মাস দুয়েক আগের কথা, তখনও বঙ্গে ভোট ঘোষণা হয়নি। গুসকরার পাত্র পরিবারের বাড়িতে দায়িত্ব সহকারে দু'বেলা করে কাজ করে এসেছিলেন। কিন্তু ভোটে দলের তরফে তাঁর নাম প্রার্থী হিসাবে ঘোষণার পর থেকে ভোটপ্রচারের জন্য আর কাজে যাওয়া হয়নি। জীবনের দ্বিতীয়বার ভোটে লড়াই করে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। এবার বিধায়ক হয়ে একেবারে সরাসরি শুভেন্দু অধিকারীর মন্ত্রিসভায়। পরিচারিকার পেশা থেকে একেবারে রাজ্যের মন্ত্রী হিসাবে সোমবার শপথগ্রহণ করলেন আউশগ্রামের বিধায়ক কলিতা মাজি। তিনি যখন শপথবাক্য পাঠ করছেন, টেলিভিশনের পর্দায় সেই দৃশ্য দেখে চোখে জল ধরে রাখতে পারেননি গুসকরা শহরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা পেশায় ব্যবসায়ী প্লাটিলাল পাত্র এবং তাঁর স্ত্রী কৃষ্ণাদেবী।
প্লাটিলাল পাত্রের কথায়, "কলিতা আমার বাড়িতে কাজ করত ঠিকই। কিন্তু ওকে আমি কোনওদিনই কাজের মেয়ের মতো দেখিনি। ও আমার মেয়ের মতোই ছিল। আগে আমাকে 'কাকা' বলত। বছর চারেক আগে আমার মেয়ে মারা যাওয়ার পর থেকে কলিতা আমাকে 'বাবা' বলেই ডাকত। আমরা মনে করছি, আমাদের মেয়েটাই মন্ত্রীর চেয়ারে বসেছে। বাবা হিসাবে আমি ধন্য।" এদিকে শপথগ্রহণের পর ফোনে যোগাযোগ করা হলে প্লাটিলালবাবুর কথা প্রসঙ্গে কলিতা মাজি বলেন, " উনি আমার বাবার মতনই। আমি গুসকরা ফিরেই আগে ওনার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আসব।"
প্লাটিলাল পাত্রের কথায়, "কলিতা আমার বাড়িতে কাজ করত ঠিকই। কিন্তু ওকে আমি কোনওদিনই কাজের মেয়ের মতো দেখিনি। ও আমার মেয়ের মতোই ছিল। আগে আমাকে 'কাকা' বলত। বছর চারেক আগে আমার মেয়ে মারা যাওয়ার পর থেকে কলিতা আমাকে 'বাবা' বলেই ডাকত। আমরা মনে করছি, আমাদের মেয়েটাই মন্ত্রীর চেয়ারে বসেছে। বাবা হিসাবে আমি ধন্য।"
লোকভবনে শপথের অনুষ্ঠানে কলিতা।
গুসকরা পুরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার পাত্রপাড়ায় ছোট ছোট দু কামরার ঘর কলিতাদেবীদের। বাড়িতে এখনও কাঠ বা কয়লার জ্বালানিতেই রান্না হয়। বাড়িতে পা রাখলেই দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট! বাপের বাড়িও প্রচণ্ড অভাবী। ছয় বোনের মধ্যে কলিতার ২০০৭ সালে বিয়ে হয় গুসকরার পাত্রপাড়ার বাসিন্দা পেশায় কলমিস্ত্রি সুব্রত মাজির সঙ্গে। সংসারের অভাবের কারণে ২০১১ সাল থেকে কলিতা মাজি পরিচারিকার কাজ শুরু করেন। তখন থেকেই গুসকরার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা পেশায় ব্যবসায়ী প্লাটিলাল পাত্রের বাড়িতে কাজে লাগেন। ২০১৪ সাল থেকে বিজেপিতে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি।
২০২১ সালে প্রথম আউশগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি তাঁকে প্রার্থী করেছিল। কিন্তু সেবার ১১৮১৫ ভোটে তাঁকে পরাজিত হতে হয়েছিল। এবারের তাঁরই উপরে ভরসা করেছিল দল। বীরভূমের জনসভায় কলিতা মাজির হয়ে ভোটপ্রচার করে গিয়েছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর দ্বিতীয়বারে সাফল্য। ১২৫৩৫ ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীকে হারিয়ে দেন কলিতা মাজি। ভোটের ফলঘোষণার পর দলের সদ্য নির্বাচিত বিধায়কদের নিয়ে সভার মাঝে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আউশগ্রামের বিধায়ক কলিতা মাজির নাম উল্লেখ করেছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেদিন বলেছিলেন, " বাংলার সমস্ত হতদরিদ্র পরিবারের মা বোনেদের কাছে কলিতা মাজি আশার বিন্দু। কারণ কলিতা মাজি প্রমাণ গরিব পরিবারের প্রতিনিধিরাও বিধানসভায় বসতে পারেন।" বস্ততপক্ষে সেদিনই রাজনৈতিক মহলের একাংশের অনুমান ছিল কলিতা মাজিকে গুরুত্বপূর্ণ কোনও দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
জানা যায়, রবিবার বিকেলে কলিতাদেবীর কাছে কলকাতা থেকে ফোন এসেছিল। রাতের মধ্যেই তাঁকে কলকাতা পৌছে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তখনই ঘনিষ্ঠ মহলের অনুমান ছিল মন্ত্রীত্ব পেতে পারেন কলিতা মাজি। এদিন শপথগ্রহণের অনুষ্ঠানে তাই সবার চোখ ছিল টেলিভিশনের পর্দায়, বা স্মার্টফোনে লাইভ অনুষ্ঠানে। প্রতিমন্ত্রী হিসাবে কলিতা মাজির নাম ঘোষণার পরেই দেখা যায় গুসকরা শহরে কার্যত উৎসবের আবহ। দলের কর্মীরা অনেকেই নিজেদের পকেট থেকে টাকা দিয়ে লাড্ডু কিনে পথচারীদের মধ্যে বিতরণ শুরু করেন। কলিতা মাজি বলেন," দল আমাকে গুরুদায়িত্ব দিয়েছে। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব দায়িত্ব পালন করার।"
