বাবুল হক, মালদহ: শীতের কামড়ে জুবুথুবু অবস্থা সাধারণ মানুষ। কাবু মৌমাছিও! প্রবল শৈতপ্রবাহে যেন ভোঁতা হয়ে গিয়েছে ওদের হুল! সরষে ফুলের রেণু সংগ্রহে নিমরাজি। ঘন কুয়াশা আর কনকনে ঠান্ডার দাপটে বাক্স থেকে বের হচ্ছে না মৌমাছির দল। এমনকী খাবার সংগ্রহ করতে সরষেখেতেও যাচ্ছে না। বাক্সবন্দি হয়ে দিন কাটছে একপ্রকার অনাহারেই। ঘটছে মৃত্যুও! মৌমাছির দলের এমন দুর্দশায় চিন্তিত মৌ পালকরা। এই শীতে মাঠে বাক্স বেঁধে তাঁরা রীতিমতো হতাশ। মধু উৎপাদন নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। মাথায় হাত পড়েছে মৌ পালকদের।
প্রবল শীতে ওল্ড মালদহের মাধাইপুর মাঠে চারদিকে সরষে ফুলের ম ম গন্ধ! কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে হলুদ চাদর। বেহুলা নদীর বাঁক পেরিয়ে পথের দু'ধারে হলুদের সমারোহ। পাশেই আমবাগানে মধু সংগ্রহের আশায় শতাধিক বাক্স বেঁধেছেন মৌ পালক জীবন রাজবংশী। তিনি জানান, জাঁকিয়ে বসেছে শীত। ঠান্ডায় জবুথবু অবস্থা মানুষেরও। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে মৌমাছির দল। পেটে টান পড়েছে ওদের। খাবার সংগ্রহ করতে বাইরে যাচ্ছে না। অনাহারে ওরা মরছেও। এই মুহূর্তে খোলা বাজার থেকে চিনি কিনে ওদের খাওয়ানো দরকার। কিন্তু তাতে লোকসান বাড়বে বলেই আশঙ্কা ওই মৌ পালকের। মালদহের মধুচাষিদের সমবায় সমিতিগুলির সম্পাদক সুভাষ মণ্ডল বলেন, "এই রকম টানা কনকনে ঠান্ডা আবহাওয়া চলতে থাকলে মধু উৎপাদনে ব্যাপক ঘাটতির মুখে পড়তে হবে। অনাহার ঠেকাতে চিনির জোগান দেওয়া সম্ভব নয়।"
অন্যদিকে হরিশ্চন্দ্রপুরের সাদিপুর গ্রামের মৌ পালক মোফিজুল হোসেন জানান, একটি প্রতিপালন বাক্সে ৮-১০টি করে মৌচাক থাকে। প্রতিটি মৌচাকে ১০ হাজারের বেশি মৌমাছি থাকে। একটি বাক্সেই লক্ষাধিক মৌমাছি প্রতিপালন করা হয়। কিন্তু এই ঠান্ডায় কাবু হয়ে পড়েছে মৌমাছিরা। মড়ক শুরু হয়েছে। সাদিপুরের পাশের জগন্নাথপুরের রাস্তার ধারে শতাধিক বাক্স রেখে চলছে মধুচাষ। ওই গ্রামের মৌ পালক আবদুল হামিদ বলেন, "আকাশে ঝলমলে রোদ না পেলে মৌমাছিরা বাক্স থেকে বের হয় না। এবার রোদ উধাও। কুয়াশায় মুখ ঢেকেছে সরষে ফুল। বাক্সে বন্দি হয়ে থাকছে মৌমাছিরা। অনাহারে প্রচুর সংখ্যক মৌমাছি মারা যাচ্ছে।" মুচিয়ার মহাদেবপুরের পলাশ মণ্ডল বলেন, "এই পরিস্থিতিতে রোজ সকালে প্রতিটি বাক্সে ৫০০ গ্রাম করে চিনি দিতে হবে। ১০০টি বাক্সে ৫০ কেজি চিনি লাগবে। খোলা বাজার থেকে চড়া দামে চিনি কিনে নিয়ে সেটা করা সম্ভব হচ্ছে না। মধু উৎপাদনের জন্য অগ্রিম টাকা বায়না হিসাবে বিভিন্ন পাইকার ও সংস্থাগুলির কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে। তাই চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছি।"
মালদহের উদ্যানপালন দফতরের উপ-অধিকর্তা সামন্ত লায়েক জানান, ঠান্ডা আবহাওয়া চলতে থাকলে মধু উৎপাদন নিয়ে একটা সংশয় থাকবে। ফি বছর এই মালদহ জেলা থেকে প্রায় আড়াই হাজার মেট্রিক টন মধু উৎপাদন হয়ে থাকে। ওল্ড মালদহ ও হরিশ্চন্দ্রপুরে সবচেয়ে বেশি মধুচাষ হয়। বৈজ্ঞানিক এপিকালচার পদ্ধতিতে জেলার চাষিরা মধুচাষ করে থাকেন। সরষে খেতের ধারে বড় বড় বাক্স রেখে মৌমাছি পালন করা হয়। তারপর চাষিরা মধু সংগ্রহ করেন।
