সকাল হলেই চায়ের ধোঁয়া ওঠে। এক ফালি গুমটির সামনে আড্ডা জমে ক্রেতাদের। পরোটা-ঘুগনি তৈরি করে হাসিমুখে পরিবেশন করেন ঝুমা। এতো সামান্য জিনিস! কিন্তু যা আমার আপনার কাছে সামান্য, তা-ই হয়তো অপরিহার্য কারও কারও কাছে। ছেঁড়া কাথায় শুয়ে এই 'লাখ টাকার স্বপ্ন'ই দেখতেন ঝুমা।
বস্তির একচালা ঘরটাই তাঁর একমাত্র ঠিকানা। স্বামী আর দুই সন্তান নিয়ে চারজনের সংসার। অভাব আর অনিশ্চয়তাই ছিল রোজনামচার নিত্যসঙ্গী। সংসারে একমাত্র রোজগেরে ছিলেন স্বামী। আজ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংসারের খরচ সামলান দু'জনেই। একচালা ঘরে বসেই আত্মনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন ঝুমা। আজ সেই স্বপ্নই হাসিমুখে উঁকি দিচ্ছে ঝুমার চায়ের দোকান থেকে। লক্ষ্মীর ভান্ডারের জমানো টাকা দিয়েই শুরু হয় ঝুমার নিজের ব্যবসা।
কথায় বলে, বিন্দু বিন্দু থেকেই একদিন সিন্ধু হয়। সেই প্রবাদই সত্যি হল ঝুমার জীবনে। তাঁর কথায়, 'ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রথম যেদিন লক্ষ্মীর ভান্ডারের ৫০০ টাকা ঢুকেছিল, সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল স্বপ্ন সত্যি করার লড়াই।' সময় লেগেছে তবে হাল ছাড়েননি তিনি। হাত খরচের বাইরেও একটু একটু করে শুরু হয়েছিল সঞ্চয়। মাসের পর মাস একটু একটু করে লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা জমেছে, আর ধাপে ধাপে ঝুমার স্বপ্নও সত্যি হওয়ার পথে পা বাড়িয়েছে। লক্ষ্মীর ভান্ডারের জমানো টাকা দিয়ে শুরু হয়েছে নিজের ব্যবসা, এমনটাই দাবি ঝুমা দাসের। মাস চারেক আগে একটি ছোট্ট ঠেলা গাড়িতে শুরু হয়েছে তাঁর স্বপ্নের সফর।
ছোট্ট গুমটিকে রোজ সকালে চায়ের ধোঁয়া ওঠে। গত ৪ মাসের তুলনায় এখন বেচাকেনাও বেড়েছে বলে দাবি ঝুমার। ঝুমা দাস বলেন, "লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা আমার কাছে শুধু সাহায্য নয়, এটা আমার স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় না থাকলে হয়তো আজও একই জায়গায় পড়ে থাকতাম।"
পাঁচ বছর আগে মা-বোনেদের আত্মনির্ভরতার লক্ষ্যে চালু হওয়া সরকারি প্রকল্প 'লক্ষ্মীর ভান্ডার' আজ বিশ্ব দরবারের স্বীকৃতি পেয়েছে। যত দিন এগিয়েছে, লক্ষ্মীর ভান্ডারে টাকার পরিমাণও বাড়িয়ে গিয়েছে সরকার। এবছরও ভোটের আগে সাধারণ ও তফশিলি উপজাতিদের জন্য ১৫০০ ও ১৭০০ টাকা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে শুধুমাত্র বিরোধিতার স্বার্থে বিরোধীরা এই প্রকল্পের সমালোচনা করে এসেছেন শুরু থেকেই। মহিলাদের জন্য বরাদ্দ অর্থকে ভাতা-রাজনীতি বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলেও, দুর্গাপুরের ঝুমা প্রমাণ করে দিলেন গৃহবধূ থেকে আত্মনির্ভর হওয়ার স্বপ্নে তাঁর জীবনে লক্ষ্মীর ভান্ডারের কতখানি অবদান। বুঝিয়ে দিলেন, এমন আরও রাজ্যের বিভিন্নপ্রান্তে কত ঝুমারা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ভরসা খুঁজে পাচ্ছেন প্রতিদিন।
