shono
Advertisement
Iran protest

'মোল্লারা দূর হটো', বলছে ক্ষিপ্ত ইরান, বিলম্বিত বোধোদয়?

সাড়ে চার দশক আগের দৃশ্যই আবার ফিরে এল ইরানে।
Published By: Saurav NandiPosted: 03:25 PM Jan 03, 2026Updated: 03:32 PM Jan 03, 2026

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক: সাড়ে চার দশক আগের দৃশ্যই আবার ফিরে এল ইরানে। সে বার রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল তেহরানের রাজপথ। যার সূত্র ধরেই ইরানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামিক শাসন। এ বার সেই ইসলামিক শাসনের বিরুদ্ধেই পথে নামলেন লাখ লাখ মানুষ। স্লোগান উঠছে, 'মোল্লাতন্ত নিপাত যাক'!

Advertisement

২৮ ডিসেম্বর রাজধানী তেহরান থেকে শুরু হয় প্রতিবাদ-আন্দোলন। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে আলবোর্জ, কারমানশাহ, মারকাজ়, এসফাহান, হামেদানের মতো এলাকায়। মূলত বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীদের থেকেই শুরু হয় এই আন্দোলন। পরে তাতে যোগ দেন পড়ুয়ারাও। ডলারের নিরিখে রিয়ালের মান তলানিতে ঠেকেছে। ফলে চূড়ান্ত অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে গোটা দেশ। বিক্ষোভকারীরা জানাচ্ছেন, তাঁদের পকেট ফাঁকা। ফ্রিজে খাবার নেই। নেই পর্যাপ্ত জলের ব্যবস্থাও। ফলে মানুষের সব রোষ গিয়ে পড়েছে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের উপর। গত কয়েক দিনের বিক্ষোভে ইতিমধ্যেই সাত জনের প্রাণ গিয়েছে ইরানে। তাঁদের মধ্যে এক নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যও।

২০২২ সালে পুলিশি হেফাজতে মাহসা আমিনি নামে এক তরুণীর মৃত্যুর পরে হিজাব-বিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছিল ইরান। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে সাড়ে পাঁচশোরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে দাবি। তার তিন বছর পরে ফের রাস্তায় নেমেছেন ইরানের সাধারণ মানুষ।

এ বার ক্ষোভের কারণ অবশ্য ভিন্ন। মূলত মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, পানীয় জলের সংকট নিয়েই ক্ষিপ্ত সাধারণ মানুষ। গত বছর ইরানে হামলা চালিয়েছিল ইজরায়েল। ১২ দিন ধরে সেই সংঘর্ষ চলেছিল। আমেরিকাও ইজরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে ইরানের পরমাণুকেন্দ্রে বোমা হামলা চালিয়েছিল। সেই সময় থেকে নানা পশ্চিমী নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে ইরান। যার জেরে অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ থামলেও সেই পরিস্থিতি থেকে বেরোতে পারেনি খামেনেইয়ের দেশ।

ইরানে এই আন্দোলনে নারীদেরও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা গিয়েছে। সাম্প্রতিককালে গণতান্ত্রিক অধিকার এবং নারী স্বাধীনতার পক্ষের আন্দোলনকে যে ভাবে দমন করেছে ইরান সরকার, তা নিয়ে ক্ষোভ আগে থেকেই ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ক্ষোভই স্ফূলিঙ্গ হয়ে উঠছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

ইসলামিক বিপ্লবের আগে ইরানে নারী স্বাধীনতা কেমন ছিল, তা মনে করিয়ে দিচ্ছেন মহিলা বিক্ষোভকারীদের একাংশ। তাঁরা জানাচ্ছেন, ইরানে আগে নীতিপুলিশিই ছিল না। তখনও ইরানের মেয়েরা হিজাব পরতেন, তবে স্বেচ্ছায়। বাধ্যবাধকতা ছিল না কোনও। হিজাব পরার পাশাপাশি জিন্স, মিনি স্কার্ট এবং শর্ট-হাতা টপ পরেও ইরানের রাস্তায় স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়াতে পারতেন সেই দেশের মহিলারা। সমুদ্রসৈকতে বিকিনি পরেও ঘুরতে দেখা যেত ইরানি মহিলাদের।

সেই সময়কার ছবিতে দেখা যায়, ইরানের বিভিন্ন শহরে হিজাব বা বোরখা ছাড়াই পথে নামতেন ইরানি মহিলারা। তাঁদের পরনে থাকতে আধুনিক পোশাক-আশাকও। স্বভাবগত ভাবেই শৌখিন ছিলেন ইরানের মহিলারাও। বাহারি জুতো পরতেও দেখা যেত তাঁদের। চোখে থাকত হাল ফ্যাশনের রোদচশমা। ওই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের ভর্তির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। গ্রামে বসবাসকারী রক্ষণশীল পরিবারের মেয়েরা যাতে বাড়ি থেকে দূরে পড়াশোনা করার সুযোগ পান, তা নিয়েও উদ্যোগী হয়েছিল প্রশাসন।

