shono
Advertisement
West Bengal Assembly Election

১০০ বছর আগের নির্বাচনেও চিটিং, ডাকাতি, এমনকী, ভোট কাড়াকাড়ি!

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গোষ্ঠী রাজনীতি তো নতুন ছিল না, সব দলেই হত। তখন কংগ্রেসেও ঘরোয়া ঝগড়া কিছু কম ছিল না।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 07:18 PM Feb 24, 2026Updated: 07:18 PM Feb 24, 2026

নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা নাটক, নাম 'ইলেকশন'। আজ অবধি ঘটেনি এ নাটকের একক গ্রন্থ প্রকাশ। তবে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা এই নাটকটিতে সেই সময়ের কলকাতার ভোটের গপ্পো জানা যাচ্ছে। সম্ভবত ১৯২০-'২৫ সালের কথা হবে। সে নাটকে উঠে আসছে সেসময়ের ভোটের গপ্প, ভোটের সত্যি। বঙ্গভোটের ইতিহাসের চতুর্থ পর্ব, লিখছেন জয়ন্ত ঘোষাল

Advertisement

ব্রিটিশ জমানা। কলকাতা পুরসভার কমিশনারের নির্বাচন। অভিজাত ভারতীয়রা অংশ নিচ্ছেন ভোটে। সেই সময় এক নাটকের কথোপকথন। অপরেশ বীরেন্দ্রকে বলছে, 'আমাকে কেন তোমরা পীড়াপীড়ি করছ? কমিশনারি আমি চাই না। আমি চাই না। আমি পারব না। আমি retire করছি।' বীরেন্দ্র জবাব দিচ্ছে, 'সে কী! তুমি retire করবে। You are the fittest-most honest straightforward, independent, spirited, a great speaker, a distinguished writer, আর কী qualification চাও?' গণেশের মন্তব্য, 'ওগুলো কি qualification হলো? ওগুলো তো disqualification.' বীরেন্দ্র বলছে, 'কেন?' গণেশের জবাব, 'প্রথমত, Honesty is a negative virtue... It never pays-- যদিও কথামালায় পড়েছিলাম, honesty is the best policy. তারপর কী বললে?'
বীরেন্দ্র - 'Spirit.'
গণেশ - 'সমানে সমানে Spirit খাটে। কিন্তু বড়র কাছে অন্তত আমার কাছে বাবা spirit is most welcome when it comes bottled up. আর theosophy spirit-এও আপত্তি নেই; তারা নেহাতই নিরীহ জীব। ডাকলেই আসে। ফোটোগ্রাফ তোলো, কথা কও, প্রবন্ধ লেখাও, যা বলো করবে। কেবল অত্যন্ত কৃপণ। টাকা দেয় না।'

বলতে পারেন, এই ভোট প্রচারের কথোপকথনটা কোথায় লেখা হয়েছিল? নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা। 'ইলেকশন' নামের এই নাটকটি বিস্মৃতির আঁধারে হারিয়ে গিয়েছিল। আজ অবধি ঘটেনি এ নাটকের একক গ্রন্থ প্রকাশ। তবে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা এই নাটকটিতে সেই সময়ের কলকাতার ভোটের গপ্পো জানা যাচ্ছে। সম্ভবত ১৯২০-'২৫ সালের কথা হবে।

যেমন এই নাটকের একটা জায়গায় সংলাপে আছে: ''প্রকাশ, হ্যাঁ বাবা, চিটিং। কিন্তু তোমরা? তোমরা যা করছো, সেটা highway robbery. open daylight-এ ভোট নিয়ে কাড়াকাড়ি। Force, enticement, bribery, corruption. এই যদি Election হয়, তো বাবা Election-এর পায়ে দণ্ডবৎ। যদি সত্যসত্যই মানুষ হতে তারাই ভোট দিত সেধে- ভিক্ষা করতে হোত না ক দ্বারে দ্বারে কেঁদে। তোমাদের হাতে প'ড়ে দেবতার বরও অভিশাপ বাবা।'' ব্রিটিশ আমলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা অগ্রন্থিত নাটকে সেই সময়ের ভোট সম্পর্কে দেখা যাচ্ছে, তখনও দুর্নীতি, তখনও ভোটের জন্য গণদেবতাকে কেনার প্রচেষ্টা অভিজাত বাবুতন্ত্রের মধ্যেও কম ছিল না।

