কিংবদন্তি ফিদেল কাস্ত্রোর ভাই কিউবার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের হত্যার ষড়যন্ত্র, বিমান ধ্বংস এবং চারটি খুনের অভিযোগ এনেছিল আমেরিকা। ৩০ বছর পর ওই অভিযোগগুলির ভিত্তিতে রাউলের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ। কিন্তু ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপে এবার হল ক্ষুব্ধ রাশিয়া এবং চিন।
বৃহস্পতিবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র বলেন, “‘কোনও অবস্থাতেই প্রাক্তন বা বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানদের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ করা উচিত নয়। এগুলি হিংসার শামিল।” অন্যদিকে, মার্কিন পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে বেজিংও। চিনের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, “যে কোনও অজুহাতে কিউবার উপর চাপ সৃষ্টি করা বা শক্তি প্রয়োগের চেষ্টার বিরোধিতা করে বেজিং।” তিনি আরও বলেন, “বিচার বিভাগকে হাতিয়ার করে কিউবার বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকা উচিত আমেরিকার। শুধু তা-ই নয়, কথায় কথায় শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেয়াও বন্ধ করা উচিত ওয়াশিংটনের।”
ওয়াশিংটনের সমালোচনা করে দুই শক্তিধর দেশই দাবি করেছে, কিউবার উপর মার্কিন চাপ এবং নিষেধাজ্ঞা শুধু লাতিন আমেরিকার স্থিতিশীলতাকেই নষ্ট করছে না, বরং নতুন সংঘাতের পরিবেশও তৈরি করছে। আর সেই কারণেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে জোর জল্পনা - আমেরিকার 'নিজের উঠোন' বলে পরিচিত ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে কি ফের নতুন করে ঠান্ডা লড়াইয়ের আবহ তৈরি হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ১৯৬২ সালের 'কিউবান মিসাইল সংকটে'র কথা। সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করতেই আমেরিকা ও সোভিয়েতের মধ্যে তৈরি হয়েছিল ভয়াবহ সংঘাতের পরিস্থিতি। শেষ মুহূর্তে কূটনৈতিক সমাধান হলেও গোটা বিশ্ব তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছিল। বর্তমান পরিস্থিতি সেই পর্যায়ে না পৌঁছালেও, কিউবাকে কেন্দ্র করে রাশিয়া-চিন বনাম আমেরিকার কৌশলগত অবস্থান ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে, গোটা পরিস্থিতির প্রভাব লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেখানকার আমেরিকা-বিরোধী সরকারগুলি চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে। ফলে কিউবাকে কেন্দ্র করে নতুন সমীকরণ তৈরি হলে গোটা অঞ্চলের কূটনৈতিক ভারসাম্য বদলে যেতে পারে বলেই মত বিশ্লেষকদের।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালে কিউবার ফিদেল-বিরোধীদের উদ্ধার করতে ‘ব্রাদার্স টু রেসকিউ’ (আমেরিকায় পালিয়ে যাওয়া ফিদেল-বিরোধীদের একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান) পৌঁছায় কিউবার আকাশে। ওই বিমানটিকে গুলি করে নামায় কিউবার সেনা। সেই সময় কিউবার প্রেসিডেন্ট ছিলেন ফিদেল। ভাই রাউল ছিলেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী। বলা বাহুল্য, রাউলের নির্দেশেই ওই বিমানে হামলা চালানো হয়েছিল। এই ঘটনায় অভিযুক্ত করে নয়ের দশকেই রাউলের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে আমেরিকা। তিন দশক পেরিয়ে তারই চার্জ গঠন করা হয়েছে।
রাউলের বয়স এখন ৯৪ বছর। তাঁকে কীভাবে আমেরিকার আদালতে পেশ করা হবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। ফিদেলের পরে ২০০৮-২০১৮ সাল পর্যন্ত কিউবার প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাউল। বয়সজনিত কারণে ২০২১ সালে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। সেই বয়ঃবৃদ্ধের বিরুদ্ধে তিন দশক পর চার্জ গঠন তাৎপর্যপূর্ণ, বিশেষত চার্জ গঠনের পরেই ট্রাম্পর হুঁশিয়ারি দেওয়া। ট্রাম্পের কথায়, "কিউবাকে মুক্ত করছে আমেরিকা। এর পরে দ্বীপরাষ্ট্রের ভাগ্যে কী আছে জানি না।"