পিকনিক ছিল ইরানি সংস্কৃতির একটি জনপ্রিয় অঙ্গ। পরিবার এবং বন্ধুদের নিয়ে প্রতি শুক্রবার একত্রিত হওয়ার রীতি ছিল সেখানে। সেই সব জায়গায় খোলমেলা পোশাকেই দেখা যেত মহিলাদের। শুধু তা-ই নয়, সেই সময় ইরানে মহিলাদের স্যালঁও ছিল। ফ্যাশনের ধারা ছিল চুলের ছাঁটে। ইরানি মহিলাদের যেমন হিজাবে দেখা যেত, তেমনই রাস্তাঘাটে দেখা যেত তাঁদের খোলা চুলের বাহার।

পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের সময় থেকে। গণবিপ্লবের জেরে শাসক রেজা শাহ পাহলভির পতন ঘটেছিল। ক্ষমতা দখল করেছিলেন খামেনেইয়ের পূর্বসূরি আয়াতোল্লা রুহুল্লা খোমেইনি। তার পরেই তিনি নির্দেশ দেন, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দেশের সব মহিলাকে হিজাব পরে থাকতে হবে। ওই ঘোষণার পরই নারী দিবসে পথে নেমেছিলেন ইরানের মহিলারা। পোস্টারে লেখা ছিল, ‘‘আপনারা কি জানেন, ইরানে এখন খোলা চুল হাওয়ায় ওড়ানোও অপরাধ’’।

তবে সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কোনও দাগ কাটতে পারেনি। সরকারের মত বদলাতেও পারেনি। উল্টে দেশের সর্বোচ্চ নেতার থেকে আদেশে আসে, ইরানের মহিলারা বাড়ির ভিতরে যা খুশি পরতে পারেন, কিন্তু বাইরে বেরোলে তাঁদের ‘সংযত’ ভাবেই বেরোতে হবে। ফলে মহিলাদের সাঁতার পোশাক পরার উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।

পোশাকবিধি বিরোধী আন্দোলন তার পরেও দেখা গিয়েছিল ইরানে। কিন্তু দানা বাঁধতে পারেনি। প্রশাসনের চোখ রাঙানিতে থিতিয়ে যায় তা। ২০০৬ সালে মহিলারা পোশাকবিধি পালন করছেন কি না, তা দেখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল নীতিপুলিশ বাহিনী গস্ত-এ-এরশাদ। বছর তিনেক আগে এই বাহিনীরই অত্যাচারের শিকার হন মাহসা। তবে সেই গত দেড় মাসের হিজাব বিরোধী আন্দোলনের জেরে এই বাহিনী প্রত্যাহার করে নেয় ইরান সরকার। কিন্তু পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলায়নি। এখনও সেই আগের মতোই ইরানে নীতি-পুলিশরাজ রয়েছে বলেই অভিযোগ মহিলা বিক্ষোভকারীদের।

চার দশক আগে 'গণবিপ্লবের' জেরে দেশ ছেড়েছিলেন তৎকালীন শাসক পাহলভি। তার পরেই নির্বাসন কাটিয়ে ইরানে ফেরেন সেই গণবিপ্লবের নেতা খোমেইনি। দিনটা ছিল ১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯। এ বার সেই খোমেইনির উত্তরসূরি খামেনেইের বিরুদ্ধে পথে ইরানবাসী। পরিস্থিতি এমনই যে, বিক্ষোভকারীরা এখন ‘একনায়কের মৃত্যু’, ‘খামেনেইয়ের মৃত্যু’-র মতোও স্লোগান দিচ্ছেন। তাতেই জল্পনা, আবার পাহলভি বংশের শাসন ফিরতে পারে ইরানে।

গত বছর ইজরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সময়েও শোনা যাচ্ছিল, আসলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জানিন নেতানিয়াহু চাইছেন পাহলভি বংশের ফিরিয়ে এনে তেহরানে পালাবদল ঘটাতে। তখন তা বাস্তবায়িত না হলেও এখন আবার সেই জল্পনা জলবাতাস পেতে শুরু করেছে।

ক্ষমতাচ্যুত রেজা শাহ পাহলভি অবশ্য প্রয়াত হয়েছেন কয়েক দশক আগেই। তাঁর পুত্র ‘যুবরাজ’ রেজা শাহ এখন আমেরিকায় বসবাস করেন। নিজেকে ইরানের বৈধ শাসক বলেও দাবি করেন তিনি। ১৯২৫ সালে ইরানের রুশ ঘনিষ্ঠ শাসক আহমেদ শাহ কাজারকে উৎখাত করে ব্রিটেন এবং আমেরিকা ক্ষমতায় বসিয়েছিল রেজার পিতামহ পাহলভি বংশের প্রথম শাসক আলি রেজা শাহকে। ১০০ বছরের মাথায় আবার একই ভাবেই কি পাহলভি রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন ঘটবে ইরানে?

ঘটনাচক্রে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুক্রবারই ইরানের খামেনেইয়ের প্রশাসনকে হুমকি দিয়েছে আমেরিকা। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা হলে আমেরিকা চুপ করে বসে থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংটনকে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
  • সাড়ে চার দশক আগের দৃশ্যই আবার ফিরে এল ইরানে।
  • সে বার রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল তেহরানের রাজপথ। যার সূত্র ধরেই ইরানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামিক শাসন।
  • এ বার সেই ইসলামিক শাসনের বিরুদ্ধেই পথে নামলেন লাখ লাখ মানুষ। স্লোগান উঠছে, 'মোল্লাতন্ত নিপাত যাক'!
Advertisement