shono
Advertisement
West Bengal Assembly Election

কলকাতার প্রথম ভোট ছিল ম্যাড়মেড়ে, ফেটেছিল একটিমাত্র পটকা!

Published By: Sucheta SenguptaPosted: 08:45 PM Feb 04, 2026Updated: 08:45 PM Feb 04, 2026

ভোটের আবহ। নির্বাচনী ইস্তাহার, দেওয়াল লিখন, প্রচার। নানা দলের নানা মত– মিটিং, মিছিল, বৈঠক। বাংলার ভোট চিরকাল একই ধাঁচের থাকেনি। সময় বদলেছে, বদলেছে ভোটের চরিত্র, বিবিধ রং-রূপ। বাংলার ভোট-ইতিহাসের কম জানা-অজানা নানা কিস্‌সা নিয়ে ধারাবাহিক কলম ধরলেন জয়ন্ত ঘোষাল

Advertisement

পর্ব ১
১৯৫২ সাল। জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ। আজ ঝকঝকে রোদ। এখনও কলকাতা বেশ ঠান্ডা। ‘ভারত’ নামক স্বাধীন দেশের প্রথম ভোট। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বউবাজার কেন্দ্রের ওয়েলিংটন স্ট্রিটের কর্পোরেশন মডেল স্কুল ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের সামনে। ব্রেকিং নিউজ! পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় এই মঙ্গলবার সকালে এখানে এসেছেন তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে। কী আশ্চর্য! কোথাও কোনও উত্তেজনা নেই। দলীয় স্লোগান দেওয়া বিধিসম্মত নয়। মানুষজন ভোট দিচ্ছেন, বুথ থেকে বেরিয়ে আসছেন। অবাক কাণ্ড!

ব্রেকিং নিউজ! পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় এই মঙ্গলবার সকালে এখানে এসেছেন তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে। কী আশ্চর্য! কোথাও কোনও উত্তেজনা নেই। দলীয় স্লোগান দেওয়া বিধিসম্মত নয়। মানুষজন ভোট দিচ্ছেন, বুথ থেকে বেরিয়ে আসছেন। অবাক কাণ্ড!

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়। ফাইল ছবি

কোথাও কোনও ইলেকট্রনিক চ্যানেলের ক্যামেরা দেখতে পাচ্ছি না। নেই কোনও বিরাট মাস-মিডিয়া বাহিনী। দলের ক্যাডাররা যে নেই, তা নয়। আছে বিক্ষিপ্তভাবে। তবে তাঁদের মধ্যে খুব কমজনই 'ডাক্তারবাবু' মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছেন! বিধানবাবু গাড়িতে উঠে চলে গেলেন। আসলে, বিধানসভার নির্বাচন হচ্ছে এই প্রথম পশ্চিমবাংলায়। বউবাজার কেন্দ্রে বিধানচন্দ্র রায় নিজেই প্রার্থী। মার্কসবাদী ফরোয়ার্ড ব্লক প্রার্থী সত্যপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ভোটপর্ব চুকে যাওয়ার পর জানতে পারলাম, এই কেন্দ্রে শতকরা ৪৫ থেকে ৫০ জন ভোট দিয়েছেন।

সেখান থেকে কল্পনার অ্যাম্বাসাডরে চেপে এখন যাচ্ছি টালিগঞ্জ উত্তর কেন্দ্রে। সেখানে প্রার্থী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ড. প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ।‌ তাঁর বিরুদ্ধে দু’-দু’জন প্রার্থী। একজন সুভাষবাদী ফরোয়ার্ড ব্লক প্রার্থী লীলা রায়। অন্যজন কংগ্রেস প্রার্থী প্রিয়রঞ্জন সেন।‌ কলকাতা আজ উত্তাল! কলকাতা আজ উত্তেজিত! মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনা প্রবল। কিন্তু কোথাও কোনও বোমা ফাটল না। কোথাও কোনও বড় মারামারি হল না। ম্যাড়মেড়ে ভোট।

বউবাজার কেন্দ্রে বিধানচন্দ্র রায় নিজেই প্রার্থী। মার্কসবাদী ফরোয়ার্ড ব্লক প্রার্থী সত্যপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ভোটপর্ব চুকে যাওয়ার পর জানতে পারলাম, এই কেন্দ্রে শতকরা ৪৫ থেকে ৫০ জন ভোট দিয়েছেন।

