লাল, হলুদ, কমলা, সবুজ, গোলাপি নয়। পুরুলিয়ার শিল্পতালুক রঘুনাথপুরে দোলের রঙ কালো! মঙ্গলবার দোলের দিন এমনই ছবি দেখা গেল শিল্পতালুক রঘুনাথপুরের ঝাড়ুখামারে। কেন এমন অদ্ভুত দৃশ্য? জানা যাচ্ছে, জঙ্গলমহল পুরুলিয়া জুড়ে দু'শোর বেশি 'রেড ক্যাটাগরি' কারখানার দূষণে 'কালো' হয়ে যাচ্ছে জনজীবন। এমনকী এলাকার পলাশের রঙেও কালটে ভাব! তাই দোলে কালো রং মেখে অভিনব প্রতিবাদে শামিল পুরুলিয়ার ওই শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দারা।
এই 'রেড ক্যাটাগরি' কারখানার দূষণের জেরে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে এখানকার পর্যটন। বিশেষ করে গড় পঞ্চকোট ট্যুরিজম সার্কিট। কালো ধোঁয়ায় মার খাচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবন। দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের তথ্য বলছে, জেলার বাতাসে দূষণ মাত্রা বা একিউআই গড় ২০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপজ্জনক। ইতিমধ্যেই রঘুনাথপুর শিল্পতালুকের বিভিন্ন গ্রাম যেমন নতুনডি, ঝাড়ুখামার, দুরমুট এলাকায় ঘরে ঘরে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট এমনকী চর্মরোগ দেখা দিয়েছে। কালো হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ফসল। কমে যাচ্ছে ফলন। এমনকি পুকুরের জল কালো হয়ে বিষাক্ত হওয়ায় অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে গবাদি পশুরা। বিভিন্ন কারখানার কালো ধোঁয়ার স্তর জমে আছে প্রাকৃতিক জোড়ে। গড় পঞ্চকোট পাহাড়ের সবুজ বনাঞ্চলও ক্ষতি হচ্ছে ওই দূষণে। তাই এদিন ওই শিল্প তালুকের ঝাড়ুখামারের মানুষজন মুখে কালো রঙ মেখে, কালো মাস্ক, ব্যাজ নিয়ে মিছিল করে প্রতিবাদ জানান। আর সেই ছবি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে চলে ডিজিটাল প্রতিবাদ। এমনকী শিল্পাঞ্চল রঘুনাথপুরের বিভিন্ন কারখানার চিমনি থেকে গলগল করে বার হওয়া ধোঁয়ার ছবি তুলে সেখানে শিল্প সংস্থার নাম লিখে সোশাল ওয়াল ভরিয়ে দেওয়া হয়।
পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর শিল্পতালুকের ঝাড়ুখামারের প্রতিবাদে শামিল ছোটরাও। নিজস্ব ছবি
'ব্ল্যাক হোলি ২০২৬' এবং 'সেভ পুরুলিয়া' ট্যাগলাইন দিয়ে এই প্রতিবাদ চলতে থাকে দিনভর। সোশাল ওয়ালে এই প্রতিবাদে শামিল হন বুদ্ধিজীবী মানুষজন থেকে কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও। এভাবেই প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়েছিলেন ওই ঝাড়ুখামারের মানুষজন। মিছিল থেকে আওয়াজ ওঠে, তাঁরা শিল্পের বিরোধী নন। তাঁরা চান দূষণহীন 'গ্রিন ক্যাটাগরি' শিল্প। সেই সঙ্গে স্থায়ী কর্মসংস্থান। স্লোগান ওঠে, "আমরা কাজ চাই কিন্তু আমাদের বাচ্চাদের ফুসফুস বিক্রি করে নয়।" এই প্রতিবাদে ছৌ নাচের আবেগকেও সামনে আনা হয়। কালো দোলের ছবি পোস্ট করে সমাজ মাধ্যমের দেওয়ালে লেখা হয় ছৌ-এর বীরভূমিতে আজ অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। ঝাড়ুখামার বাসিন্দাদের অভিযোগ, একের পর এক 'রেড ক্যাটাগরি' শিল্পায়নের মধ্যেই তাদের এলাকার ১৩৪ একর জমির মধ্যে আরও একটি লাল তালিকা ভুক্ত স্পঞ্জ আয়রন কারখানা আসছে। প্রশাসনকে অবিলম্বে তা বন্ধ করতে হবে। অভিযোগ কোনরকম জনশুনানি ছাড়াই রঘুনাথপুর ১ ব্লকের নতুনডি গ্রাম পঞ্চায়েতের হুড়রায় জমি ঘেরার কাজ শুরু করেছে একটি শিল্প সংস্থা। এই অবস্থায় নতুন করে মারাত্মক দূষণকারী কোন কারখানা হলে ওই এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষজনের গ্রাম ছাড়তে হবে। রঘুনাথপুর মহকুমাশাসক বিবেক পঙ্কজ বলেন, "অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি দেখা হচ্ছে।"
বিধি অনুযায়ী যে কোন এলাকায় ভারী শিল্প বা কারখানা স্থাপনের আগে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে জনশুনানি একেবারে বাধ্যতামূলক। এর মাধ্যমে এলাকার মানুষের মতামত নেওয়া এবং পরিবেশের উপর আলোচনা করতেই ওই জনশুনানি ডাকা হয়। কিন্তু ওই শিল্প সংস্থা যাদের নিতুড়িয়াতে একটি ইউনিট রয়েছে তারা একেবারে বিধি বহির্ভূতভাবে প্রশাসনিক স্তরে কোন নোটিশ জারির আগেই জমি ঘেরার কাজ শুরু করেছে বলে অভিযোগ। এলাকার মানুষজন বলছেন, ওই শিল্প সংস্থা যে জমি দিচ্ছে তা বাম আমলে ২০০৭ সালে জয় বালাজি শিল্প সংস্থাকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা শিল্প করতে না পারায় রাজ্যকে জমি ফেরত দিয়ে দেয়। অধিগৃহীত ওই জমি প্রায় ১৮ বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পর সেই জমি ওই শিল্প সংস্থা বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু করায় এই আন্দোলন।
গ্রামের মানুষজন আওয়াজ তোলেন, তাঁরা কোনওভাবেই এলাকায় 'বিষ' ছড়াতে দেবেন না। নিজস্ব ছবি
কালো রঙ মেখে ওই গ্রামের মানুষজন আওয়াজ তোলেন, তাঁরা কোনওভাবেই এলাকায় 'বিষ' ছড়াতে দেবেন না। ভারতের পরিবেশ সুরক্ষা আইন এবং কেন্দ্রীয় পরিবেশ দূষণরোধী বোর্ডের নির্দেশিকা অনুযায়ী, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্পঞ্জ আয়রন কারখানা স্থাপন করা কেবল নীতিগতভাবে ভুল নয়। বরং বেআইনি। স্পঞ্জ আয়রন কারখানা অত্যন্ত দূষণকারী হওয়ার কারণে এটি 'লাল তালিকাভুক্ত'। নিয়ম অনুযায়ী, এই ধরনের কারখানা জনবসতি বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত ৫ কিমি দূরত্বে হওয়া জরুরি। না হলে সূক্ষ্ম ছাই ও ধোঁয়া ফুসফুসের রোগ ও হাঁপানির মূল কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যে কোনো কারখানার আগে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ থেকে 'কনসেন্ট টু এস্টাব্লিশ' নিতে হয়। জনবসতি এলাকায় সাধারণত পর্ষদ এই ছাড়পত্র দেয় না।
এই প্রতিবাদ আন্দোলনে শামিল হওয়া এলাকার বাসিন্দা সরোজ মিশ্র বলেন, "গোপনভাবে জমির বেড়ার কাজ করলে আমরা বৃহত্তর আন্দোলন করতে বাধ্য হব।" এলাকার মানুষজনের দাবি, এই উর্বর জমিতে কোনওভাবেই দূষণকারী কারখানা করতে দেওয়া হবে না। তারা রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এবং প্রয়োজনে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনাল বা জাতীয় পরিবেশ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এলাকার মানুষজনের অভিযোগ, প্রশাসনকে বারবার লিখিত অভিযোগ এবং এই বিষয়ে মনে করানো সত্ত্বেও তাদের তরফে কোনও সদর্থক উত্তর মেলেনি।
