ইউরোপের ন্যাটোর ধাঁচে মক্কায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এক নয়া সামরিক জোট। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হওয়া এই সামরিক জোটকে 'মুসলিম ন্যাটো' হিসেবে আখ্যা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মহল। নয়া এই সামরিক সমঝোতার প্রধান লক্ষ্য হল, তিন দেশের কোনও একটিতে যদি শত্রুর হামলা হয়, তবে সেই হামলাকে নিজের উপর হামলা হিসেবেই দেখবে বাকিরা। অর্থাৎ এক দেশে হামলা হলে অন্য দুই দেশ তার পাশে দাঁড়াবে। তবে মহাআড়ম্বরে চুক্তি সই হলেও বাস্তবে মুসলিম ন্যাটোকে 'কাগুজে বাঘ' হিসেবেই দেখছে ওয়াকিবহাল মহল। ন্যাটোর অনুকরণে গালভরা নাম দিলেও বাস্তবে তা আসলে 'ফাঁকা কলসি'। এমনকী মুসলিম দেশগুলির এই ঢক্কানিনাদ প্রথমবার দেখছে না বিশ্ব।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বলছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য। মার্কিন নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থেকেও ইরানের মার থেকে রেহাই পাচ্ছে না সৌদি আরব। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিরাপত্তার বিকল্প নিয়েও বর্তমান যুদ্ধ রিয়াধকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। ঠিক এখানেই সৌদির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তুরস্ক ও পাকিস্তান। কারণ, তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তিধর দেশ। আর পাকিস্তান পরমাণু শক্তিধর। বৈভবশালী সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। সেখানেই নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে তুরস্ককে। তবে প্রশ্ন উঠছে, এই জোট ইরান, ইজরায়েল নাকি ভারত বিরোধী জোট? তা নিয়ে অবশ্য কেউই মুখ খোলেননি। তবে তুরস্কের দাবি, এটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি, ভবিষ্যতে যে কেউ এখানে যোগ দিতে পারে।
প্রশ্ন উঠছে, এই জোট ইরান, ইজরায়েল নাকি ভারত বিরোধী?
তবে বাস্তব বলছে, আর পাঁচটা দেশের মধ্যে চলা সাধারণ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ছাড়া এই জোটের আর কোনও ভূমিকা নেই। যুদ্ধ বাঁধলে অন্য দেশে সেনা পাঠানোর মতো দুঃসাহসও দেখাতে পারবে না দেশগুলি। যদি বাস্তবে চুক্তির বলে অন্য দেশে সেনা পাঠানোর সাহস দেখায় কোনও দেশ, সেক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হবে তুরস্ক ও পাকিস্তানকে। শুধু তাই নয়, আফগানিস্তানে পাকিস্তানের যে সংঘাত চলছে সেখানেই এই যুক্ত হতে হবে সৌদি আরব ও তুরস্ককে। যদি তা হয়, তবে ইসলামিক সহযোগি সংস্থা (OIC)-তে ফাটল ধরবে। বর্তমানে ৫৭টি মুসলিম দেশ এই গোষ্ঠীর সদস্য। যার মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান এবং ইরান। ইরানের তরফে ইতিমধ্যেই এই জোটের বিরোধিতা করে বলা হয়েছে, 'এহেন কাগুজে চুক্তি সৌদি আরবকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না, বরং এটি আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সংঘাত আরও বাড়াবে। এরা ইরানের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।'
ফলে মুখে 'মুসলিম ন্যাটো' হিসেবে নিজেদের দাবি করলেও বাস্তবে এত প্রতিবন্ধকতা অনেক। বলা ভালো, ভারতের সঙ্গে যদি কখনও পাকিস্তানের যুদ্ধ বাঁধে সেক্ষেত্রে ইসলামাবাদে সেনা পাঠানোর মতো দুঃসাহস হবে না সৌদি আরব বা তুরস্কের। তবে এটা ঠিক যে চুক্তির অধীনে একে অপরকে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে 'লজিস্টিক সাপোর্ট' দিতে পারবে দেশগুলি। যেমন অপারেশন সিঁদুরের সময় পাকিস্তানকে ড্রোন দিয়ে সাহায্য করেছিল তুরস্ক। যদিও এই ধরনের কোনও জোটে না থেকেও চিনের তরফে বিপুল সাহায্য পেয়েছে পাকিস্তান। তাতেও অবশ্য ভারতের মার থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারেনি আসিম মুনিরের বাহিনী।
তথ্য বলছে, এই ধরনের জোটের ভাঁওতা অতীতে আগেও দেখেছে বিশ্ব। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের উদ্যোগে সন্ত্রাস দমনের জন্য ৪০টির বেশি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে এমনই এক জোট গঠিত হয়েছিল। কিন্তু অল্প দিনেই দেখা যায় সে জোট খাতায়-কলমে বন্দি হয়ে পড়েছে। কার্যকরভাবে এর কোনও পরিণতি দেখা যায়নি। একইভাবে এই জোটেরও বিশেষ ভবিষ্যৎ দেখছে না কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ন্যাটোসুলভ যে দাবি করা তা আসলে তিন মুসলিম রাষ্ট্রের ঢক্কানিনাদ।