আমরা একুশ শতাব্দীতে এসে এই কল্পনার অ্যাম্বাসাডরে চেপে যা দেখছি, তাতে আর যাই হোক, ডোপামিনের খিদে তো মিটছে না। লোকসভা নির্বাচনও হচ্ছে বিধানসভা নির্বাচনের সঙ্গে। দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতা কেন্দ্রে জনসংঘের সভাপতি ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রার্থী।‌ তাঁর বিরুদ্ধে কংগ্রেস প্রার্থী মৃগাঙ্কমোহন সর। আর কে লড়ছে জানেন? উত্তর-পশ্চিম কলকাতার প্রার্থী কে? সেখানে ইনডিপেনডেন্ট প্রার্থী অধ্যাপক মেঘনাথ সাহা, পরে দেখা যাবে তিনি জিতেছেনও। তিনি ছিলেন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রার্থী।‌ কংগ্রেস প্রার্থী শ্রীপ্রভু দয়ালহিম্মত সিংকা। ভোট গ্রহণপর্ব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হল। নির্বাচন দপ্তর জানাল, মহানগরীর ভোট গ্রহণপর্ব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন! ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা ছিল।‌

শুধু প্রথম দিনে বেলগাছিয়ায় একটা নিরামিষ পটকা বিদীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু তাতে কেউ আহত হয়নি। অত্যুৎসাহী কিছু যুবক মহানন্দে সে কাজ করেছিল। ঠিক মারামারি করার উদ্দেশ্যে নয়। সে পটকা কালীপুজোয় যেমন পটকা ফাটানো হয়, তেমনটাই।‌ ঠিক বোমাবাজি না হলে এখন‌ মনে হয় না যে, ভোট হচ্ছে। পরদিন বাংলার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল, কলকাতা মহানগরীর ৪০০০ কেন্দ্রে নির্বিঘ্নে ভোট সম্পন্ন হইল। ‘বুথ ক্যাপচারিং’, ‘রিগিং’– এইসব শব্দ সেদিন সাংবাদিকরা জানতেন না। সকাল আটটা থেকে শুরু করে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোট হয়। তারপর একঘণ্টা মধ্যাহ্নভোজনের বিরতি দেওয়া হয়েছিল। আপনারা প্রত্যেকে খেয়ে-দেয়ে আসুন, তারপরে আবার ভোট শুরু হবে। দুপুর একটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ভোটপর্ব শেষ হল।

শুধু প্রথম দিনে বেলগাছিয়ায় একটা নিরামিষ পটকা বিদীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু তাতে কেউ আহত হয়নি। অত্যুৎসাহী কিছু যুবক মহানন্দে সে কাজ করেছিল। ঠিক মারামারি করার উদ্দেশ্যে নয়। সে পটকা কালীপুজোয় যেমন পটকা ফাটানো হয়, তেমনটাই।‌

তখন খবরের কাগজে ‘বউবাজার’ বলত না। লেখা হত ‘বহুবাজার’। তবে সেদিনও মুখ্যমন্ত্রীর নির্বাচনী কেন্দ্র ঘিরে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ সাংবাদিকদের।‌ ’৫২ সালে প্রথম লোকসভা নির্বাচন যখন হয় তখন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু চেয়েছিলেন, যাতে গরমে ভোট না হয়। তাঁর ইচ্ছে ছিল বসন্তকালে ভালো আবহাওয়ায় ভোট করার। যা হোক, শেষ পর্যন্ত ’৫১-’৫২ সালের জানুয়ারি মাসে ভোটপর্ব শুরু হয়। ভোটপর্ব শেষ হতে লেগে যায় বেশ কিছুটা সময়।

নেহরু দেশের প্রথম নির্বাচন কমিশনার করে নিয়ে আসেন এক বঙ্গসন্তানকে – তাঁর নাম সুকুমার সেন। তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের আমলা, গণিতজ্ঞ। লন্ডনে তাঁর দীর্ঘদিন পড়াশোনা, গবেষণা। নেহরুর মনে হয়েছিল, এত বড় একটা দেশের নির্বাচন করা মানে সেখানে পরিসংখ্যানের গুরুত্ব থাকবে অনেক বেশি।‌ পরিসংখ্যানের কাজটা জরুরি। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন করার সময়ও সত্যি সত্যি পরিসংখ্যানবিদদের প্রয়োজন হয়। বিষয়টা শুধু রাজনীতির নয়।

দেশের প্রথম নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেন। ফাইল ছবি

১৯৪৭ সালে যখন দেশভাগ হয় তখন পশ্চিমবঙ্গ‌ ছিল ভারতের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য। আর কেরল ছিল সবচেয়ে ছোট রাজ্য। তবে জনসংখ্যা হিসেবে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ছিল পঞ্চম। আসলে প্রতি বর্গক্ষেত্রে জনবসতির ঘনত্ব পশ্চিমবাংলায় বরাবরই বেশি। এখন সেই জনবসতি বাড়তে বাড়তে কোথায় এসে পৌঁছেছে, সে তো আমরা জানি।

সেই সময় সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, এই স্বাধীন দেশের পশ্চিমবাংলায় প্রথম ভোট ১৯৫২ সালের ২৫ জানুয়ারি যখন সমাপ্ত হয়, তখনও কিন্তু ভোটের ফল বেরনোর পরে কোনও হিংসাত্মক ঘটনা দেখা যায়নি। তবে ভোট শুরু হওয়ার তিন-চার মাস আগে থাকতে তুমুল প্রচার অভিযান শুরু হয়েছিল। দাওরি ছিল মুখরিত। কিন্তু ঠিক ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ হঠাৎ অন্তর্মুখী হয়ে যান। প্রকৃত ভোটগ্রহণের প্রাক্কালে বাংলা একটা স্তব্ধভাব ধারণ করে – এমনটাই বলছে, সেসময়কার খবরের কাগজ। উৎসাহ-উদ্দীপনার ঢেউ লেগেছিল।

তবে উত্তর কলকাতা এবং মধ্য কলকাতা অঞ্চলে যেমনভাবে নারী-পুরুষ সকাল থেকেই ভোট দিতে নেমে পড়ে যান, দক্ষিণ কলকাতায় কিন্তু তা হয়নি। দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে, নারী ভোটদাত্রীরা বিকেলের দিকে অধিকসংখ্যায় ভোট দিতে আসেন।‌ তার মানে বোঝা যায়, সেদিনও দক্ষিণ কলকাতার শহুরে মানুষ ভোট দেওয়ার ব্যাপারে খুব যে সক্রিয় ছিলেন, এমন নয়। সমর্থক-স্বেচ্ছাসেবক বিভিন্ন এলাকা সরগরম করে রেখেছিল। 

বাংলার গ্রামগুলোর অভ্যন্তরে ছিল আরও শান্ত স্তব্ধতা। ভোটগ্রহণের দিন সরকারি অফিস ছুটি ছিল। বহু সওদাগরি অফিসে একবেলা কাজ হয়েছিল। কিন্তু যাদের ভোটদানের সুযোগ করার জন্য জওহরলাল নেহরু থেকে বিধান রায় - প্রত্যেকেই অনেক রকমের ব্যবস্থা করেছিল। সেদিনের সংবাদপত্র বলছে যে, তাদের এক বড় অংশও কিন্তু সেদিন ভোট দিতে তেমন আগ্রহ দেখাননি।

কিন্তু বাংলার গ্রামগুলোর অভ্যন্তরে ছিল আরও শান্ত স্তব্ধতা। ভোটগ্রহণের দিন সরকারি অফিস ছুটি ছিল। বহু সওদাগরি অফিসে একবেলা কাজ হয়েছিল। কিন্তু যাদের ভোটদানের সুযোগ করার জন্য জওহরলাল নেহরু থেকে বিধান রায় - প্রত্যেকেই অনেক রকমের ব্যবস্থা করেছিল। সেদিনের সংবাদপত্র বলছে যে, তাদের এক বড় অংশও কিন্তু সেদিন ভোট দিতে তেমন আগ্রহ দেখাননি। প্রিসাইডিং অফিসারদের সঙ্গে সাংবাদিকরা আলোচনা করে এই ধারণায় পৌঁছেছিলেন। আসলে ভোটারদের ভোট দেওয়ার ব্যাপারে সচেতন করার যে প্রক্রিয়া, তা করতে অনেক সময় লেগেছে। ধীরে ধীরে ব্যাপারটি বেড়েছে। আর এখন তো নির্বাচন কমিশন ভোটারদের সচেতনতা বাড়ানোর জন্য যেভাবে বিজ্ঞাপন দেয়, তা অতীতের তুলনায় কয়েকশো গুণ বেশি।

বিরোধী রাজনীতির আন্দোলনমুখীনতা, বাংলার র‌্যাডিক্যালিজম সেই সময় ক্রমশ বাড়তে থাকে। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় চরমপন্থী এবং নরমপন্থী কংগ্রেস নেতৃত্বের পাশাপাশি এই বাংলাতেই সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু নির্বাচনী গণতন্ত্রে তখনও হিংসার অনুপ্রবেশ দেখা যায়নি। অভিযোগ ওঠেনি রিগিং অথবা বুথ ক্যাপচারিংয়ের। সময় বহতা স্রোত। দ্রুত বদলে যায়।

কল্পনার অ্যাম্বাসাডর গাড়িতে চেপে আমরা পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের ইতিহাস দেখব।‌ ’৫২ সালের পর ছয়ের দশকের কলকাতা। তখনও এই শহরের দক্ষিণ সীমানায় আদিগঙ্গার খালে স্রোত ছিল। এমনকী, সেই আদিগঙ্গায় দুয়েকটা নৌকাও ভেসে যেতে দেখা যেত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবার্ষিকী ভবনের প্রাচীন গ্রিক আদলের থাম নিয়ে ভেঙে পড়ছে শত শত স্মৃতির সেনেট হাউস। অন্যদিকে কলকাতার লোক দেখছে ১৯৬৪ সালের এপ্রিল মাসে এশিয়াটিক সোসাইটির নতুন বাড়ি হচ্ছে।‌ পূর্ব প্রান্তে কলকাতাকে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা হচ্ছে। আবার এর পাশাপাশি শব্দদূষণ বাড়ছে। নির্বাচনের সময় মাইক মুখরিত হচ্ছে।

এভাবেই সময় বদলায়।‌ ১৯৯০ সালের কলকাতা কর্পোরেশনের ভোট। মধ্য কলকাতা, দক্ষিণ কলকাতায় পর্যন্ত চলছে ব্যাপক বোমাবাজি। পিস্তল হাতে মস্তানদের খোলাখুলি দাপাদাপি দেখছি। এমনকী, আমাদের সাংবাদিকদের সামনে বউবাজারের মোড়ে এক বাম-শরিকের রাজ্য দপ্তর। যেখানে গোলমাল হচ্ছে, সেখান থেকে মেরে-কেটে হয়তো ৫০০ মিটার হবে। যখন সেখানে গিয়ে নেতাদের জিজ্ঞাসা করছি, ভোট কেমন হল? অম্লানবদনে তাঁরা জানালেন, ‘পিসফুল’। অথচ সেই অফিসে বসেই বাইরে বোমার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। সে ছিল ফ্রন্ট শ্রমিকের বাধ্যবাধকতা। গোলমাল শরিকদল যতটা করেছে, তার থেকে বেশি করেছিল সিপিএম। ভোটের এই অবক্ষয় শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, দেশজুড়েই।‌

১৯৯০ সালের কলকাতা কর্পোরেশনের ভোট। মধ্য কলকাতা, দক্ষিণ কলকাতায় পর্যন্ত চলছে ব্যাপক বোমাবাজি। পিস্তল হাতে মস্তানদের খোলাখুলি দাপাদাপি দেখছি। এমনকী, আমাদের সাংবাদিকদের সামনে বউবাজারের মোড়ে এক বাম-শরিকের রাজ্য দপ্তর। যেখানে গোলমাল হচ্ছে, সেখান থেকে মেরে-কেটে হয়তো ৫০০ মিটার হবে। যখন সেখানে গিয়ে নেতাদের জিজ্ঞাসা করছি, ভোট কেমন হল? অম্লানবদনে তাঁরা জানালেন, ‘পিসফুল’।

দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে প্রথম দেখেছিলাম পেরি শাস্ত্রীকে। কিন্তু তিনি ছিলেন নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। কোনও বিতর্কই হয়নি তাঁকে নিয়ে। টি এন সেশন যখন নির্বাচনী কমিশনার হলেন, তখন দেখেছি, পশ্চিমবঙ্গে শুধু নয়, দেশজুড়ে একটা বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। টি এন সেশন পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতি বসুর সঙ্গে প্রবল কলহে লিপ্ত হন। সেসময় প্রায় প্রতিদিনই দেখা করতাম সেশনের সঙ্গে। আর তিনি বলতেন, সিপিএমের রিগিং তিনি বন্ধ করবেন। জ্যোতি বসু বিরক্ত হয়ে একবার বললেন, তিনি তো টি এন সেশন নয়, উনি হলেন ‘অ্যালসেশন’। তাতেও সেশন তাঁর রণে ভঙ্গ দেননি। ওঁর অত উচ্চকিত নির্বাচন সংস্কারের আওয়াজের পরেও কিন্তু বহুদিন জ্যোতি বসু এবং তারপর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাইটার্সে ক্ষমতাসীন ছিলেন।‌

(বাঁদিকে) টিএন সেশন, (ডানদিকে) জ্যোতি বসু। ফাইল ছবি


এখনও মনে পড়ে, ১৯৯৬ সালে দেশের লোকসভা এবং পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ভোট একইসঙ্গে হয়েছিল। আর তখন টি এন সেশন ছিলেন মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার।‌ রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক ছিলেন স্বাস্থ্যসচিব লীনা চক্রবর্তী। তখন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের পদটিতে পূর্ণ সময়ের জন্য কাউকে নিযুক্ত করতেই হত না। সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার একজন আইএস অফিসারকে এই পদের জন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হত। পরে নির্বাচন কমিশন পূর্ণ সময়ের জন্য মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক নিয়োগ করতে শুরু করেন।

সেবারই ইভিএম ভোটগ্রহণ ব্যবস্থা পরীক্ষামূলক ভাবে সারা দেশে কয়েকটি কেন্দ্রে হয়েছিল। সর্বত্র ব্যালট পেপারেই ভোট হচ্ছিল। তবে এর মধ্যে যাতে ভোটের ফলাফল নিয়ে অশান্তি না ছড়াতে পারে, সেজন্য টি এন সেশন নতুন নিয়ম চালু করেন। প্রত্যেকটা ব্যালট বক্স থেকে সব ব্যালট একটা‌ বাক্সে ফেলে, সেটা ভালো করে মিশিয়ে নেওয়া হবে। তারপরে নতুন করে গণনা শুরু করা হবে। বুথভিত্তিক কে কতটা ভোট পেয়েছে– সেটা জানার সুযোগ থাকবে না। এ জন্য অনেক সময় লেগে গিয়েছিল। ভোটগণনা করতে অনেক দেরি হয়েছিল। আর ভোটের ফলাফল জানার জন্য তখন রাইটার্সে রোটান্ডায় কন্ট্রোল রুম খোলা হত। সারাদিন সারারাত সেই কন্ট্রোল রুম খোলা থাকত।

ইভিএমে প্রথম ভোট। ফাইল ছবি

আমরা, সাংবাদিকরা সারা রাজ্যের ভোটের ফলাফল পেতাম। তখন মোবাইলও ছিল না। টেলিভিশনের ‘ব্রেকিং নিউজ' ছিল না। অনেকেই তখনও রেডিও থেকে ভোটের খবর শুনতেন। সারা রাজ্যের ভোটের ফলাফল সংগ্রহের জন্য কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে সংবাদপত্রের অফিসকে সবসময় যোগাযোগ রাখতে হত। সেখানে ছিল হটলাইন। টি এন সেশনের এই পদ্ধতিতে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনও ফলাফল জানা যায়নি।

তবে সেশনের এত গর্জনের পরেও কিন্তু বারবার ক্ষমতায় আসত সিপিএম! কীভাবে সে অসম্ভব সম্ভব হত? পরের পর্বে সেকথা শোনাব আপনাদের!

(ক্রমশ )

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement