সমতল থেকে ২৮০০ ফুট উঁচুতে গ্রাম। সেখানে পৌঁছতে পাকদণ্ডি বেয়ে হাঁটা পথ। সেই পথ গাড়ি চলাচলের যোগ্য নয়। এদিকে গ্রামের বাসিন্দাদের বহু দিনের সখ এলাকায় গাড়ি চলুক। সেই ইচ্ছাই এবার পূরণ হল। গ্রামে কমবেশি ৩০টি পরিবার আছে। তাঁরা টাকা জমিয়ে গ্রামের জন্য কিনে ফেললেন একটি চারচাকা গাড়ি! তবে সেই গাড়ি ওই উঁচুতে চালিয়ে ওঠা কখনওই সম্ভব নয়। তাহলে উপায়?
গ্রামের লোকজনই কাঁধে করে ওই গাড়িকে উপরে তুলেছেন! তবে তার আগে গাড়ির দরজা-সহ একাধিক যন্ত্র আলাদা করা হয়। প্রত্যেকটি অংশ কাঁধে করে গ্রামে তোলা হয়। তারপর গ্রামের রাস্তায় ফের নতুন করে ওইসব যন্ত্রাংশ জুড়ে ফেলা হয়। গড়গড়িয়ে ধুলো উড়িয়ে ছুটল গাড়ি। গ্রামে প্রথমবার গাড়ি চলার আনন্দে আত্মহারা হলেন বাসিন্দারা। উচ্ছ্বাসে কেঁদে ফেললেন অনেকে। গাড়ি আসার আনন্দে নাচলেন বাসিন্দারা।
ঘটনাটি উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ারের বক্সা (Buxa) পাহাড়ের চুনাভাটি পাহাড়ি গ্রামের। এই গ্রামে মূলত ডুকপা সম্প্রদায়ের মানুষজন বসবাস করেন। সমতল থেকে বক্সা টাইগার রিজার্ভের বিএফ রোড ধরে বক্সা ফোর্টে যাওয়ার রাস্তায় পড়ে সান্তালাবাড়ি। সেখান থেকে একটু এগিয়ে গেলেই বাম দিকে একটি রাস্তা মাসানি নদীর দিকে নেমে গিয়েছে। এই মাসানি নদী পর্যন্ত এখন গাড়ি যায়। কিন্তু সেখান থেকে পাহাড়ের পাকদণ্ডি বেয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার বিপদ সঙ্কুল পাহাড়ি রাস্তা পেড়িয়ে পায়ে হেঁটে পৌঁছতে হয় চুনাভাটি গ্রামে।
গাড়ির সামনে গ্রামের বাসিন্দারা।
গ্রামে কখনও গাড়ি চলেনি। এদিকে বাসিন্দারা চাইতেন গ্রামে গাড়ি চলাচল করুক। কিন্তু কীভাবে ওই বিপজ্জনক রাস্তা পেরিয়ে গাড়ি যাবে গ্রামে? শেষপর্যন্ত গ্রামের বাসিন্দারাই রাস্তা তৈরিতে হাত লাগান। ডোলেচেন এলাকা থেকে চুনাভাটি যাওয়ার আড়াই কিলোমিটার রাস্তা বাসিন্দারাই কোদাল-বেলচা দিয়ে গাড়ি চলাচলের জন্য বানিয়ে নেন। ওই অংশেই গাড়ি চলাচলের ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন তাঁরা। সেই মতো টাকা জমানো শুরু হয়। একটি সেকেন্ড হ্যান্ড চারচাকা গাড়ির সন্ধানও মেলে। সেই মতো অর্থ জমিয়ে ৯০ হাজার টাকা দিয়ে কেনা হল ওই গাড়ি।
কিন্তু মাঝের রাস্তায় কীভাবে চলবে ওই গাড়ি? পায়ে চলাচলের দুর্গম রাস্তায় কোনওভাবেই গাড়ি চলাচল যোগ্য নয়। ওই অবধি গাড়ি যায়ও না। সে কারণে গাড়ির ইঞ্জিন, সিট, জানালা, দরজা সব খুলে ফেলা হয়েছিল। প্রত্যেকটি যন্ত্রাংশ আলাদা করে উপরে নিয়ে যাওয়া হয়। গাড়ির কাঠামো হালকা করে সেটিকে বাঁশের মাচায় বেঁধে গ্রামবাসীরাই উপরে তুলেছেন! উপরে নিয়ে গিয়ে সব যন্ত্রাংশ ফের সেট করা হয়। তারপর পাহাড়ের রাস্তায় চলতে শুরু করে গাড়ি।
গাড়ি আসার আনন্দে গ্রামের মানুষদের নাচ।
কিন্তু পেট্রোল শেষ হয়ে গেলে কী হবে? গাড়ি তো আর প্রত্যেকবার নিচে গিয়ে তেল ভরে উপরে তোলা যাবে না! গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, গ্রামের প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিচ থেকে কাঁধে, পিঠে করে উপরে নিয়ে আসা হয়। তেমনই পেট্রোলও নিচ থেকে উপরে নিয়ে আসা হবে। তেল ভরে ওই আড়াই কিলোমিটার রাস্তায় গাড়ি চলবে। ওই গাড়ি আর নিচে কোনওভাবেই নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। চুনাভাটি গ্রামের বাসিন্দা সোনু ডুকপা বলেন, “চুনাভাটি থেকে মাসানি নদীর পার পর্যন্ত আগে গোটা রাস্তাটাই আমাদের পায়ে হেঁটে চলাচল করতে হত। এখন গ্রাম থেকে ডোলেচেন পর্যন্ত মারুতি ভ্যানে যাতায়াত করতে পারব আমরা। তারপরের রাস্তা অবশ্য পায়ে হেঁটেই যেতে হবে। তবুও তো কিছুটা রাস্তা সহজেই যাতায়াত করা যাবে।"
রাজাভাতখাওয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সোনম ডুকপা বলেন, “আমিও শুনেছি তাঁরা একটা গাড়ি পাহাড়ের উপরে তুলেছেন। এই প্রথম চুনাভাটি গ্রামে কোনও গাড়ি উঠল। যা কার্যত অসম্ভব ছিল। চুনাভাটি গ্রামের পুরুষ মহিলা নির্বিশেষে খুব পরিশ্রমি। বেঁচে থাকার লড়াইটা ওনাদের দেখলেই বোঝা যায়। আমিও কুর্ণিশ জানাচ্ছি ওনাদের এই উদ্যোগকে।” বক্সা (Buxa) টাইগার রিজার্ভের ফিল্ড ডাইরেক্টর কুমার বিমল বলেন, “আমি বিষয়টি জানি না। খোঁজ নিয়ে দেখছি ঠিক কী হয়েছে।”
