দীর্ঘ ৪০ দিন টানা যুদ্ধ চলার পরও ইরানকে কাবু করতে পারেনি আমেরিকা। সংঘাত থামাতে বসতে হয়েছে আলোচনার টেবিলে। যদিও এখনও সমাধানসূত্র বের হয়নি। এই পরিস্থিতিতে চোখে চোখ রেখে কীভাবে আমেরিকার সঙ্গে লড়াই করেছে ইরান, তার গোপন মন্ত্র তারা ভারতকে দিতে চায়। সম্প্রতি ইরানের উপ প্রতিরক্ষামন্ত্রী রেজা তালাই-নিককে উদ্ধৃত করে এমনটাই জানিয়েছে সে দেশের সংবাদমাধ্যম।
মঙ্গলবার কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত হয়েছে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের বৈঠক। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ইরানের উপ প্রতিরক্ষামন্ত্রী রেজা তালাই-নিক। তিনি বলেন, “আমরা আমেরিকাকে যেভাবে পরাজয়ের পথ দেখিয়েছি, সেই অভিজ্ঞতা আমি জোটের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে প্রস্তুত।” উল্লেখ্য, এসসিও জোটে ভারত ছাড়াও রয়েছে চিন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, পাকিস্তান, ইরান এবং বেলারুশ।
ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত রক্তাক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল ইরান-আমেরিকা। একের পর এক ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তছনছ হয়ে গিয়েছিল ইরান। কিন্তু তা-ও লড়াইয়ের ময়দান থেকে সরে আসেনি তেহরান। ইরানের পালটা জবাবে লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল গোটা মধ্যপ্রাচ্য। প্রাথমিভাবে সেখানে ছড়িয়ে ছটিয়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। কিন্তু তারপর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বেপরোয়া হামলা চালাতে শুরু করে তেহরান। অবশেষে ৪০ দিন পর সাময়িক সংঘর্ষবিরতিতে রাজি হয়েছে দু’দেশ। তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এখনও হয়নি।
কিন্তু আমেরিকার বিরুদ্ধে ইরান কীভাবে এতদিন টিকে রইল? বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন হামলা ছিল মূলত সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ। স্থল অভিযানের মতো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হয়নি। ফলে প্রশাসনিক পরিকাঠামোর অক্ষত ছিল। আমেরিকা এই অভিযানে ইরানের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। তাঁদের সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িতও হয়। ইরানের অনেক শীর্ষ নেতারই মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তাতে নড়ে যায়নি তেহরান। গোপনে তারা দক্ষ আধিকারিকদের নিয়ে একটি দল গঠন করে। বর্তমানে তাঁরাই দেশটিকে পরিচালনা করছেন। অন্যদিকে, এই যুদ্ধটি এক তরফা ছিল না। শক্তিশালী অস্ত্রের সাহায্য়ে মার্কিন হামলার কড়া জবাব দিয়েছে ইরানও। তবে তেহরানের সবচেয়ে বড় কৌশল ছিল 'হরমুজ প্রণালী' বন্ধ করে গোটা বিশ্বে চাপ সৃষ্টি করা।
উল্লেখ্য, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জলপথ হরমুজ। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝামাঝি অবস্থিত এই সংকীর্ণ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২২ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়। এটি বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে সরবরাহ হওয়া মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক পঞ্চমাংশ। সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাহরিন এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এই প্রণালীর মাধ্যমে তেল রপ্তানি করে থাকে। তেলের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস - বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই পথ ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়। কাতার বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ। তারা হরমুজের মাধ্যমে গ্যাস রপ্তানির ওপরেই নির্ভরশীল। এই সব কারণেই হরমুজকে ‘বিশ্বের জ্বালানির লাইফলাইন’ বলা হয়।