ব্রিটিশ আমলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা অগ্রন্থিত নাটকে সেই সময়ের ভোট সম্পর্কে দেখা যাচ্ছে, তখনও দুর্নীতি, তখনও ভোটের জন্য গণদেবতাকে কেনার প্রচেষ্টা অভিজাত বাবুতন্ত্রের মধ্যেও কম ছিল না।

কল্পনার সেই সাদা অ্যাম্বাসডারে চেপে ব্রিটিশ আমলের কলকাতা থেকে যদি আবার চলে আসি ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, আপনাদের কেমন লাগবে? সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল বের হচ্ছে। রাইটার্স বিল্ডিংয়ের করিডরের লোকজনের আনাগোনা শুরু হয়ে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজের ঘরে বসে আছেন। বামপন্থী আরএসপি নেতা যতীন চক্রবর্তী একবার মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে যাচ্ছেন, আরেকবার প্রেস কর্নারে আসছেন। নতুন নতুন খবর দিচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রীর খবর কী? কেউ একজন জিজ্ঞাসা করলেন। খাপ থেকে চুরুট বের করে যতীনবাবু ধোঁয়া উড়িয়ে বললেন, ''ওঁকে হারানো এত সহজ হবে না। কাঁচকলা মন্ত্রী, ঠিক জিতে যাবে।'' কিন্তু তারপরই হয়তো বা ১০ মিনিট হল, মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে থেকে নীরবে দেখা গেল বেরিয়ে আসছেন সেদিনের ধিক্কৃত নেতা প্রফুল্লচন্দ্র সেন। সবাই অবাক!

রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন। ফাইল ছবি

প্রফুল্ল সেন মাত্র ৮০০ ভোটে বাংলা কংগ্রেস সভাপতি অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়ের কাছে পরাস্ত হলেন। দ্রুত গতিতে দাবানলের মতো খবরটা ছড়িয়ে পড়ল। গোটা কলকাতা তখন যেন রাস্তায়। ল্যাম্পপোস্টে ঝুলছে শুধু জোড়া কাঁচকলা। গোটা কলকাতার কোনও বাজারে সেদিন কাঁচকলা পাওয়া যায়নি। দ্বিগুণ দামে কাঁচকলা বিক্রি হয়েছে। প্রফুল্ল সেন বলেছিলেন না কাঁচকলা খেতে! একটাই মন্তব্যে কী কাণ্ডটাই না হয়ে গিয়েছিল!

প্রফুল্ল সেন মাত্র ৮০০ ভোটে বাংলা কংগ্রেস সভাপতি অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়ের কাছে পরাস্ত হলেন। দ্রুত গতিতে দাবানলের মতো খবরটা ছড়িয়ে পড়ল।

কোনও নেতার প্রতি মানুষের এত ধিক্কার, এত রোষ তো দেখা যায়নি। রাজভবনে, মন্ত্রী নিবাসের সামনেই প্রফুল্ল সেন বিরোধী ধিক্কার। জানলার কাচগুলো যেন ঝনঝন করে উঠছে! রাজ্যপালের কাছে পরাজিত মুখ্যমন্ত্রী ইস্তফাপত্র পেশ করে এলেন। কিন্তু অজয় মুখোপাধ্যায় জিতে কী বলেছিলেন? তমলুকে জয়ী হয়েছেন, খুশি হয়েছেন। আরামবাগেও জয়ী হয়েছেন। কিন্তু অজয়বাবু বললেন, ‘‘আমি খুশি নই। বিপরীত রাজনীতি করেছি। তবুও যেন ৪৫ বছরের সহকর্মী নেতা প্রফুল্লদার পরাজয়টা মেনে নিতে পারছি না।''

ড. বিধানচন্দ্র রায় মারা যাওয়ার পর যখন মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের কথা উঠেছিল, তখন এই অজয় মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘‘খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে প্রফুল্লদা সকলের হয়ে বিষপান করলেন। অমৃতপানের অধিকার প্রফুল্লদার কেন থাকবে না? প্রফুল্লদাই হবেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই প্রফুল্লদা পরাজিত হয়ে ধিক্কৃত হচ্ছেন। যেমন একদিন এই আরামবাগেই রাধাকৃষ্ণ পালের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। সেদিন ধিক্কৃত হয়েছিলেন দুর্ভিক্ষ মন্ত্রী হিসেবে।''

‘‘খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে প্রফুল্লদা সকলের হয়ে বিষপান করলেন। অমৃতপানের অধিকার প্রফুল্লদার কেন থাকবে না? প্রফুল্লদাই হবেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই প্রফুল্লদা পরাজিত হয়ে ধিক্কৃত হচ্ছেন। যেমন একদিন এই আরামবাগেই রাধাকৃষ্ণ পালের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। সেদিন ধিক্কৃত হয়েছিলেন দুর্ভিক্ষ মন্ত্রী হিসেবে।''

পরের দিন আরেকটা ছবি। রাজভবনে মন্ত্রী নিবাস। ভোর তখন সাড়ে পাঁচটা। নিচের ঘরে জনা কয়েক মহিলা কান্নাকাটি করছে। আর কিছু লোক নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। কেউ বলছে, কংগ্রেস ১২৭টি আসন পেয়েছে তাতে কিছু নয়। প্রফুল্লদা জিতলে মেজরিটির অভাব হত না। প্রফুল্লদার কথায় বিরোধী দল থেকেও অনেকে চলে আসত। কেউ বলছেন, একটা সেফ সিট থেকে প্রফুল্লদাকে রিটার্ন করতে পারলে ভালো হত। ঠিক এমনই সময় প্রফুল্লদা এলেন। স্নানটান হয়ে গিয়েছে। চোখেমুখে বিন্দুমাত্র বিষাদের ছাপ নেই। কী গো? এত সকালে কোত্থেকে গো? চা খেয়েছ? এসো এসো, চা খাবে এসো। কথায় কথায় স্বভাবসুলভ ইঙ্গিতে তিনি বললেন, ''হেরে গিয়েছি, তাতে কী? ইলেকশনে তো হার-জিত আছে। মানুষকে দোষ দিতে নেই। নিশ্চয়ই মানুষের কাছে ভুল ধরা পড়েছে। না-হলে হারিয়ে দেবে কেন? এটাই তো গণতন্ত্র। আর যাঁরা নির্বাচনের ফলাফলকে মেনে নিতে পারে না, তাঁরা গণতন্ত্রকে মানে না।'' পরে প্রফুল্লবাবু বলেছিলেন, ''গ্রামে-গ্রামে আমরা ট্রানজিস্টর পৌঁছে দিয়েছি। কিন্তু ভাত-কাপড় হয়তো দিতে পারিনি। মন্ত্রিত্ব গিয়েছে। এবার সংগঠন গড়ার কাজ করব।''

এটাই তো গণতন্ত্র। আর যাঁরা নির্বাচনের ফলাফলকে মেনে নিতে পারে না, তাঁরা গণতন্ত্রকে মানে না।'' পরে প্রফুল্লবাবু বলেছিলেন, ''গ্রামে-গ্রামে আমরা ট্রানজিস্টর পৌঁছে দিয়েছি। কিন্তু ভাত-কাপড় হয়তো দিতে পারিনি। মন্ত্রিত্ব গিয়েছে। এবার সংগঠন গড়ার কাজ করব।''

ভাবা যায় এরকম? ভোটে হেরে যাওয়ার পরেই এইরকম প্রতিক্রিয়া? সেই সময়কার সাংবাদিক প্রয়াত নিশীথ দে-র কাছ থেকে এই গল্প শুনেছিলাম। সেই সময় নিশীথদা 'পালাবদলের নায়ক' বলে একটা বই লিখেছিলেন। লিখেছিলেন, ১৯৬৭ সালে কংগ্রেস মন্ত্রিসভার পতনের পর প্রফুল্লচন্দ্র সেন দিনের পর দিন পর্যালোচনা করেছিলেন, এই বিপর্যয় কেন? যে কারণে তিনি সরাসরি আরামবাগ চলে গেলেন। যে আরামবাগের মাটি থেকেই তিনি উঠেছিলেন। ১৯২৩ সালে আরামবাগে বন্যা-দুর্গতদের সাহায্য করার জন্য এসেছিলেন। কিন্তু ফিরে যেতে পারেননি। আরামবাগের জন্য করেছেন অনেক। আবার এই আরামবাগের মাটিতেই পরাজিত হয়েছেন, অপমানিত হয়েছেন। কিন্তু আরামবাগকে তো ছাড়েননি। অনেকে বলেছেন, প্রফুল্লদা, 'রিকস' নেওয়া ঠিক হবে না। আরামবাগ ছাড়া অন্য একটা কেন্দ্রে দাঁড়ান। কিন্তু উনি 'রিকস' নিতে চেয়েছিলেন। প্রফুল্লদা কোনও বারণ শোনেননি। শুধু আরামবাগ নয়। আরামবাগে যাঁদের জন্য, তাঁর দুর্নাম তাঁদেরও নয়। কয়েকজন কর্মীর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, দুর্নীতি, অপপ্রচার প্রফুল্ল সেনের দুর্নামের জন্য অনেকটা দায়ী - এমনটা বলেছিলেন, নিশীথদা। তবুও লোকের কথা তিনি কানে তোলেননি। নির্বাচনের পরের দিনই নিজে রাজভবনে এসেছেন। কারও সঙ্গে কোনওরকম দুর্ব্যবহার করেননি। পরাজয়ের কারণ যেমন বিশ্লেষণ করেছেন। তেমনই পরাজয়কে মেনেও নিয়েছেন। তাঁর আচার-আচরণে কোনও রকম বিরক্তি বা অস্বস্তির ভাব ফুটে ওঠেনি।

আরামবাগের জন্য করেছেন অনেক। আবার এই আরামবাগের মাটিতেই পরাজিত হয়েছেন, অপমানিত হয়েছেন। কিন্তু আরামবাগকে তো ছাড়েননি। অনেকে বলেছেন, প্রফুল্লদা, 'রিকস' নেওয়া ঠিক হবে না। আরামবাগ ছাড়া অন্য একটা কেন্দ্রে দাঁড়ান। কিন্তু উনি 'রিকস' নিতে চেয়েছিলেন। প্রফুল্লদা কোনও বারণ শোনেননি।

বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র সেন। ফাইল ছবি

১৯৪৮ সালে আরামবাগ থেকে এক উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রফুল্ল সেন ড. বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভায় অসামরিক সরবাহ দপ্তরের মন্ত্রী হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে বিধানসভার আসনে পরাজিত হলে, বিধান পরিষদে নির্বাচিত হয়ে খাদ্যমন্ত্রী হন। ১৯৫৭ সালে তারপর '৬২ সালে সেই আরামবাগ থেকেই বিপুল ভোটে আবার বিধানসভায় জয়ী হলেন। প্রফুল্লবাবু নিজের দলেই হোক বা বিরোধী দলেরই হোক - সকলকে খাওয়াতে খুব ভালবাসতেন। নরম মাংস আর আটার রুটি। এটা ছিল তাঁর 'ফেভারিট' খাবার। ১৯৬৫ থেকে তণ্ডুল জাতীয় খাদ্যগ্রহণ একেবারে তিনি বর্জন করে দেন।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গোষ্ঠী রাজনীতি তো নতুন ছিল না, সব দলেই হত। কংগ্রেসের ঘরোয়া ঝগড়া কিছু কম ছিল না। অতুল্য ঘোষের কাছে ড. বিধানচন্দ্র রায়ের বিরোধ, অতুল্যবাবুর সঙ্গে প্রফুল্লবাবুর বিরোধ, এসব অনেক কানাঘুষো তখন শুরু হল। অতুল্য ঘোষের নিজস্ব কোনও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই ছিল না। প্রফুল্লদার অ্যাকাউন্ট থেকেই খরচ চালাতেন। তবুও অনেক সময় মতের অমিল হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গোষ্ঠী রাজনীতি তো নতুন ছিল না, সব দলেই হত। কংগ্রেসের ঘরোয়া ঝগড়া কিছু কম ছিল না। অতুল্য ঘোষের কাছে ড. বিধানচন্দ্র রায়ের বিরোধ, অতুল্যবাবুর সঙ্গে প্রফুল্লবাবুর বিরোধ, এসব অনেক কানাঘুষো তখন শুরু হল। অতুল্য ঘোষের নিজস্ব কোনও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই ছিল না। প্রফুল্লদার অ্যাকাউন্ট থেকেই খরচ চালাতেন। তবুও অনেক সময় মতের অমিল হয়েছে। দলের সাংগঠনিক ক্ষেত্রে অতুল্যবাবুর প্রভাব বেশি হয়ে গেল। প্রফুল্ল সেনের প্রভাব ছিল পরিষদীয় দলের সদস্যদের মধ্যে। '৬৬ সালে গুলজারিলাল নন্দের কথায় অপমানিত বোধ করে প্রফুল্ল সেন মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে চেয়েছিলেন। সেদিন বিধানসভায় অনেকে ছুটে যান। কেউ প্রফুল্ল সেনকে বোঝাতে পারেননি। অতুল্যবাবু এককথায় যখন বললেন, ‘‘প্রফুল্লদা আপনি পদত্যাগ করতে পারবেন না। তখন কিন্তু তিনি আর জেদ করতে পারেননি।''

অতুল্য ঘোষ। ফাইল ছবি

এমন ছিল সেই সময়কার রাজনৈতিক নেতাদের পারস্পরিক সম্পর্ক। আর একবার গুলজারিলাল নন্দ শিল্পপতি বিড়লার সামনে তাঁর সহকর্মী মন্ত্রী বিজয় সিংহ নাহারকে অপমান করেছিলেন। সেদিন অতুল্যবাবু এবং প্রফুল্লবাবু একসঙ্গে প্রতিবাদ জানিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গুলজারিলাল নন্দের সমস্ত অনুষ্ঠান বর্জন করেন। নন্দকে কোনও দিনই অতুল্যবাবু ভালো চোখে দেখতেন না। অতুল্যবাবুর সঙ্গে প্রফুল্লবাবুর মতান্তর স্পষ্ট হল, পশ্চিমবঙ্গে যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়। একটা নয়, অনেক ঘটনায় ব্যবধান বাড়তে লাগল। প্রফুল্ল সেনের চেয়ে অতুল্যবাবুকে বেশি কমিউনিস্ট বিরোধী বলে বরাবর মনে হয়েছে। কিন্তু পরপর কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেল, প্রফুল্ল সেন অনেকটা অন্ধ কমিউনিস্ট বিরোধী। কিন্তু অতুল্যবাবু রীতিনীতি বর্জন করে নিছক কমিউনিস্ট বিরোধী হতে নারাজ।

অতুল্যবাবুর সঙ্গে প্রফুল্লবাবুর মতান্তর স্পষ্ট হল, পশ্চিমবঙ্গে যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়। একটা নয়, অনেক ঘটনায় ব্যবধান বাড়তে লাগল। প্রফুল্ল সেনের চেয়ে অতুল্যবাবুকে বেশি কমিউনিস্ট বিরোধী বলে বরাবর মনে হয়েছে। কিন্তু পরপর কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেল, প্রফুল্ল সেন অনেকটা অন্ধ কমিউনিস্ট বিরোধী।

অনেক সময় কংগ্রেস নেতা যুক্তফ্রন্ট সরকারে ভেঙে ফেলার প্রস্তাব তোলেন। কিন্তু অতুল্যবাবু ক্রুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘‘আমি নীতিগতভাবে ষড়যন্ত্র করে মন্ত্রিসভা ভেঙে ফেলার বিরুদ্ধে।'' পশ্চিমবাংলার স্বার্থ, কমিউনিস্টদের ভয়াবহ পরিকল্পনা কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নানা যুক্তি অতুল্যবাবুর কাছে আমল পায়নি। আসলে নির্বাচনের ফলাফলটাকে প্রফুল্লবাবু মানতে চেয়েছিলেন। অতুল্যবাবু বলেছিলেন, ‘‘ভোটের মধ্যে দিয়েই যা হওয়ার হবে। ষড়যন্ত্র করে সরকার ফেলাটা ঠিক নয়।''

কিন্তু সেই সময় রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কগুলো আজ আলোচনা করা দরকার। সেই সময়কার মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত ড. বিধানচন্দ্র রায় সব অভিযোগ খণ্ডন করে প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে লিখেছিলেন, প্রফুল্ল সেন পরাজিত হয়েছেন তাঁর খাদ্যনীতির জন্য নয়। দলের খাদ্যনীতির জন্য। আমার মন্ত্রিসভায় প্রফুল্ল সেনের প্রয়োজন আছে। অত্যন্ত দক্ষ প্রশাসক। মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত যোগ্যতাসম্পন্ন। যাই হোক, মন্ত্রিসভা থেকে প্রফুল্ল সেনকে বাদ দেওয়া কোনওভাবেই সম্ভব নয়। আর যাঁরা খাদ্যনীতির জন্য সমালোচনা করছেন বলে গলাবাজি করছেন, আসলে খাদ্য নিয়ে তাঁরা রাজনীতি করছেন। খাদ্যনীতি নিয়ে বরাবর সোচ্চার ছিলেন দুই কমিউনিস্ট পার্টি। বিশেষ করে প্রফুল্লচন্দ্র সেনের বিরুদ্ধে। তার কারণ বরাবর প্রফুল্লচন্দ্র সেন বিভিন্ন কমিউনিস্ট দেশের অপশাসনের ছবি তুলে ধরতেন। তিনি কমিউনিস্ট বিরোধী বলে পরিচিত ছিলেন। বিধানসভায় খাদ্যের ব্যাপারে পরিসংখ্যান দিয়ে সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করেছিলেন সমাজতন্ত্রী এমএলএ কাশীকান্ত মৈত্র। কাশীবাবু দেখাতে চেয়েছেন যে, পশ্চিমবঙ্গে খাদ্য ঘাটতি নেই। কিন্তু প্রত্যেকবারই প্রফুল্ল সেন পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়ে দেন যে, খাদ্য ঘাটতি আছে এবং সেটা কৃত্রিম নয়।

বিধানসভায় খাদ্যের ব্যাপারে পরিসংখ্যান দিয়ে সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করেছিলেন সমাজতন্ত্রী এমএলএ কাশীকান্ত মৈত্র। কাশীবাবু দেখাতে চেয়েছেন যে, পশ্চিমবঙ্গে খাদ্য ঘাটতি নেই। কিন্তু প্রত্যেকবারই প্রফুল্ল সেন পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়ে দেন যে, খাদ্য ঘাটতি আছে এবং সেটা কৃত্রিম নয়।

বিধানসভার গ্যালারিতে বসে দর্শকদের চোখ দিয়ে দেখলে মনে হয়, প্রফুল্ল সেন আর কাশীকান্ত মৈত্রের সম্পর্কটা অত্যন্ত তিক্ত। দু'জনে কেউ কারওর কথা যেন সহ্য করতে পারে না।

সেদিন আর আজ কত তফাত। কত ফারাক।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement