ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন স্তরে রন্ধ্রে-রন্ধ্রে দুর্নীতির শিকড় দৃঢ়ভাবে গেড়ে বসেছে। এ তথ্য সাধারণ মানুষের অজানা নয়। ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল’-এর ২০২৪ সালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ৯৬তম, যেখানে প্রথম স্থানে থাকা দেশটি সবচেয়ে সৎ বলে বিবেচ্য। এই আবহে সমাজের অংশ হিসাবে দেশের বিচারব্যবস্থাও হয়তো পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত নয়।
কিন্তু সম্প্রতি অষ্টম শ্রেণির ‘এনসিইআরটি’-র পাঠ্যবইয়ে ‘বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতি’-র অধ্যায় নিয়ে যেভাবে বিচারবিভাগের দিকে আঙুল তোলা হয়েছে, তা নজিরবিহীন। কারণ, সমাজের অন্য বিভিন্ন অংশ বা পেশাতেও দুর্নীতি রয়েছে। তা নিয়ে কোনও বইয়ে আলাদা অধ্যায়ে কখনও দেখা যায়নি। তাই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য, বিচারবিভাগের ক্ষেত্রে এই ব্যতিক্রমী অবস্থান কেন! বিভিন্ন সময় বিচারবিভাগের সঙ্গে কেন্দ্রের সংঘাত ও ‘বিরূপ’ রায়ের জেরেই কি তাদের ‘লক্ষ্যবস্তু’-তে পরিণত করা হল? এর নেপথ্যে কি কোনও ষড়যন্ত্র বা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে– যাতে বিচারবিভাগের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমানসে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা যায়?
অষ্টম শ্রেণির ‘এনসিইআরটি’-র পাঠ্যবইয়ে ‘বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতি’-র অধ্যায় নিয়ে যেভাবে বিচারবিভাগের দিকে আঙুল তোলা হয়েছে, তা নজিরবিহীন। কারণ, সমাজের অন্য বিভিন্ন অংশ বা পেশাতেও দুর্নীতি রয়েছে।
যদিও বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বিতর্কিত বইটি ‘নিষিদ্ধ’ করা হয়েছে। চাপের মুখে আদালতে ক্ষমা চেয়েছে কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান জানিয়েছেন, বিচারবিভাগকে অসম্মান করা সরকারের উদ্দেশ্য নয়। সমস্ত বই প্রত্যাহার করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বইটি এবং সেটির অধ্যায় যারা তৈরি করেছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী। কিন্তু তাতে শীর্ষ আদালতের মন গলানো যায়নি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, এই ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত চিহ্নিত করা প্রয়োজন। উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন, ‘যদি শিক্ষকরা সারা সমাজ এবং শিক্ষার্থীদের শেখান যে বিচার বিভাগ দুর্নীতিগ্রস্ত– তাহলে কী বার্তা যাবে? শিক্ষকরা, অভিভাবকরা কী শিখবেন!’ এই প্রশ্নই বড় হয়ে উঠেছে।
কিন্তু উলটো দিকের কিছু যুক্তিও একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়। আইনমন্ত্রকের তরফে সম্প্রতি লোকসভায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পেশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পদে আসীন বিচারপতিদের বিরুদ্ধে ৮,৬০০-র বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। কিছু দিন আগেই দিল্লি হাই কোর্টের বিচারপতি যশবন্ত বর্মার বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হয়। ২০১১ সালে কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি সৌমিত্র সেনের বিরুদ্ধেও তছরুপের অভিযোগ ওঠে। তঁাকে বরখাস্ত করা হয়। বিচারপতি ও বিচারকরাও এই সমাজের অংশ। সামাজিক ক্ষেত্রে নানা দুর্নীতির প্রভাব মানুষ হিসাবে যে তঁাদের স্পর্শ করে না, এ কথা হলফ করে বলা যায় না। গণতন্ত্রের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে পারস্পরিক অনাস্থা প্রকাশ না-করে একযোগে সমস্যা মেটানোই লক্ষ্য হওয়া উচিত। তাতেই গণতন্ত্র সুপ্রিতিষ্ঠিত হয়। আমাদের নির্দ্বিধভাবে বুঝতে হবে, প্রকৃত লড়াই দুর্নীতির বিরুদ্ধে। দুর্নীতি-মুক্ত পরিসরেই গণতন্ত্র উজ্জীবিত হয়।
