেখেছে তেহরান।
যদিও ইরানের এই রণনীতি কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে সংশয়ে সামরিক বিশেষজ্ঞদের অনেকে। তাদের যুক্তি, অস্ত্রের ভাঁড়ার অক্ষত রেখে লাভ হবে না, যদি মিসাইল লঞ্চারই ধ্বংস করে দেয় শত্রুপক্ষ। আমেরিকা এবং ইজরায়েলও সেই চেষ্টা করছে। তেল আভিভের দাবি, তারা ইতিমধ্যেই ইরানের ৫০ শতাংশ মিসাইল লঞ্চার ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু তেমনটা যদি না ঘটে থাকে, তাহলে এই সংঘাত আরও বেশি দিন গড়াবে বলেই মনে করছেন অনেকে। বিশেষজ্ঞদের মত, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার অস্ত্রভান্ডারে স্বাভাবিক ভাবেই টান পড়বে। তা নিয়ে ওয়াশিংটন যথেষ্ট আশঙ্কিত। চিন-রাশিয়ার সঙ্গে যদি কখনও সংঘাত বাধে, তা মোকাবিলার জন্যই এতদিন ধরে অস্ত্রভান্ডার পরিপূর্ণ রেখেছিল তারা। তা ধীরে ধীরে খালি হয়ে গেলে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার স্বাভাবিক। অন্য দিকে, ইজরায়েলে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকারের উপরেও চাপ বাড়বে। এই কারণেই আমেরিকা এবং ইজরায়েল চাইছে দ্রুত সংঘাত শেষ করতে। আর ইরান চাইছে দীর্ঘায়িত করতে।
